মিডিয়া আমার ইংরেজি শিক্ষক

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

মিডিয়া আমার ইংরেজি শিক্ষক

মাসুদ কামাল হিন্দোল ১০:২১ অপরাহ্ণ, জুন ০৭, ২০১৯

print
মিডিয়া আমার ইংরেজি শিক্ষক

ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষার প্রতি আমার একটা ঝোঁক ছিল। যদিও আমি ইংরেজিতে ভালো ছিলাম না। কলেজ পাস করার পরও ইংরেজির ঝোঁকটা অব্যাহত ছিল। আন্তর্জাতিক ভাষাটা শেখার চেষ্টা করেছি নানাভাবে। মরীচিকার পেছনে হরিণ যেভাবে ছুটে বেড়ায় ঠিক সেভাবেই ছুটেছি। শিক্ষকদের কাছে গিয়েছি, কোচিং সেন্টারে গিয়েছি, এমনকি পরিচিত সিনিয়র ভাইদের কাছেও। তারা কেউ আমকে সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে পারেননি।

 

সে সময় আমাদের দেশের অধিকাংশ ইংরেজি শিক্ষকই জানতেন না একটা ভাষা কীভাবে শেখাতে হয় বা শিখতে হয়। যে কোনো ভাষার চারটি স্তর থাকে। লিসেনিং স্পোকেন রিডিং ও রাইটিং। আমাদের শিক্ষকদের অধিকাংশের স্পোকেন ও লিসেনিংয়ের সঙ্গে তেমন একটা সম্পর্ক ছিল না। তারা ইংরেজি বাংলাতেই পড়াতেন। কলেজ পর্যায়ে দু-একজন ইংরেজিতে কিছুটা পড়াতেন। বাকিদেরটা ইংরেজি না বলে বাংরেজি বলাই উত্তম।

তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল টেন্স। তারা শুধু আমাদের টেন্স শেখাতে চাইতেন। ১২টি টেন্সের মধ্যে চারটির ব্যবহার নেই বললেই চলে। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ বুঝলেই ইংরেজি মোটামুটি বোঝা ও বলা চলে। আমাদের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকরা আমাদের টেন্সের কারেন্ট জালে আটকে রেখেছিলেন। তাই টেন্স শিখতে গিয়ে আমাদের অনেকটা সময় চলে গেছে।

তারা আরও বলতেন ডিকশনারি মুখস্থ করতে ইংরেজি শেখার জন্য। এটাও আরেকটি ভুল পদক্ষেপ ছিল। ডিকশনারি মুখস্থ করে ইংরেজি শেখা যায় না। ফলে ছাত্র-শিক্ষক কারোই তেমন একটা উত্তরণ ঘটেনি ইংরেজিতে। ইংরেজি নিয়ে দীর্ঘদিন ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের দেশে যারা ভালো ইংরেজি পারেন তারাও চান না এ দেশের মানুষ ইংরেজি শিখুক। আভিজাত্যের ভাষা ইংরেজি। ইংরেজি ব্যবহার করেন দেশের এক-শতাংশ মানুষ। এটা কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। গণমানুষের ভাষা হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার এ ধারণা ভুলও হতে পারে।

সে সময় গুরুজনরা ইংরেজি শেখার জন্য উপদেশ দিতেন। এইচএসসি পাস করার পর আমার আব্বা বলেছিলেন তোমাকে ইংরেজি শিখতে হবে। ইংরেজি পত্রিকা পড়তে হবে। আমাকে উৎসাহিত করার জন্য কিনে দিয়েছিলেন বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা রিডার ডাইজেস্ট। তখন আমাদের দেশে বাংলাদেশ অবজারভার, বাংলাদেশ টাইমস, দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য নিউ নেশন জনপ্রিয় ছিল। বিশেষত আমরা বড়দের পরামর্শে অবজারভার পড়তাম। অনেকটা এসো নিজে করি নিজে পড়ির মতো করে। এর বেশ কয়েক বছর পর বাজারে বই বের হয়, হাউ টু রিড ইংলিশ নিউজপেপার (Professor’s Prokashon-By MD Fazlul Haque and MD Shamim Mondol)। এ বইটি আমাদের অনেকের কাজে লেগেছিল।

তখন আমরা রেডিওতে ওয়ার্ল্ড মিউজিক শুনতাম। এ অনুষ্ঠানের মান ছিল খুবই উন্নত। সে সময় বিটিভিতে নিজস্ব ইংরেজি সংবাদের পাশাপাশি এক ঘণ্টা করে বিবিসি ও সিএনএনের নিউজ প্রচারিত হতো। বিটিভিতে প্রচারিত নানা ধরনের ইংরেজি অনুষ্ঠান দেখতাম নিয়মিত। প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আসার বেশ কয়েক বছর পর বিবিসি সিএনএন আল-জাজিরা (ইংরেজি) এনডিসহ একাধিক নিউজ চ্যানেল চব্বিশ ঘণ্টাই দেখার সুয়োগ পেয়ে গেলাম। এখন তো নিউজসহ অগণিত ইংরেজি চ্যানেল সারা দিনই চলে। বিটিভির পাশাপাশি আমাদের দেশের ৮টি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলও ইংরেজি সংবাদ প্রচার করছে।

