রবীন্দ্রসংগীতে বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগের যথার্থতা

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

রবীন্দ্রসংগীতে বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগের যথার্থতা

ইসরাত জাহান তমা ৮:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
রবীন্দ্রসংগীতে বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগের যথার্থতা

সংগীত পরিবেশনায় বাদ্যযন্ত্র গানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাদ্যযন্ত্র কেবল একটি গানকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে না, সাংগীতিক পরিবেশে আরও মোহময়তা সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রেও বাদ্যযন্ত্রের রয়েছে একটি বিশেষ ও বিশিষ্ট ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথ তার সংগীতে ভাবকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। আর তাই রবীন্দ্রসংগীতকে অন্যান্য ধারার সংগীতের সঙ্গে একই আসনে বসিয়ে বিচার করলে মস্ত ভুল হয়ে যাবে। ‘তার সংগীতে মূল সারথি হলো ভাব।

সেই ভাবকে প্রাণবন্ত করা হেতু যেখানে যতটুকু বাদ্যযন্ত্রের সহযোগিতা প্রয়োজন ঠিক ততখানি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর বাহুল্য হেতু রসহানি হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।’ (সংগীত তত্ত্ব, রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, দেবব্রত দত্ত, সংগীত প্রভাকর, পৃষ্ঠা-১৪৯)। আর তাই রবীন্দ্রনাথ তার গানে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে নির্দিষ্টতা রেখে গেছেন, যা তার গানের ভাব বজায় রাখতে বিশেষ সহায়তা করে। অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা তার গানের মূল রূপটি নষ্ট হোক তা তিনি কখনোই চাননি। তাই নিজের গানে প্রথমে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের পক্ষপাতিই ছিলেন না তিনি। কবি কণ্ঠে গান শুনলে বাদ্য ছাড়া খালি গলায় গাওয়া অনেক গানই পাওয়া যায়।

কবি নবীন চন্দ্র কবি কণ্ঠের প্রশংসা করতে গিয়ে তার স্মৃতিকথায় একটি ঘটনা নিয়ে লিখেছেন, ‘আমরা তখন তাহাকে একটি গান গাইতে বিশেষ অনুরোধ করিয়া হারমোনি ফ্লুট তাহার সমক্ষে দিলাম। তিনি বলিলেন, তিনি কোনো যন্ত্রের সঙ্গে গাইতে ভালোবাসেন না, কারণ যন্ত্র গলার মাধুর্য ঢাকিয়া ফেলে। তিনি একটি মাত্র পর্দা কিছুক্ষণ টিপিয়া, সুরটি মাত্র স্থির করিয়া যন্ত্র ছাড়িলেন। তাহার পর পকেট হইতে একখানি কাগজ বাহির করিয়া একটি নতুন কীর্তন গান রচনা করিয়া আনিয়াছেন বলিয়া উহা গাইতে লাগিলেন।’ (আমার জীবন, তৃতীয় ভাগ, সাহিত্য পরিষদ সংস্করণ, পৃষ্ঠা-৬১)।

পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শুরু করলেও এক্ষেত্রে অনেক পরিমিতি বজায় রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার গানের সহযোগী হিসেবে এস্রাজকে বেশি পছন্দ করতেন। এমনকি শান্তিনিকেতনের সংগীত শিক্ষায় এস্রাজ আবশ্যিক শিক্ষণীয় বিষয় ছিল। বর্তমানে হারমোনিয়াম রবীন্দ্রসংগীতের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা গেলেও হারমোনিয়ামের ব্যবহার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কোনো আগ্রহ ছিল না। বরং যন্ত্রটির বিষয়ে তার বীতরাগই ফুটে উঠেছে। ‘ছোটবেলা’ গ্রন্থের এক জায়গায় বলেছেন, ‘তখন হারমোনিয়াম আসেনি এদেশের জাত মারতে। কাঁধের ওপর তম্বুরা তুলে গান অভ্যেস করেছি। কলটেপা সুরের গোলামি করিনি।’

রবীন্দ্রসংগীতে মীড়ের ব্যবহার খুব বেশি। এস্রাজ জাতীয় তারযন্ত্র ছড়ির মোলায়েম টানে মীড়ের উদাস করুণ সুরটি অতি সুন্দরভাবে প্রকাশ পায়। কিন্তু হারমোনিয়ামের কাটা কাটা সুরে এই মীড়ের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। (শ্রী অমল মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা, পৃষ্ঠা-১০৭-১০৮)। তবে ব্যবহারের সুবিধার কারণেই হারমোনিয়াম যন্ত্রটি শিল্পীরা অধিক ব্যবহার করে থাকেন।

