তামাক চাষের কুফল ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

তামাক চাষের কুফল ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মোশারফ হোসেন ৯:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ০৯, ২০১৯

print
তামাক চাষের কুফল ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। নানা কারণে আবাদি জমি আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। খাদ্য, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্বের বিপণ্নতা বাড়ছে। যেখানে খাদ্যশস্যের জমিতে তামাক চাষ নিশ্চিতভাবেই অশনিসংকেত ছাড়া কিছু নয়। তামাক একটি আগ্রাসী ফসল। অর্থকরী ফসল হিসেবে যদিও দাবি করা হয়, আসলে লাভের অংশ একটু সচেতনভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, খাদ্যশস্য উৎপাদন তামাক চাষের থেকেও আরও বেশি লাভজনক।

যেমন তামাক চাষ করলে অন্য ফসল উৎপাদন করে কাক্সিক্ষত লাভ পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য কোটি কোটি টাকার আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে দেশ। যেটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শস্য বৈচিত্র্যতার ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পের কাঁচামাল সংকট দেখা দিচ্ছে। যার পরিণতি দাঁড়াচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, নিজস্ব শিল্পকারখানার ভঙ্গুর অবস্থা। তামাক চাষের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন শুধু নির্দিষ্ট একক কোনো দেশ নয়, এটি সারা বিশ্বের পরিবেশ স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্যের এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তামাক চাষের জমিতে অন্য ফসল সময়মতো চাষ করা যায় না। তামাক চাষের জন্য অধিক উর্বর জমি দরকার হয়। রবিশস্যের জন্য আর সেই উর্বর জমি থাকে না। শেষ পর্যন্ত ফসলি জমির হার ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে প্রান্তিকে চলে যায়।

যেসব জমিতে আগে চাষ হতো ধান, গম, পিয়াজ, রসুন, আলু, পটোল, সরিষা, পাট ইত্যাদি মৌসুমি ফল-ফসল সবজিসহ অর্থকরী ফসল, সেখানে চাষ হচ্ছে প্রকৃতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতিকর তামাক। যেটি কোনো খাদ্য ফসল নয়, কোনো প্রয়োজনীয় শিল্পের কাঁচামালও নয়।

যে কোনো ধরনের তামাকই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তামাকের ক্ষতির বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পায় না লাভপ্রত্যাশী উৎপাদকারী কৃষক, আগামীর সম্ভাবনাময় শিশু, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তথা পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র, পুরো বিশ্ব। অনেক ধনী সচেতন দেশ তামাক চাষের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তারা তাদের সচেতনতা দেশপ্রেমের মানসিকতা থেকে সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফল হিসেবে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তামাক চাষ বন্ধ করেছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশ তথা উন্নয়শীল দেশ হিসেবে আমরা তামাকের ক্ষতির ব্যাপারে এখনো উদাসীন। বাংলাদেশের যেসব জায়গায় তামাক চাষ হয়ে থাকে তার মধ্যে- রংপুর, লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, বান্দরবান, কক্সবাজার অন্যতম।

কিছু অসাধু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে দেশ ও দশের কথা ভুলে গিয়ে, ভবিষ্যতের সুন্দর আগামী চিন্তা থেকে দূরে সরে গিয়ে, খেয়াল-খুশিমতো পরিবেশ-প্রতিবেশ জনস্বাস্থ্যের হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশ ও জাতিকে হত্যালীলা মত্ত হয়ে নির্মমতার পরিচয় দিচ্ছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। তামাক জাত দ্রব্যের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, জাতীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, সুস্থ-সবল মেধাবী, নেশামুক্ত সুন্দর উন্নত মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই অন্তরায়। যেটি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নত রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চিত হুমকি ছাড়া কিছু নয়।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা জেনেও বেশি মুনাফা লাভের লোভে পড়ে সহজ- সরল সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষি তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছে, টোব্যাকো কোম্পানির নানা প্রলোভনে।

কৃষকদের বেশি, মুনাফার ফাঁদে ফেলে বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করছে। যেখানে অন্য খাদ্য ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ-সুবিধাসহ সহজ শর্তে ঋণ প্রদান দেখা যায় না। অগ্রিম অর্থ নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার মধ্য দিয়ে তাদের দিয়ে কৌশলে তামাক চাষ করাচ্ছে, মুনাফালোভী কারবারি।

দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষ করার কারণে জমির উর্বরা শক্তি দিন দিন কমতে থাকে একই জমিতে টানা কয়েক বছর তামাক চাষের কারণে জন্মাচ্ছে ক্ষতিকর এক ধরনের আগাছা যেটি ক্লোরোফিলবিহীন। এটি জমির উর্বরতা, পানির ধারণক্ষমতা, মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে, একটা পর্যায়ে এসব জমিতে অন্য কোনো ফসল হয় না। টোব্যাকো কোম্পানি তামাক চাষের জন্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় স্থানান্তরিত হয়। উর্বর জমি ব্যবহার শেষ হলে, অন্য জেলায় তাদের কৌশলগত বিষয়টি প্রয়োগ করে পুনরায় চাষ শুরু করে।

বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, একজন কৃষক তামাক চাষ করে যে টাকা উপার্জন করে, তার চেয়ে বেশি টাকার তামাক চাষের অর্থ দিয়ে বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে হয় নগদ দিয়ে। যেটি সারা বছরের খাদ্য ক্রয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। আবার আবহাওয়া-জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোতে পৃথিবীকে মোকাবেলা করতে হবে মারাত্মক কিছু সমস্যা। তীব্র তাপদাহ, বন্যা, খরা, ভূমিক্ষয়, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বিভিন্ন সংক্রামক-অসংক্রামক রোগবালাই, খাদ্য সংকট, মেরুতে বরফ গলা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, পরিবেশ স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি। মনুষ্যসৃষ্ট অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিনিয়ত প্রকৃতি পাল্টা জবাব দিচ্ছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, মিথেন, কার্বন মনো-অক্সাইড ইত্যাদি বেড়েই চলছে, যার দরুন উৎপাদিত শস্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, গুণগত পুষ্টিমান হ্রাস পাচ্ছে।

বিশেষ করে ফসলের পুষ্টি উপাদান যেমন- জিংক, আয়রন, কপার, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যেটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শেষ পর্যন্ত মানবদেহের ওপর। পরিণতি হচ্ছে রুগ্ন-শুকনো, মেধাহীন, দুর্বল চিত্তের, অসুস্থ জাতি। খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো দেশ তথা বিশ্বকে। সুস্থ দেহ, সুস্থ মন, কর্মব্যস্ত, সুখী-সমৃদ্ধি জীবন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রজন্ম।

হিসাব করলে দেখা যায়, তামাক পাতাকে প্রক্রিয়াজাত করতে অনেক জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে। তামাক পোড়ানোর এলাকা দূষিত হওয়ার কারণে তীব্র শ্বাসকষ্ট চোখ জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, ফুসফুস সমস্যা, হাঁচি, কাশি ইত্যাদি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠের জন্য উজাড় হচ্ছে প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু পরিবেশ সুরক্ষাকারী বৃক্ষ। যেখানে একটি দেশের আয়তনের প্রায় ২৫% বন থাকা খুব জরুরি, সেখানে বন তথা বৃক্ষ পোড়ানো, পরিবেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

তামাক চাষের জন্য মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োজন পড়ে। জানা যায়, তামাকের জমিতে প্রায় ৭-৮ জন অন্য ফসলের চেয়ে বেশি সার-বিষপ্রয়োগ করতে হয়। এর ফলে মাটি, পানি, বায়ু দূষিত হয় নানা উপায়ে। অধিক মাত্রায় এগুলো প্রয়োগের ফলে, প্রয়োগকৃত সার, বিষ গড়িয়ে নদীনালা, খালবিল, পুকুর ডোবা-বিলঝিলে গিয়ে পড়ে।

তাতে প্রাকৃতিক জলজ প্রাণী ও জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, কেচো, সাপ, মৌমাছি, গরু-ছাগল এবং পরিবেশের জন্য উপকারী প্রাণীকুল তথা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। যে কারণে নানা সময় নানাভাবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিয়ে থাকে আমাদের ওপর।

তামাক চাষি তামাকের জমিতে সার, কীটনাশকের ব্যবহারকালে যথাযথ স্বাস্থ্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কৃষকসহ পরিবারের সবাই। তামাকের নিকোটিন ভেজা অবস্থায় হাতের স্পর্শে অথবা শরীরে ছিটে পড়লে, লোমকূপের মাধ্যমে চামড়ায় প্রবেশ করলে নানা ধরনের চর্মরোগ, পেটের পীড়া, মহিলাদের বাচ্চা নষ্ট হওয়া, যৌন ক্ষমতা হ্রাস, বিকলাঙ্গ বাচ্চা প্রসবসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। তামাক জাত দ্রব্য থেকে উৎপন্ন সিগারেট, জর্দা, গুল, চুরুট, সাদাপাতা ইত্যাদি ব্যবহারের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক বিকারগ্রস্ততা, দন্তক্ষয়, ক্ষুধা মন্দা, মুখে লালা ঝরা, মাথাব্যথা, চুলকানি, আলসার, মুখে ঘা, শরীরে ক্ষত সৃষ্টি, স্মৃতিশক্তি লোপ, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি অসংক্রামক রোগ হতে পারে।

তামাক জাত দ্রব্য ব্যবহারজনিত কারণে সারা বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে একজন লোক ক্যান্সার, হৃদরোগ, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিকস ইত্যাদি বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রাণঘাতী রোগ হয়ে থাকে। প্রাথমিকভাবে বিড়ি সিগারেটের নেশা থেকে বড় ধরনের নেশা যেমন- মদ, গাজা, আফিম, হেরোইন ইত্যাদি নেশা এবং বড় ধরনের অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

তামাক নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক প্রকাশনা দ্য টোব্যাকো এটলাস-এর ২০১৮ সালে সংস্করণে বলা হয়েছে, প্রতিবছর ১ লাখ ৬২ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে তামাক জাত দ্রব্য ব্যবহারজনিত কারণে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, সরকার সব ধরনের তামাক থেকে যত রাজস্ব পায় তার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। দেশের জিডিপির প্রায় ৩% তামাকজনিত কারণে অপচয় হয়। তাই খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য পুষ্টি, শিক্ষা, কৃষি অর্থনীতি, গৃহস্থালি, জলবায়ু-আবহাওয়া, মাটি, পানি, মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়ন পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা তথা টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে তামাক চাষ বন্ধ করা জরুরি।

মোশারফ হোসেন : শিক্ষক, সরকারি ইস্পাহানী কলেজ
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
mamun86cu@gmail.com