খন্দকারের অন্ধকার না মিডিয়ার শাইলকগিরি!

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

খন্দকারের অন্ধকার না মিডিয়ার শাইলকগিরি!

সৈকত হাবিব ৯:০৮ অপরাহ্ণ, জুন ০৩, ২০১৯

print
খন্দকারের অন্ধকার না মিডিয়ার শাইলকগিরি!

সংবাদটি পড়ে যুগপৎ আনন্দিত ও আহত হয়েছি! পুরো দুই মেরুর অনুভূতি একই সময়ে কেন? সেই কথাটুকু জানার বিবেকগত চাপ থেকেই এই লেখা। যদিও ‘বিবেক’ নাকি এখন কেবল যাত্রাপালার বস্তু, ব্যবহারিক জীবনে তার দেখা নাকি কমই মেলে। আমাদের আচার-আচরণ দেখে কথাটি ফেলে দেওয়ারও উপায় নেই। তবে এই নির্বস্তুক বিবেকের জাগরণ তো আবার দেখাই গেল যখন একে খন্দকার দীর্ঘদিন পর অন্ধকার থেকে উঠে এসে ‘জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন’ এবং নিজের ভুল অসংকোচে স্বীকার করলেন! তাকে একটি অদৃশ্য বেসামরিক স্যালুট দিতে পেরে নিজেকে কৃতার্থ মনে করেছি, আনন্দ লাভ করেছি। কিন্তু আহত কেন হচ্ছি? সেইটেই এবার কইব। কিন্তু সে এক ‘বিরাট ইতিহাস’! এত কথা বলবার বা শোনবার সদিচ্ছা আমাদের কারও নেই, অনুভব করে, সংক্ষেপেই বলার চেষ্টা করব।

বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ মার্চে তার জাতির জন্য সবচে মহাকাব্যিক ভাষণে ‘জয় বাংলা’ বলার পাশাপাশি সব শেষে নাকি ‘জয় পাকিস্তান’ও বলেছেন! একে খন্দকার তার ১৯৭১ ভেতরে বাহিরে বইয়ে এ কথা বলার পর বইটি খুব আলোচিত, বিতর্কিত ও তুমুল চাহিদাসম্পন্ন হয়ে ওঠে। এমনকি এই প্রকাশনার মাতৃপ্রতিষ্ঠান দেশের সবচেয়ে মোড়ল বাংলা দৈনিক এবং বহু ক্ষমতাশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও, বইটির পাইরেসি অনেক দিন ঠেকানো যায়নি।

বিপুল চাহিদার বিপরীতে প্রকাশকের পক্ষে নিয়মিত সরবরাহ করার অক্ষমতার কারণে এমনকি ৪৫০ টাকা দামের বইটি কমিশন দূরের কথা, বিক্রেতারা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়ও বিক্রি করেছেন বলে শুনেছি। বাংলাদেশের কোনো নন-ফিকশন বইয়ের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে কিনা, অভিজ্ঞরা বলতে পারবেন। তারপর কী হলো, চলুন তাদের পত্রিকার সাম্প্রতিক খবর থেকেই জানি। ‘বইয়ে অসত্য তথ্য : জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন একে খন্দকার’ শিরোনামে প্রথম আলো অনলাইন ১ জুন লিখেছে : ‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে বইয়ের একটি পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এর লেখক মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার। তিনি বইয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ার জন্য জাতির কাছে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। গত শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কে খন্দকার এ কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে স্ত্রী ফরিদা খন্দকার উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে একে খন্দকার বলেন, আমার লেখা বই ‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে’ ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর এর ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিশেষ অংশ ও বইয়ের আরও কিছু অংশ নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ হয়। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে উল্লেখিত অংশটুকু হলো, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। তিনি (বঙ্গবন্ধু) যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, জয় পাকিস্তান!

একে খন্দকার বলেন, এই অংশটুকুর জন্য দেশপ্রেমিক অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এই অংশটুকু যেভাবেই আমার বইয়ে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে কখনই ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি। আমি তাই এই অংশ সংবলিত পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। তিনি বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মনোবল নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা পেয়েছিল বাঙালি জাতি। এই স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধের এই উপ-অধিনায়ক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে খ্যাতির শীর্ষে। বাংলাদেশ বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বে দেশ আজ যুদ্ধাপরাধীমুক্ত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রতি কৃতজ্ঞ।

এ কে খন্দকার বলেন, আমার বয়স এখন ৯০ বছর। আমার সমগ্র জীবনে করা কোনো ভুলের মধ্যে, এটিকেই আমি একটা বড় ভুল মনে করি। আমি আজ বিবেকের তাড়নায় দহন হয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মার কাছে, জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

আপাত অর্থে কিছু অংশ অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও পুরো সংবাদটিই উদ্ধৃত হলো। যিনি/যারা সচেতনভাবে সংবাদটি পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই এর মধ্যে কিছু রহস্য বা জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছেন। তবু অন্তত দুটি বিষয়ে পুনরায় দৃষ্টি দেওয়া দরকার। জনাব খন্দকার দ্বিতীয় প্যারার শেষে বইয়ের সেই বিতর্কিত অংশটি উদ্ধৃত করেছেন : ‘বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। তিনি (বঙ্গবন্ধু) যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, জয় পাকিস্তান!’

