পুকুর নয়, প্রবহমান নদী চাই

ঢাকা, রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৭ আশ্বিন ১৪২৬

প্রতিক্রিয়া

পুকুর নয়, প্রবহমান নদী চাই

রাকিব সিদ্দিকী ৯:৩৮ অপরাহ্ণ, জুন ০৮, ২০১৯

print
পুকুর নয়, প্রবহমান নদী চাই

গত ১৫ মে ২০১৯ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় ড. তুহিন ওয়াদুদ-এর ‘চাকিরপশার নদী কি উদ্ধার হবে?’ শিরোনামের একটি লেখার পরিপ্রেক্ষিতে সংগত কারণে আমার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার প্রয়াস পেয়েছি। প্রথমত, আমি একাত্মতা পোষণ করছি এবং এ আন্দোলনে শরিক হওয়ার আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করছি। দ্বিতীয়ত, লেখকের লেখার শিরোনামে প্রশ্নবোধক চিহ্ন(?) থাকার বিষয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। চাকিরপশার নদী শুধু উদ্ধারই না বরং যারা রাষ্ট্রের সম্পত্তি এতদিন যাবৎ দখল করে আছে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা প্রয়োজন। আমরা সবাই চাইলে গুটিকয়েক অবৈধ দখলদারের হাত থেকে এ নদী উদ্ধার করা কোনো কঠিন বিষয় হওয়ার কথা নয়। চাকিরপশার নদী উদ্ধার হবে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নয়।

অনেকদিন ধরে ড. তুহিন ওয়াদুদকে আমরা নদীবিষয়ক নানাবিধ সৃজনশীল কাজ করতে দেখে আসছি। সম্প্রতি ‘দেওনাই’ নামে সম্পূর্ণ দখল হয়ে যাওয়া একটি নদী উদ্ধার করে তারা আন্দোলনে সফলতার মাইলফলক উন্মোচন করেছেন। আজ তার নিজ গ্রামের চাকিরপশার নদীটি উদ্ধার করতে তার বলিষ্ঠ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং সেই সঙ্গে তার নেতৃত্বে সহযোগিতা ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী অত্র এলাকাবাসী সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে নদীটিকে তার স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে দিয়ে আরেকটি ইতিহাস রচনা করতে চায়।

আমার জানামতে বর্তমানে নাফাডাঙ্গা মৌজার আরএস (Revisional Surve) রেকর্ড সংশোধনের কাজ চলছে। যে মৌজার মধ্য দিয়ে চাকিরপশার নদীটির একটি বৃহৎ অংশ অতিক্রম করেছে। যাদের ব্যক্তিগত মালিকানার অংশে রেকর্ড সংক্রান্ত ত্রুটি রয়েছে তাদের সংশোধনের জন্য রাজারহাট সেটেলমেন্ট অফিস থেকে নোটিস করা হয়েছে। আমারও জমি সেখানে থাকায় গেল মাসে আমাকেও নোটিস করা হয়েছিল এবং আমি যথারীতি সেখানে গিয়ে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছি।

সংশ্লিষ্ট মালিকগণের অধিকাংশই তাদের খতিয়ান পর্চায় উল্লিখিত পরিমাণের অধিক জমি দখল করে রয়েছে। কারও অংশ অন্য কারও মধ্যে কিঞ্চিৎ চলে গেলেও তারা জোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেউই তার অংশ থেকে কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড় দেয়নি বা দিচ্ছে না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বেশি পরিমাণ জমি দখল করে আছেন বা পুকুর তৈরি করে ভোগ করছেন তারা বেশিটুকু নিয়েছে নদীর কাছ থেকে। কারণ নদীর পক্ষে কেউ প্রতিবাদ করতে আসছে না। নদী রাষ্ট্র তথা জনগণের সম্পত্তি।

