তিস্তাপারে দীর্ঘশ্বাস, ছিটমহলে সুবাতাস

ঢাকা, বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯ | ১২ আষাঢ় ১৪২৬

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী-৪৮

তিস্তাপারে দীর্ঘশ্বাস, ছিটমহলে সুবাতাস

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৯:১১ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৯

print
তিস্তাপারে দীর্ঘশ্বাস, ছিটমহলে সুবাতাস

২০১৫ সালের আগে দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছিল, তাদের পার্শ্ববর্তী দেশের জনগণ অসুস্থ হলে সরকারি চিকিৎসা নিচ্ছে, বন্যা-খড়ায় সম্পদ নষ্ট হলে সরকার কিংবা বেসরকারি সংস্থা পাশে দাঁড়াচ্ছে। ছিটমহলের বাইরের শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে, ছিটমহলের মানুষ নিজেদের সন্তানকে স্কুলে দিতে হলে সন্তানের মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করতে হতো। ছিটের ভেতরে বিদ্যুৎ ছিল না, সড়ক ছিল না। নিজ দেশের মুদ্রার প্রচলন ছিল না। ছিটমহল থেকে বাইরে বেরুলেই ছিটমহলবাসী দেখে পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিপদে পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা। ছিটমহলের মানুষ দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে অসহায়ের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের মানুষের দেখেছিল আর নিজেদের কষ্টের রংকে আরও গাঢ় করে তুলেছিল। ছিটমহল বিনিময়ের সিদ্ধান্তে তাদের আনন্দের গভীরতাতেই বোঝা গেছে তারা কত গভীর যন্ত্রণাবিদ্ধ জীবন অতিবাহিত করেছিল। মিথ্যার বৃত্তে বন্দি জীবন ছিল ওদের।

দীর্ঘ ৬৮ বছরের মিথ্যাচার, নিজ দেশে পরবাসী জীবন, অভিভাবকহীনতা সবকিছুর অবসান ঘটেছে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয় ছিটমহল বিনিময়। সে কারণে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে ছিল আনন্দের বন্যা। স্বস্তির সুবাতাসে ভরপুর। ছিটমহলবাসী যেন প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে।  বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে কয়েকশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের জন্য। সরকারের এ উদ্যোগে ছিটমহলবাসী আরও উল্লসিত। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়ক, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিলুপ্ত ছিটমহল পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বিগত ৬৮ বছরে যে জমি বিক্রি হয়েছে সেই জমির বৈধ মালিকানা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বিলুপ্ত ছিটমহলের সমন্বয় কমিটির দাসিয়ার ছড়া-এর সাধারণ সম্পাদক মোজাফফর হোসেন বলেছিলেন, ‘আমরা তো জমি কেনা-বেচা করেছি সাদা কাগজে লিখে। কয়েকজন লোক শুধু সাক্ষী থাকত।’

সেই সাদা কাগজ তো আইনি কাগজ নয়। অনেকেই ছিটমহলের জমি বিক্রি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে বাড়ি করেছে। তারা যদি এখন সেই জমিতে অধিকার দাবি করে সেই সমস্যা কীভাবে দূর হবে? জমির প্রকৃত মালিক যদি জমি থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে তাদের বাকি জীবন আদালতের দ্বারেই হয়তো কেটে যাওয়ার কথা ছিল। সরকার বিলুপ্ত ছিটমহলের সেই সংকট দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীকে সেই সমস্যায় পড়তে হয়নি।

বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী দেশবাসীর মতো উদযাপন করছে বাংলাদেশের সব জাতীয় উৎসব। এর আগেও তারা বিজয় দিবস পালন করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল বন্দি জীবন থেকে বিজয় উৎসব পালন করা। আর এখন তারা স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে প্রকৃত উৎসব যাপন করছে। দেশের সব জাতীয় উৎসবে এখন তাদের সমান আনন্দ।

বিলুপ্ত ছিটমহলে যখন আনন্দ আর আনন্দ, ঠিক তখন তার উল্টো চিত্র তিস্তা তীরবর্তী মানুষের এবং তিস্তা সেচ প্রকল্পে এক সময়ের সুবিধাভোগীদের। অধিক শোকে তারা যেন পাথরের মতো হয়ে আছে।

কিছুদিন আগে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবলু বলছিলেন, ‘তিস্তায় পানি না থাকার কারণে ধান চাষে অনেক ক্ষতি হইচে। অনেকে বালিশ চাপা দিয়া কানতেছে। যারা জমির ওপর নির্ভর করি বাঁচে, তাদের জমি বিক্রি করি খাওয়া ছাড়া উপায় নাই।’

পাশেই দাঁড়ানো একই ইউনিয়নের লালচাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা বলছিলেন, ‘টিভির পর্দাত দেখছি মোদি তিস্তার সমাধান করে না। পানিটাই এক নম্বর সমস্যা। ওইটার আলাপ নাই।’