আর তৃতীয় প্যারার শুরুতে বলেছেন : ‘এই অংশটুকু যেভাবেই আমার বইয়ে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে কখনোই ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি। আমি তাই এই অংশ সংবলিত পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।’

কথাগুলো কে বলছেন? যিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক ও একজন সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল! তার কাছে সবিনয় জিজ্ঞাসা, ৭ মার্চে তিনি কোথায় ছিলেন?

তিনি কি পরে কিংবা বইটি রচনার সময় পুরো ভাষণটি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন অথবা এর নির্ভরযোগ্য কোনো লিখিতরূপ পড়েছেন? জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের লড়াইয়ের একজন উপ-সেনাপতি তবে কার বা কোন প্রেরণায় এই অধিপতিত্ব করতে গেছিলেন, কিংবা কার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আদেশ/নির্দেশে এই দায়িত্ব নিলেন? নাকি ‘যেভাবেই হোক’ তিনি এই দায়িত্ব পেয়ে গেছেন, এবং যেনতেন প্রকারে এই গৌরবের ভাগিদার হয়েছেন? আর মুক্তিসংগ্রামের ‘উপ-পতি’ হিসেবে তার ভূমিকা কতটা সক্রিয় ছিল যুদ্ধের মাঠে, নীতি-নির্ধারণে কিংবা অগণন সেনা ও সাধারণ যোদ্ধাকে সহায়তা বা উদ্বুদ্ধকরণে? সরল কথায় তিনি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটা নিষ্ঠা, সততা ও সক্রিয়তার সঙ্গে করেছেন? যেহেতু তিনি এখনো সজ্ঞান ও জীবিত, আমরা নাদান জনগণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে অজ্ঞ, তিনি নিজের মুখে বললেই উপকৃত হই। আর আমরা যেহেতু বই-বিমুখ জাতি এবং ইতিহাস-অসচেতন এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্বে আক্রান্ত, তাই পরের মুখে ঝাল না খেয়ে বরং তার মুখ থেকে শুনেই জ্ঞানলাভ করি।
এই নবতিপ্রবীণ মানুষটির কাছে, ধৃষ্টতার জন্য আগাম ক্ষমা চেয়ে, সত্যের খাতিরে আরও কিছু জিজ্ঞাসার জবাব পেতে ইচ্ছা করি।

০১. বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বর্তমানে ইউনেস্কো স্বীকৃত এবং ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর অংশ। এটা নিয়ে কিংবা এর কোনো অংশবিশেষ নিয়ে কোনো প্রকার লুকোচুরি কিংবা প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। তারপরও যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই, বঙ্গবন্ধু তার সেই ভাষণে ‘জয় পাকিস্তান’ কিংবা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছেন। তো ‘সো হোয়াট!’ সত্তরের নির্বাচনে তিনি পুরো পাকিস্তানে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত নেতা, কোনো বিপ্লবী বা গেরিলা নেতা নন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রবল গণসমর্থনের অধিকারী, যে কারণে ইয়াহিয়ার মতো স্বৈরশাসক পর্যন্ত তাকে ‘মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার’ বলে অনানুষ্ঠানিক সম্বোধন করেছেন এবং ভুট্টো বদমায়েশি না করলে যিনি কয়েক দিনের মধ্যে দুই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদে শপথ নিতেন, তিনি কী করে বিপুল জনরায়কে অবজ্ঞা করে জনগণকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতেন! মিস্টার খন্দকার, আপনার কেন মনে হয়নি এটি বঙ্গবন্ধুর একটি বৈধ রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে, যাতে সব দিক সুস্থভাবে সম্পন্ন করা যায়! এর মধ্যে কেন আপনি দোষ খুঁজে পেলেন?

