শ্রমিকদের দুর্ভোগ ও বৈষম্য

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

শ্রমিকদের দুর্ভোগ ও বৈষম্য

আশেক মাহমুদ ৯:০২ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০১৯

print
শ্রমিকদের দুর্ভোগ ও বৈষম্য

শ্রমিকদের শোষণ বঞ্চনা আর অবহেলা মানবসভ্যতার এক ঐতিহাসিক সংকট। সেই সংকট সভ্যতার বস্তুগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলছে। শ্রম শোষণ, অসম শ্রম বণ্টন, শ্রম দাসত্ব-এসবই চলছে উন্নয়নের নামে, মুনাফার নামে আর আধুনিকতার নামে। মুনাফার স্ফীতি বাড়লে শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নতি হয় না, কিন্তু মুনাফার কমতি হলে যেটুকু ভাগ্য ছিল সেটুকু হারানোর আশঙ্কায় দিন যায় শ্রমিকদের। সেই অবহেলিত শ্রমিকদের অধিকার পূরণের দাবি মাথায় রেখে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে মে দিবস। দিবস পালিত হলেও তাদের অধিকার লালিত হচ্ছে কিনা-তা যদি গুরুত্ব না পায়, সেটা হবে শ্রমিকদের জন্য আরও হতাশাব্যঞ্জক।

বাংলাদেশে কৃষি শ্রম আর শিল্প শ্রম-এ দুটোই আমাদের ভাত-কাপড়ের জোগান দেয়। কিন্তু সে-ই শ্রমিকদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার জোগান আমরা কি দিতে পেরেছি? নাকি তাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করছি, সেটা তো আমাদের ভেবে দেখা দরকার। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এখনো কৃষি শ্রমিকদের শ্রমমূল্য জমির মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় নির্ধারিত হয়। কৃষকদের মধ্যে যারা বর্গাচাষ করে তারা জিম্মি হয়ে থাকে এনজিওর অধিক সুদের কারবারের মধ্যে। সুদের বকেয়া শোধ করতে গিয়ে লাভের অঙ্ক তারা দেখতে পায় না। জমিদার আর সুদখোরদের হাতে পড়ে কৃষি শ্রমিকদের অসহায়ত্ব বেড়েই চলছে।

অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবন-মান নির্ধারিত হচ্ছে মালিক শ্রেণির মর্জি অনুযায়ী। সরকারিভাবে তাদের মজুরি কাঠামি নির্ধারিত হলেও তাতে শ্রমিকদের জীবন মান মুদ্রাস্ফীতির যায়গা থেকে যোজন যোজন দূরে। সে-ই মজুরি কাঠামোও মানা হচ্ছে না। পোশাক শ্রমিকদের প্রায়ই আন্দোলন করতে হয় বকেয়া বেতন দেওয়ার জন্য। মজুরি বৃদ্ধি তো দূরের কথা, বকেয়া বেতন পাওয়া নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সামনে কোরবানি ঈদ আসছে, দেখা যাবে হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বকেয়া ফিরে পাওয়ার আশায়। বোনাস হিসেবে তাদের অনেকেই পায় চাকরি হারানোর হুমকি।

অন্যান্য শ্রমিকের মতো পোশাক শ্রমিকদের দাবি একটাই-তাদের শ্রমের মূল্য ও বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা। কারণ তাদের শ্রম আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের অর্থনৈতিক খাতকে সমৃদ্ধ করেছে বহুগুণে। এই সমৃদ্ধির পেছনে রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম, যার আশি ভাগই নারী শ্রমিক। অথচ এই শ্রমিকদের জীবন-মান নিয়ে আমাদের ভাবনাই প্রমাণ করে আগেকার নারীদের মতো শ্রমিকদের বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের মূল্য সেই সনাতন জায়গায় রয়ে গেছে।

এই পোশাক শ্রমিকদের কাজই হলো মালিকদের মুনাফা লাভের পরিধি বাড়াতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা, মজুরি যা দেওয়া হয় তা সেবাপরায়ণ চিত্তে মেনে নেওয়া, সেই মজুরিতে যদি বেঁচে থাকা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন কষ্টকর হয় সেক্ষেত্রে মৌনতা অবলম্বন করা। মোটকথা মালিক-শ্রেণির সেবাদাস হয়ে তাদের সুখ সুবিধা ও অধিক মুনাফা লাভের বর্ধিত বাসনা পূরণ করতে শ্রমিকরা এক প্রকার বাধ্য, আর নারী শ্রমিক মানে তো অনুগত এক দাস।

