প্লাস্টিক বর্জ্য ও ভবিষ্যতের বিপদ

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

প্লাস্টিক বর্জ্য ও ভবিষ্যতের বিপদ

খালিদ বিন শাহজাহান ৮:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৫, ২০১৯

print
প্লাস্টিক বর্জ্য ও ভবিষ্যতের বিপদ

বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কার হচ্ছে প্লাস্টিক, যা মানবজীবনকে করেছে সহজ কিন্তু এর সহজলভ্যতা কঠিন এক বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে সমগ্র পৃথিবীকে। প্লাস্টিক এমনই এক ধরনের বর্জ্য পদার্থ যেটি কিনা অপচনশীল। প্লাস্টিক দূষণ শুধু বাংলাদেশ নয়, সাড়া বিশ্বের জন্য অনেক বড় সমস্যা। এর উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব। অর্থাৎ পরিবেশের উপাদানগুলো নষ্ট হয়ে যায় বা এগুলোর মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়।

পরিবেশের উপাদানগুলোকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হলো জীব উপাদান যার মধ্যে রয়েছে গাছপালা, জীবজন্তু ও অণুজীবসমূহ এবং অন্যটি অজীব উপাদান যার মধ্যে রয়েছে মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদি। পরিবেশের এই উপাদানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে আমাদের জলবায়ুও পরিবর্তিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা দুটি ভিন্ন বিষয়; কিন্তু সম্পর্কযুক্ত।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বলতে আমরা বুঝি সামগ্রিকভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এই উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলাফল। এখন প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রীর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক কী? প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন জীবাশ্ম জ্বালানি এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণও এই জীবাশ্ম জ্বালানি। প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রী তৈরিতে প্রয়োজন হয় তেল এবং তেল পোড়ালে তা থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। আর এভাবেই ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখে চলেছে।

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পরিবেশ নিয়ে তেমন সচেতনতা দেখা যায় না। প্রতিনিয়ত আমরা যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে এই পরিবেশটার ক্ষতি করছি। ইদানীং প্লাস্টিকের তৈরি ওয়ান টাইম গ্লাস, কাপ, প্লেটের ব্যবহারের আধিক্য দেখা যায়। ব্যবহারের পর এগুলো নর্দমা, জলাশয় অথবা মাটিতেই স্তূপাকারে ফেলা হয়। এভাবে প্লাস্টিকের বর্জ্য নর্দমা আটকে দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বন্যার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। কোনো কোনো সময় গৃহপালিত পশুপাখিও এ ধরনের বর্জ্য খেয়ে বিপদ বাড়িয়ে তোলে।

প্লাস্টিকের তৈরি ওয়ান টাইম গ্লাস, কাপ বা প্লেটগুলো পুনঃব্যবহার করা যাচ্ছে না। যার ফলে, এ রকম ওয়ান টাইম জিনিসগুলোর উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সঙ্গে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তাহলে এই একটি জিনিস একই সঙ্গে তার উৎপাদন ব্যবস্থায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করছে এবং অপচনশীলতার কারণে পরিবেশে বর্জ্য হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। পুনঃচক্রায়ন করলেও এটি আবার কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করবে।

প্লাস্টিকের আরেকটি পরিবেশগত সমস্যা হচ্ছে সাগর দূষণ এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ২০১৭ সালের ইউএনইপি-এর তথ্য মতে, প্রতিবছর অন্তত ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সাগরে প্রবেশ করে। সমুদ্রে যে প্লাস্টিক পাওয়া গেছে তার ৮০ শতাংশই ভূমি থেকে সমুদ্রে প্রবেশ করেছে। এলেন ম্যাক আর্থার ফাউন্ডেশন ২০১৭ সালে এক হিসাব কষে জানিয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে আমরা দেখব, সাগরে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি। যার ফলে জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র বিঘ্নিত হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড এনিম্যাল প্রোটেকশন-এর তথ্যমতে, সাগরে প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়েছে যা আকারে অনেক ছোট। সাগরের প্রাণী প্রায়ই মাইক্রোপ্লাস্টিক খাচ্ছে যেটা তাদের বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করছে এবং বংশবৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের Proceedings of the National Academy of Science-এ প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, শঙ্খচিলসহ সামুদ্রিক পাখির ৯০ শতাংশের পাকস্থলীতে প্লাস্টিক রয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের যে সাম্প্রতিক চিত্র আমরা দেখি তাতে মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশকে দূষিত করেই চলেছে। বিশ্বের জলবায়ু গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রী থেকে তৈরি দূষণ বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণকে বৃদ্ধি করে চলেছে। তা ছাড়া প্লাস্টিক দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। এসডিও এর ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা মতে, এগুলো ডাই অক্সিন এবং হাইড্রোজেন সায়ানাইড নামক পদার্থ তৈরি করে যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। তাই আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা হোক প্লাস্টিকের বিকল্প অন্বেষণ।

এ পরিপ্রেক্ষিতে সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ রোধে ইন্দোনেশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর পরিকল্পনা করেছে। কেনিয়া, চিলি, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, পানামা ও ফিলিপাইন আইন প্রণয়নসহ জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কানাডা কমিউনিটিভিত্তিক সমুদ্রতীর পরিষ্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ফিনল্যান্ড, সুইডেন, আইসল্যান্ড প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রভিত্তিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রসার ঘটার প্রত্যাশা করা হলেও বিশ্বব্যাপী বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবহেলা প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব এক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

নতুন প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে গ্রাফিন ও জৈব প্লাস্টিক। গ্রাফিন এক নতুন ধরনের কার্বনঘটিত পদার্থ, যা প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। গ্রাফিন তৈরিতে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে জৈব প্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পদার্থ।

আমরা আমাদের আচরণ ও ভোগব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে যেমন প্যাকেজিং উপকরণ, প্লাস্টিক বোতলের পরিবর্তে মাটিতে মিশে যায় এমন পাটের ব্যাগ বা কাচের বোতল ব্যবহার করতে পারি যা আগেও করতাম। প্রাইভেট সেক্টরকে উৎসাহিত করতে হবে যেন তারা প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন হ্রাস করে মাটিতে মিশে যায় এমন পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। সবশেষে, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে আমাদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে সঙ্গে সরকারকেও কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। সময় এসেছে এখন সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করে প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা এবং পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা। আমাদের এমন সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে যেন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারী পর্যন্ত সবাই প্লাস্টিক পণ্যের বিকল্প ব্যবহার শুরু করতে বাধ্য হন।

২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যরে বিশেষ মন্ড থেকে পাওয়া ফেব্রিক্স দিয়ে। প্লাস্টিক বর্জ্যরে সচেতনতা তৈরিতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে মাছরাঙা টেলিভিশনের এক খবরে এসেছে, ইন্দোনেশিয়ার সুরাবাইয়া শহরকে ২০২০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যমুক্ত শহর গড়ার লক্ষ্যে বাস ভাড়া হিসেবে বোতল নেওয়া হয়। সেই বোতল বিক্রি করে বাস মালিকরা টাকা পান। প্লাস্টিক দূষণ থেকে পরিবেশ রক্ষায় এমন নতুন নতুন চিন্তাধারণার উদ্ভাবন করতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকেই যেন শিক্ষার্থীরা প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজগুলোতে মাঝেমাঝে সবার অংশগ্রহণে বোতল দিন, কলম নিন শীর্ষক কর্মসূচি গ্রহণ করে একই সঙ্গে প্লাস্টিক বোতল সংগ্রহ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

খালিদ বিন শাহজাহান : লেখক, কলামিস্ট
khalidsrijon@gmail.com