নদীর পক্ষে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাগণের ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু অসাধু দখলদার দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে তারাও নিশ্চুপ। এসব অরাজকতার হাত থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ জনগণকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। সিএস নকশা অনুযায়ী নদীর গতিপথ উদ্ধার করে তার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এই চাকিরপশার নদীর কোল ঘেঁষে আমার ১২৫ শতাংশের একটি পুকুর রয়েছে যার সিএস রেকর্ডে মালিক আমার দাদা, এসএ ও আরএস রেকর্ডে মালিক আমার বাবা এবং বর্তমানে আমি পৈতৃক ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে মালিক ও দখলদার বহাল আছি। আমার জানামতে এটিই উক্ত এলাকার সবচেয়ে ছোট ও পরিমাপে সঠিক একমাত্র পুকুর। ছোটবেলায় দেখেছি, এই নদীর পাশে আমাদের জমি আছে যেখানে বর্ষাকালে ভরপুর পানি থাকত আর খরা মৌসুমে বোরো ধানের আবাদ হতো। অত্র এলাকার অনেক লোক বংশ পরম্পরায় মৎস্যজীবী। তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় মৎস্য শিকার। নদী বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা সম্পূর্ণরূপে বেকার জীবনযাপন করছে।

বেকারত্বের কারণে কেউ কেউ অপরাধ ও নেশার জগতে প্রবেশ করে হতাশ জীবনযাপন করছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, প্রতিদিন আমাদের ভাতের সঙ্গে মাছ থাকত, বাহারি সব দেশি প্রজাতির মাছ। ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি আমরা শৈশবেই আত্মস্থ করেছিলাম বাস্তবিক অর্থেই যা আজ শুধুই স্মৃতি! আমার মেয়ের কাছে যখন ওইসব নানা জাতের সুস্বাদু মাছের সহজলভ্যতার গল্প করি, তখন সে রূপকথার গল্পের মতো মনোযোগ দিয়ে শোনে আর হাজার প্রশ্ন করে।

এখন নদী হয়েছে পুকুর আর দেশীয় মাছ হয়েছে হাইব্রিড। কৃত্রিম খাবার (ফিড) খাইয়ে গরু ছাগলের মতো মাছকেও অল্প সময়ের মধ্যে মোটাতাজাকরণ করে বাজারজাত করা হচ্ছে বেশি লাভের আশায়। আর সেসব চাষের মাছ ভাতের মতো স্বাদ!

বর্ষাকালে নদী যখন কানায় কানায় পূর্ণ হতো তখন আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে দেখতাম, ওই জায়গাটায় শুকনো মৌসুমে আমাদের ধানক্ষেত ছিল। ভরা নদীতে নৌকায় চড়ে শাপলা ফুল তুলতাম, কতই না মজা হতো! তারপর যখন একটু বড় হলাম, মাধ্যমিকের গাণ্ডি পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে পদার্পণ করলাম তখন পরিবার থেকে বাড়ির বাইরে যাওয়ার কিছুটা সুযোগ তৈরি হলো। মনে পড়ে, তারপর বহু বছর প্রত্যেক শুক্ল পক্ষের পূর্ণ তিথিতে আমি আর তুহিন ভাই রাতভর নৌকায় চড়ে ওই নদীতে পূর্ণিমা উপভোগ করেছি। সব যেন আজ শুধুই স্মৃতিচারণ মাত্র।

আসলে যে কথাটি বলার জন্য লিখতে শুরু করেছিলাম তা হলো ওই প্রবহমান নদীটির অধিকাংশই আজ ছোট বড় অনেক পুকুরে সয়লাব হয়ে গেছে অবৈধ দখলদারদের দ্বারা। বছরে দু’একবার যাই, পুকুর পাড়ে দাঁড়াই, একান্ত নিজের একটা পুকুর থাকার গর্বও অনুভব হয় বটে, তবে অতীতের সেই নদীর স্রোতধারা চোখে ভাসে আজও। আজ সময়ের প্রয়োজনে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নদীমাতৃক দেশ ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ অনূভব করে সর্বসাধারণের মধ্যে নদী উদ্ধারের যে বোধোদয় হয়েছে তাতে আমি সম্পূর্ণ সহমত পোষণ করি।

নদীটিকে তার গতি ফিরিয়ে দিতে যদি আমার পুকুরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় তবুও আমি কষ্ট পাব না। আমার মন পুকুর চায় না, প্রবহমান জীবন্ত একটি নদী চায়। বাঁচুক নদী, ফিরে আসুক অতীতের সেসব সুখকর স্মৃতি। আমি পাড় বাঁধানো স্থির একটি পুকুর চাই না, স্রোতস্বিনী বহমান একটি নদী চাই। সারা দেশের সব নদী অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার ও রক্ষা হোক, নদী আন্দোলন সফল হোক।

রাকিব সিদ্দিকী
অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, ঢাকা