০২. আপনি ‘জয় পাকিস্তান’ শুনতে পেলেন কিন্তু একটি জাতির স্বাধীনতা-সংগ্রামের সমস্ত নির্দেশনা যে খুবই স্পষ্ট করে তিনি বলে দিলেন, এবং অগণন জনগণ তাতে সপ্রাণ সাড়া দিচ্ছেন, সেগুলোর কি কিছুই শুনতে পাননি! এত তীব্র, এত উদ্দীপক, এত কৌশলী কিন্তু আত্মিক ভাষণ পৃথিবীর কয়জন রাষ্ট্রনেতা দিতে পেরেছেন? কেবল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মই নয়, আজকের একটি স্কুলছাত্রও যে ভাষণে শিহরিত-উদ্দীপিত হয়, আপনি কেন সেগুলো না দেখে কেবল ‘জয় পাকিস্তান’কে এত বড় করে দেখতে পেলেন! এটি কি আপনার সজ্ঞান চিন্তা, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? নাকি কারও দ্বারা তাড়িত হয়ে পচা শামুকে পা কাটলেন?

০৩. আপনি লিখলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না।’ আবার এক বাক্য পরেই বললেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, জয় পাকিস্তান!’ বললেন, ‘এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল’ তা মনে করেন না; আবার বললেন বঙ্গবন্ধু ‘যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন আপনি তা মনে করেন।’ তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল কী? আপনি কিংবা আপনার বিজ্ঞ প্রকাশকের চোখ এত বড় বৈপরীত্যকে কীভাবে এড়িয়ে গেল! নাকি এটি সজ্ঞানতাপ্রসূত এবং একটি জাতীয় স্পর্শকাতর বিষয়কে বিতর্কিত করা ও বাজারমাত করে কিছু পয়সা কামিয়ে নেওয়ার বণিকী-পরিকল্পনা!

০৪. কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কেন আরম্ভ হতে যাবে ৭ মার্চেই? এটি তো ছিল বঙ্গবন্ধুর পাক-শাসকদের প্রতি প্রত্যক্ষ হুমকি, যেন তারা সংবিধানের পথে থাকে কিংবা সীমা লঙ্ঘন না করে। ২৫ মার্চের আগে আপনার কথামতো ‘মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ’ করার যৌক্তিকতাই বা কী! বরং বলা যেতে পারে পাকিস্তানিরা যাতে আমাদের প্রতি অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে না দেয়, সেজন্য সেটি ছিল এক ধরনের সতর্ক প্রস্তুতি। কিন্তু ২৫ মার্চের গণহত্যার পর বাংলার মানুষ কি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি? আর সেটি কার ডাকে, কার নামে, কার মুখের দিকে তাকিয়ে জনগণ করেছিল আর আপনিও উপ-অধিনায়কত্ব করার গৌরব লাভ করেছিলেন!

মাননীয় খন্দকার, আপনি মুক্তিযুদ্ধের সুফল ভোগকারী পরম সৌভাগ্যবান গুটিকয়েকের একজন, যারা পরিশ্রমের চেয়ে পুরস্কার পেয়েছেন বহু বহু গুণ বেশি। কী স্বৈরাচারী, কী গণতান্ত্রিক সব আমলেই আপনি পেয়েছেন সুমহান গৌরব, মর্যাদা ও ক্ষমতা। এই তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি জাতির মধ্যে আপনি সব সময়ই প্রাচুর্য উপভোগ করার সৌভাগ্যধারী। সেজন্য দেশ, জাতি ও জাতির জনকের প্রতি কৃতজ্ঞতা বলেও তো একটা কথা আছে! নিন্দুকেরা বলেন, তারপরও নাকি আপনি অতৃপ্ত ছিলেন, কারণ বঙ্গভবনের সিংহাসনে বসার বাসনা অপূরণ থাকায় আপনার মনে খেদ রয়ে গেছে। কিন্তু আপনাদের মতো দায়িত্বশীলরা যখন কোনো ভুল বা অবহেলা করেন, তা যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, সেটি নিশ্চয়ই টের পেয়েছেন। তাই ক্ষমাপ্রার্থনার বহু আগেই যে জাতীয় ক্ষতি হয়ে গেছে, সেটি কি কখনো পূরণ করা যাবে! তবে এই জাতির সন্তান হিসেবে বিলম্বে হলেও যে আপনার বিবেক জাগ্রত হয়েছে, মনের অন্ধকার দূর হয়েছে সেজন্য আবারও আপনাকে শ্রদ্ধা জানাই। (অবশ্য নিন্দুকেরা বলছেন, এবারও নাকি আপনি কারও দ্বারা ‘তাড়িত’ হয়ে এই ক্ষমা-অনুষ্ঠান করেছেন! তা বলুক, তবু এজন্য অনেক প্রশংসা ও ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য, কারণ এর উদ্দেশ্য শুভ)।