এই কাঠামোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কোম্পানিগুলো। সমাজবিজ্ঞানী স্টপার অ্যান্ড ওয়াকার এ বিষয়ে উল্লেখ করেন, তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বে বিনিয়োগের মূল কারণ সবচেয়ে সস্তা মজুরি ও আনুগত্যের সংস্কৃতি। তাদের মতে, এসব দেশে অতি অল্প মজুরিতে অধিক উৎপাদন সম্ভব, এ ছাড়াও এখানকার নারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন গড়ে ওঠা আনুগত্যের সংস্কৃতি অধিক পণন্য উৎপাদনে দিয়েছে আলাদা মূল্য। এর ফলে পাশ্চাত্যের কোম্পানিগুলো এসব দেশের পণ্য পাশ্চাত্যে বাজারজাত করে ব্র্যান্ডমূল্যে অধিক মুনাফা নিশ্চিত করতে পারবে। এই সুবাদে আমাদের মতো দেশগুলোতে সস্তা শ্রম ও অতি সস্তা আনুগত্যশীল নারী শ্রম হয়ে গেছে বিনিয়োগের অন্যতম শক্তি।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সব ধরনের জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধ এবং এই বিধান কোনোভাবে লঙ্ঘিত হইলে তাহা আইনত দ-নীয় অপরাধ।’ অথচ বাস্তবে দেখা যায় গার্মেন্ট শ্রমিকরা আজ শুধু ন্যূনতম মজুরি থেকেই বঞ্চিত নয়, উপরন্তু তাদের ১০-১২ ঘণ্টা খাটানো হয় মূল শ্রম ও ওভারটাইম শ্রমের সমন্বয়ে। এখানে ওভারটাইম হলো এক ধরনের কৌশলী জবরদস্তি শ্রম। কেননা, মালিকপক্ষ ভালো করেই জানে নিয়মতান্ত্রিক শ্রমে ওদের সংসার তো চলবেই না বরং অনটনে কাটাতে হবে দিনরাত। এক নারী শ্রমিক বলেই বসলেন, ‘রাত ১০টা পর্যন্ত ওভারটাইম করেও আমি সব মিলাইয়া পাই ১০ হাজার টাকা। এখন ছেলের পড়াশোনার খরচ দেব? নাকি ২৮০০ টাকা বাসা ভাড়া দেব? তাহলে আমরা খাব কী? দেশে পাঠাব কী? (দৈনিক মানবজমিন, ১৫ জানুয়ারি ২০১৯)।

সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটানা খাটুনির পরও যদি পোশাক শ্রমিকদের ভাবতে হয় খাব কী- তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না কী পরিমাণে দাসবৃত্তিতে চলছে পোশাক শ্রমিকদের জীবনে। ওভারটাইম নামক কৌশলী জবরদস্তি শ্রমেও তারা তাদের ন্যূনতম বেঁচে থাকার অধিকার পায় না, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই দুঃখ কোথায় রাখি। এসব শ্রমিকদের জীবন বলতে, সংসার বলতে আর কী-ইবা থাকে। এমনও দেখা গেছে তাদের জাতীয় ছুটি কাটানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। কেননা তারা চালাকি করে ছুটি দেয় ঠিকই কিন্তু সেই ছুটির দিনের কাজ আদায় করে নেয় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, রুল জারি করে।

মোটের ওপর গার্মেন্ট শ্রমিকরা যে শুধু শ্রমিক তা নয়, তাদের মর্যাদা এখন ‘অনুগত দাস’-এর মতো, যে কিনা মালিক পক্ষকে তুষ্ট করবে মাত্রাধিক শ্রম আর দুঃসহ সময় দিয়ে, এর বিনিময়ে তারা মালিক পক্ষ থেকে কিনে নেবে সারা জীবনের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, বঞ্চনা আর লাঞ্ছনা।

আমরা কতজন খোঁজ রাখি তাদের জীবনমান নিয়ে? এই শ্রমিকরা বেঁচে থাকার অনুপযোগী বস্তিতে ঠাঁই পায়, ভোরে রান্না শেষ না হতেই অফিসে দৌড়; একটাই ভয় একটু দেরি হলেই দাঁড় করিয়ে শাস্তি দেবে দাগী আসামির মতো। দার্শনিক জর্জ বার্নাড শ বলে গেছেন, ‘মার্কিন শ্বেতাঙ্গরা কালোদের জুতো পালিশ বালকের পর্যায়ে নামিয়ে আনে।’ আজ দেখছি মালিক শ্রেণি শ্রমিকদের এক প্রকার আসামির পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। মনে হয় এদের কোনো সংসার নেই, ঘুম নেই, আনন্দ নেই, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সময় নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসার সাধ্য নেই, আত্মীয় থাকলে দেখা সাক্ষাতের সুযোগ নেই।

আজ দেখছি ‘নারী’ ও ‘শ্রমিক’ একাকার হয়ে মালিক শ্রেণির শোষণ, অত্যাচার সহ্য করে শুধু সামান্য দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে। অথচ মালিক শ্রেণি কোনো ধরনের কর্ণপাত না করে তাদের তালাকের হুমকি দেয়, এই তালাক মানে চাকরিচ্যুতির হুমকি। তাহলে কি মালিক শ্রেণির ক্ষমতায়নের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে এই পোশাক শ্রমিকদের জীবন ও অধিকার? ‘নারী’ ও ‘শ্রমিকের’ ক্ষমতায়ন আজ বন্দিখানায় আটকা পড়ে গেছে। সমাজের ছাত্রসমাজ, জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন সিভিল সোসাইটি যদি ‘শ্রমিক’দের অধিকার নিয়ে কথা না বলে তাহলে জাতীয় উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকারের কাছে আমাদের দাবি, প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পুরো এক বছরের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করতে মালিকরা যেন বাধ্য থাকে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হোক।

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ashmahmud@gmail.com