আবার রবীন্দ্রসংগীতের অঙ্গ, পর্যায় বা সুরের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেও বাদ্যযন্ত্রের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। যেমন : ধ্রুপদাঙ্গের গানে পাখোয়াজ, খেয়ালাঙ্গের গানে তবলা কিংবা কীর্তনের গানে খোলই বেশি উপযুক্ত। অর্থাৎ কোন গানে কোন সুর বা তাল যন্ত্র বাজবে তা স্থির করাও রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
গানের মেজাজ ও চলন অনুসারে পরিমিত সংগীতের দ্বারা গানকে যথাযথ ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমেই বাদ্যের যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের একটি বক্তব্য দিয়েই রবীন্দ্রসংগীতে বাদ্য প্রয়োগে পরিমিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়- ‘আমাদের দেশে গাইয়ে বাজিয়েরা কিছুতেই মনে রাখে না যে, আর্টের প্রধান তত্ত্ব তার পরিমিতি। কেননা, রূপকে সুব্যক্ত করাই তার কাজ। বিহিত সীমার দ্বারা রূপ সত্য হয়। সেই সীমা ছাড়িয়ে অতিকৃতিই বিকৃতি।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীত চিন্তা, নবযুগ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৩৩)।
গানের সুরের প্রকৃতি অনুসারে বা অঙ্গানুসারে উপযুক্ত ও পরিমিত যন্ত্রানুষঙ্গ নির্বাচনেই রবীন্দ্র সংগীতের শিল্পমূর্তি বজায় থাকে। তাই বাণীপ্রধান রবীন্দ্রসংগীতে বাদ্য যেন বাণীকে ছাপিয়ে না যায়, সে কথা মাথায় রেখে সুর বা অঙ্গানুযায়ী বাদ্য নির্ধারণ করতে হবে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নিজেই যথেষ্ট আধুনিক ছিলেন। তাই বাদ্যযন্ত্রের নতুনত্ব তার জীবদ্দশায়ই লক্ষ করা যায়। তবে তা বেশ পরিমিতির সঙ্গে। সময়ের ধারাবাহিকতায় বাদ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি বর্তমান সময়ে এসে আধুনিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র যোগ হতে দেখা যায়। তবে রবীন্দ্রসংগীতে পরিবর্তনের এক ব্যাপক ধাক্কা লাগে ২০০১ সালে কপিরাইট তুলে দেওয়ার পর। কপিরাইট উঠে যাওয়ার পর থেকে রবীন্দ্রসংগীতে ফিউশন বা নতুনত্বের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রে নতুনত্বের অপ্রাসঙ্গিক ব্যবহার বা বাহুল্য লক্ষ করা যায়। অনেকেই রবীন্দ্রসংগীতকে বেছে নেয় নিজেকে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে। আবার অনেকের কাছে রবীন্দ্রসংগীত এক্সপেরিমেন্টের বিষয়। আর তাই এ ধাপে বাদ্য প্রয়োগের যথার্থতা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে।

চারপাশের এত এত বিদেশি বাদ্যযন্ত্র-কী-বোর্ড, গিটার, অক্টোপ্যাড আরও কত কী! বাদ্যযন্ত্রের এ স্রোতে, আধুনিকতায় পিছিয়ে থাকার কোনো পথ নেই। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই নিজের বিষয়কে উপস্থাপন করতে হবে। আর এই ভারসাম্যটুকুই একটি গানকে করে যথাযথ ও শিল্পীকে দেয় সফলতা। তবে এ বাদ্য কেউ জেনে বুঝে এবং গানের বাণীর মর্যাদা ঠিক রেখে প্রয়োগ করছে। আবার কেউ চর্চার অভাবে কিংবা অজ্ঞতায় ভুলভাবে বাদ্যের প্রয়োগ করছে।

রবীন্দ্রনাথ তার বাল্মীকি প্রতিভায় ঝড়ের শব্দ তৈরি করার জন্য টিনের ছাঁদে লোহার ডাম্বেল দিয়ে ইফেক্ট তৈরি করেছিলেন। কিন্তু যদি এখন থাকতেন তবে অবশ্যই অক্টোপ্যাড ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, রবীন্দ্রসংগীতের বাণী ও সুর ঠিক রেখে পরিমিতির সঙ্গে নতুন বা আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করা হলে তা দোষের কিছু নয়। গানে তবলার ঠেকাই দিতে হবে পারকেশন করা যাবে না বিষয়টি এমন নয়।

গানের ভাবকে ফুটিয়ে তুলতে নতুন বাদ্যের ব্যবহার হতেই পারে। তবে তা পরিমিতি বজায় রেখে। রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে পিয়ানো বাজানো হতো। তিনি নিজে পিয়ানোর সঙ্গে গান করেছেন। নতুন কিছু গ্রহণে যদি কবি গুরুর বাধাই থাকত তবে তিনি সর্বজনীন হতে পারতেন না। সবার কাছে পৌঁছতে পারতেন না।

নতুন বাদ্য গ্রহণ করতে দোষের কিছু নেই, তবে কীভাবে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে তা বিবেচনার বিষয়। গানের সঙ্গে যে কোনো একটা বাদ্য বাজালেই হবে না। সেই বাদ্য গানের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিনা তাও বিবেচনা করেই প্রয়োগ করতে হবে। আবার গানের সঙ্গে যায় না, এমন অসংখ্য বাদ্য দিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলে তাকে এক্সপেরিমেন্টের নাম দিলেও হবে না।