সলেয়াহ শাহ বাজারের মায়ের দোয়া ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক আলমগীর তিস্তা প্রসঙ্গে বড় বড় রাজনৈতিক দলের নীরবতার কথা বলতে গিয়ে বলছিলেন ‘দেশের স্বার্থে কেউ আন্দোলন করে না। বিএনপি আওয়ামী লীগ শুধু চেয়ারের জন্য আন্দোলন করে। সাধারণ মানুষের জন্য কেউ নেই।’

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকারচলি ইউনিয়নের বালাবাড়ি বাজারে ছোট্ট চায়ের দোকানে তিস্তা প্রসঙ্গ তুলতেই বিভিন্ন বয়সী ২০-২৫ জন লোকের সমাগম হয়েছিল। সবার কণ্ঠে ক্ষোভ আর হতাশা ঝরে পড়ছিল। মশিয়ার নামে একজন বলছিলেন, ‘মেম্বার-চেয়ারম্যানোক পানির কথা কছি। আন্দোলন করলে তো সরকার ধরি নিয়া যাইবে। সে জন্য আল্লাহক বিচার দিছি।’ আফজাল নামের একজন অশীতিপর বৃদ্ধ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই যেন বলছিলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি দেবে; মোর বিশ্বাস হয় না।’ ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলছিলেন, ‘আমরা তো ভাবছিলাম কয় বছর আগোত মোদি-মমতা তিস্তার পানি নিয়া কথা কবার জন্য বাংলাদেশ আসছিল। পানির কথাই না কইবে তা আসছিল কেন?’ তিস্তা সেচ প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা যদি সেচ সুবিধা পেত তাহলে এ বছর তারা ধানের দাম কম হলেও ক্ষতির মধ্যে পড়ত না। এখন ২০-২৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কার্যত তিস্তার পানির অভাবে সেচ প্রকল্প অচল হওয়ার জোগাড়।

২০১১ সালে মনমোহন সিং এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ সফরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু  শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পানি বণ্টন চুক্তিতে বাধা দেন এবং বাংলাদেশ সফর বাতিল করেন। সে কারণে সে বছর চুক্তি হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হয়নি এমনটাই জনমনে বদ্ধ ধারণা। মনমোহন সিং চলে যাওয়ার পর বিজেপি টানা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির এখন তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে আর কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এখন তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হবে এমনটাই তিস্তাপারের মানুষ আশা করছে।
২০১১ সালের তিস্তা বাস্তবতা আর ২০১৯ সালের তিস্তা বাস্তবতা এক রকম নয়। ২০১১ সালে ভারত তিস্তার সবটুকু পানি একতরফা প্রত্যাহার করেনি।

কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করেছে। সে কারণে বাংলাদেশের জন্য ২০১১ সালের চেয়েও জরুরি হয়ে পড়েছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়া। বাংলাদেশ-ভারত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের এক নম্বর এজেন্ডা হওয়া উচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি। তিস্তাপারের কোটি মানুষের মলিন মুখ, অসহায় অবস্থা, চোখে মুখে অনিশ্চয়তার শঙ্কাÑসব কিছুই বাংলাদেশ-ভারত সরকারের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে?   

২০১৫ সালে প্রথম আলো পত্রিকায় অ্যাকশন এইডের গবেষণানির্ভর ‘তিস্তাপারের ৩৫ শতাংশ মানুষ পেশা হারিয়েছে’ শীর্ষক খবরে তিস্তায় পানি না থাকার কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে  যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেনের সেই সময়ের মন্তব্যেই বোঝা গেছে, তিস্তা সম্পর্কে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা কতটা অজ্ঞ। তিনি নদীনির্ভর মানুষের ক্ষয়ক্ষতির দিকটি আমলে নিতে চান না। এমনকি জেলে-মাঝিদের পেশা হারানোর ঘটনাটিকে স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন। শুধু তাই নয় তিনি বলেছেন ‘আগের চেয়ে ভাঙনের পরিমাণ বরং কমেছে।’ এই যদি হয় যৌথ নদী কমিশনের সদস্যের মতামত, তাহলে তারা ভারতের কাছে পানির দাবি করবে কীভাবে?

বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ চেষ্টায় ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার মতোই একটি কাজ। কিন্তু তিস্তাপারের মানুষ যে প্রতি মুহূর্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে তা কি বন্ধ হবে না? তিস্তায় শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না এর সম্পূর্ণ দায় ভারতের। তিস্তা নিয়ে নদীকর্মীরা যত আন্দোলনই করুক না কেন, সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। সেই রাষ্ট্রই যদি তিস্তার বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, তাহলে এ সমস্যা দূরীকরণে কে ভূমিকা পালন করবে?
উভয় দেশের সরকার যতই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুক তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, এতে কিন্তু প্রকৃতি থেমে থাকবে না। প্রকৃতি এতে বিমুখ হবে এবং উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করবে। সে কারণে উত্তরাঞ্চল বাঁচাতে তিস্তায় পানি প্রবাহ ঠিক রাখার কোনো বিকল্প নেই।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও পরিচালক, রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com