পেশাগত সাংবাদিকতার কারণে এখন ইচ্ছে করলেই কোনো শিক্ষকের কাছে বা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ইংরেজি শেখার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হয়ে ওঠে না। তবে এখনো তিন ধরনের মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে ইংরেজি শেখার চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত (প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোস্যাল মিডিয়া)। আমি সামান্যতম ইংরেজি যদি শিখে থাকি সেটার কৃতিত্ব মিডিয়ার। ইংরেজি শেখার জন্য এখন আর কোনো প্রতিষ্ঠানে না (গেলে ভালো) গেলেও চলবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছে। ইউটিউবই হতে পারে আপনার আমার জন্য অনেক বড় শিক্ষক।

ইউটিউবের কল্যাণে পৃথিবীর অনেক ইংরেজি শিক্ষক, ইংলিশ কোচ, ইংলিশ ট্রেইনার ও ইংরেজি জানে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের লেসন দিচ্ছেন। তাদের অনেকের লেসন সাবক্রাইব করার সুযোগ আছে বিনামূল্যেও। স্কাইপে ন্যাটিভ ইংরেজদের সঙ্গে কথা বলা যায়। তাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলারও সুযোগ আছে। ভাষার চারটি স্তরই তারা শেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে দেখে নিতে হবে আপনার প্রয়োজন কোনটি এবং আপনি কোন স্তরে আছেন।

আমরা যখন ইংরেজি শেখার চেষ্টা করেছি তখন আমাদের হাতে সময় ছিল। কিন্তু শেখার সুযোগ-সুবিধা তেমন একটা ছিল না। আর এখন সুযোগ সুবিধা আছে হাতের মুঠোয় মুঠোফোনে। কিন্তু সময় নেই মানুষের হাতে। ইদানীং মনে হয় সত্যিই ঞরসব Time you old gipsy man (সময় তুমি বৃদ্ধ যাযাবর)। এই অল্প সময় থেকে একটু হলেও সময় দিতে হবে ইংরেজির জন্য। এ প্রয়োজন মিডিয়াকর্মীদের জন্য অত্যাবশ্যক। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আমাদের উপস্থিতি অতি নগণ্য (ইংরেজি ভাষার সাংবাদিকতার কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন)।

আন্তর্জাতিক করপোরেট জবগুলোতে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা ইংরেজির জন্যই অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে এখনো। আমরা যদি দেশে ইংরেজিতে দক্ষ ৫০ লাখ কর্মী সৃষ্টি করতে পারি, দেশের অভ্যন্তরীণ চেহারা যেমন বদলে যাবে। তেমনি প্রবাসী আয় দ্বিগুন হবে, কমবে বেকারত্বও। ভারত ফিলিপিন শ্রীলঙ্কা শুধু ইংরেজির জন্যই প্রবাসী আয় আমাদের চেয়ে অনেক বেশি, একই মানের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও।

মূলধারার মিডিয়ায় ইংরেজি সম্পাদনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ বা প্রচারিত হয়। তাই এখানে ভুলত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। বাংলাদেশের অনলাইন মিডিয়াগুলো এখন ইংরেজি শেখার নানা ধরনের টিপস দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো সম্পাদনার সুযোগ নেই। যারা ইংরেজি ভাষা জানেন তারা আপলোড করছেন বিভিন্ন কন্টেন্ট। অতটা দক্ষ নন বা আনাড়ি যারা তারাও আপলোড করছেন। সোস্যাল মিডিয়া থেকে যারা ইংরেজি শিখতে চাচ্ছেন তাদের এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। অনেক ভিডিওতে দক্ষতার পাশাপাশি অদক্ষতার ছাপও লক্ষণীয়।

আমাদের মতো দেশে ইংরেজি ভাষা বিস্তারে ইংরেজি মিডিয়ার পাশাপাশি বাংলা মিডিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ইংরেজিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে তাদের সহযোগিতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরাও মিডিয়ার সহযোগিতা নিয়ে অতি সহজে নিজেকে ইংরেজি ভাষাতে সমৃদ্ধ করতে পারি এবং শিক্ষক হিসেবে পেতে পারি মিডিয়াকে। সংবাদপত্র শুধু তথ্যই দেয় না, মানুষকে শিক্ষিতও করে। শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে।

মাসুদ কামাল হিন্দোল : সাংবাদিক ও রম্য লেখক
hindol_khan@yahoo.com