বর্তমানে রবীন্দ্রসংগীতে আধুনিকায়নের নামে বিভিন্ন রকম যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে যেগুলো মূলত তার গানের ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমান সময়ে এসে রবীন্দ্রসংগীতে ড্রামস, ব্যাঞ্জো, কীবোর্ড, পিয়ানো, অক্টোপ্যাড ইত্যাদি আধুনিক ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই যন্ত্রগুলোর প্রয়োগ বেশির ভাগ সময়ই এমন হয় যে, গানের সুর ও কথাকে ছাপিয়ে যায়। এতে করে রবীন্দ্রসংগীতের ভাবময়তা ক্ষুন্ন হচ্ছে এবং দর্শক-শ্রোতাও ভালো করে শুনতে পারছেন না গানের কথাগুলো, উপলব্ধি করতে পারছেন না গানের সঠিক ভাব।

রবীন্দ্রনাথের গানের একটি বিশেষত্ব হলো এর কাব্যধর্মীতা। সুর বাহন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু যন্ত্রের সুর বা আওয়াজ যদি গানের চেয়ে বেশি হয়, তবে রবীন্দ্র সংগীতের ভাবটির প্রতিমূর্তি নষ্ট হয়। যেমন, কীবোর্ড ইলেকট্রিক হওয়ার কারণে এর আওয়াজ হারমোনিয়ামের তুলনায় অনেক বেশি। তাই এর জোরালো ব্যবহার গানকে ছাপিয়ে যায়। যদি ইন্টারলিউড বা প্রিলিউড এর সময় কীবোর্ড বাজানো হয় তবে তা হয়ত খুব বেশি প্রভাব ফেলে না গানে। কিন্তু গান গাওয়ার সময় যদি তা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হয় তবে গানের পুরো সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।

রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা রবীন্দ্রসংগীতে আধুনিক বাদ্য প্রয়োগের যথার্থতা নিয়ে বলেন, ‘সংগীত হলো ক্রিয়েটিভ বিষয়। তাই এখানে বাদ্যের ব্যবহারের ঠিক ভুল বিচার করা যায় না। যদি শুনতে ভালো লাগে, গানের বাণী বা গানকে আঘাত না করে তাহলে তা ঠিক। আর যদি গানের বাণীকে আঘাত করে, শুনতে খারাপ লাগে তাহলে তা ভুল। কোনো কম্পোজার বা শিল্পী যদি কোনো নতুন বাদ্যকে ভালো লাগার মতো করে ব্যবহার করতে পারে, তবে তা যথার্থ। আবার যদি বাদ্য এমনভাবে ব্যবহার করে যে গানের ভাব বা সৌন্দর্য ব্যাহত হয় তাহলে সেটা যথার্থ নয়।’

গান বুঝে ও যথাযথ জায়গায় যথাযথ বাদ্য প্রয়োগের দায়িত্বটা অনেক ক্ষেত্রে সংগীত পরিচালকদের ওপরও বর্তায়। এ সম্পর্কে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, ‘একটি গান রেকর্ড করার জন্য গানের কোথায় কোন বাদ্য ব্যবহৃত হবে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে এটা সংগীত পরিচালককে বুঝতে হবে। গানকে নিয়ে হোমওয়ার্ক করতে হবে। আর স্টাডি ছাড়া মিউজিক কম্পোজ করলে কি হবে, তার প্রমাণ তো বর্তমানে আমাদের সামনে অনেক।’

আসলেই তাই। এক পক্ষ আছেন যারা নিজেকে রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় নিয়োজিত করেছেন, গানের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছেন, তাদের গাওয়া বা কম্পোজ করা গানে এখনো বাদ্যের প্রাসঙ্গিক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। আবার আরেক দল শিল্পী ও কম্পোজার আছে যারা অপ্রাসঙ্গিকভাবে বাদ্যের ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত রবীন্দ্রসংগীতের ভাবকে ক্ষুণ্ন করছে ও বিকৃতি ঘটাচ্ছে।

তাহলে এভাবেই কি একদল কম্পোজার ও শিল্পী রবীন্দ্রসংগীতকে আঘাত করতেই থাকবে? এর ভবিষ্যৎ কী? এর উত্তরে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অনিমা রায় বলেছেন, ‘রবীন্দ্র শিক্ষা ও সংগীতকে যদি আরো প্রসারিত করা যায়, তবে আগামীর নতুনরা জেনে বুঝে বেড়ে উঠবে। সেই সঠিক শিক্ষার বীজ যদি বুনন করা যায় তবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা সম্ভব, রবীন্দ্রসংগীতের জন্য একটি দারুণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।’

ইসরাত জাহান তমা
সংগীতশিল্পী ও লেখক