প্রসঙ্গত, আরেকটি বিষয়ও গোচরে আনা জরুরি মনে করছি। বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সমালোচক মনে করেন, আপনার পুরো বইটি একটি একদেশ-দর্শী রচনা। কারণ একটি জাতীয় সংগ্রাম বা গণযুদ্ধে যে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ, লড়াই, আত্মদান ও অর্জন, তার সাফল্যের সিংহভাগ কৃতিত্ব আপনি স্বজাতি বা নিজ গোষ্ঠীকেই দিয়েছেন এবং ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশের মতোই গণঅবদানকে এড়িয়ে গিয়েছেন। মনে হয় এটিও আপনার পুনর্বিবেচনার অগ্রবর্তী তালিকায় থাকা ভালো। আমাদের জাতির একটি সাধারণ মুদ্রাদোষ হলো, আমরা কাউকে ছোট না করলে নিজেকে বড় মনে করতে পারি না। সেজন্যই শেখ মুজিব একটি জাতির স্বপ্নের স্বাধীনতা এনে দিলেও তাকে ছোট করতে আমাদের বাধে না। আর সাধারণ জনগণ এত ত্যাগ স্বীকারের পরও স্বীকৃতি পায় না। আপনাকে এবং আপনাদের মতো জাতীয় সৌভাগ্যবানদের নিয়ে অনেক কথাই বলার আছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরের কাছে এসে আপনাদের ভূমিকা, দায়িত্ব, কর্তব্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন তোলার আছে। কেন আমরা এখনো জাতীয় চেতনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত, কেন এখনো আমাদের গণতন্ত্র লুণ্ঠিত, কেন স্বপ্নগুলো এখনো সুদূর আর অর্জনের অনেক কিছুই বেহাত ও বৈশ্যদের দখলিকৃত এরকম হাজারো প্রশ্নের মুখে আপনারা উত্তরহীন দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ এগুলোর দায় অনেকটা আপনাদের শ্রেণির ওপরই বর্তায়। আলাপ-অভিযোগের জায়গা যেহেতু এখানে অল্প, তাই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলে বিদায় নেওয়া যাক।

আপনি বলেছেন, সেই বিতর্কিত ‘অংশটুকু যেভাবেই আমার বইয়ে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে কখনোই ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি।’ লক্ষ করেছি, এই নব্বই বছর বয়সেও আল্লার কৃপায় এই দূষিত আবহাওয়ায় আপনি সুস্থ ও সজ্ঞান।

তাহলে ২০১৪ সালে, আরও বছর পাঁচ আগে, আপনার এমন কী হয়েছিল যে, কথাগুলো ‘যেভাবেই আমার বইয়ে আসুক’ বলছেন? তাহলে কি বইটি আপনি লেখেননি, আপনার হয়ে অন্য কেউ লিখেছে, আর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে এসব কথা ঢুকিয়ে দিয়েছে! সেই লোক বা গোষ্ঠী কারা? তাদের নাম-পরিচয় জাতির জানা দরকার। তারা কি বৈশ্যবৃত্তির জন্য এসব করেছে, নাকি আপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ লোককে ব্যবহার করে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।

আর ‘এই অসত্য দায়ভার’ আপনি কেন এত দিন পর নিচ্ছেন? বইটি তো পর পর আরও বহুবার মুদ্রিত হয়েছে, তখন কেন সংশোধন করেননি! কথাগুলো পরিষ্কারভাবে বলে আপনার দায়মুক্ত হওয়া দরকার, যাতে এগুলো তথ্য হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকে। আপনি কি মিডিয়ার শাইলকদের বৈশ্যবাদের শিকার, যারা যে কোনো কিছুকে ইস্যু করে তুলে মুনাফাবাজি করতে চায়? নাকি আমাদের সেই সব মহাজনদের খপ্পরে পড়েছেন যাদের অনর্থক মুজিব-বিকার আছে, যারা জাতির পিতা দূরে থাক, ‘বঙ্গবন্ধু’ বলতেও ভুরু কুঁচকে থাকে!

‘আমার সমগ্র জীবনে করা কোনো ভুলের মধ্যে, এটিকেই আমি একটা বড় ভুল মনে করি’ বলেছেন আপনি। কিন্তু এই ভুলের পুরো দায় যদি আপনার না থাকে, কেন এই বয়সে অনর্থক বোঝার ভার একা বহন করবেন! বরং যদি কোনো অন্ধকার থাকে সেটাও তো দূর করা দরকার। আপনি তো, শেষ পর্যন্ত, নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমাপ্রার্থী, সত্যসন্ধানী একে খন্দকার!

সৈকত হাবিব : কবি ও সাংবাদিক