নিরাপদ হোক নদীপথের ঈদযাত্রা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

নিরাপদ হোক নদীপথের ঈদযাত্রা

শামীম সিকদার ১০:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ০২, ২০১৯

print
নিরাপদ হোক নদীপথের ঈদযাত্রা

নাড়ির টানে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ লঞ্চযোগে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরে। লঞ্চে যাতায়াত এ অঞ্চলের মানুষের প্রথম পছন্দ। ঈদ ছাড়াও সব সময়ই আশানুরূপ যাত্রী লঞ্চে যাতায়াত করে। তবে ঈদের সময় যাত্রীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনে লঞ্চগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ঈদকে ঘিরে নামানো হয় নতুন নতুন লঞ্চ, বাড়ানো হয় ট্রিপ।

নিরাপদ যাত্রার প্রত্যাশা নিয়েই যাত্রা শুরু করলেও বিড়ম্বনা তাদের পিছু ছাড়ে না। সদরঘাট পল্টুনে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ যাত্রী প্রবেশ করার ফলে প্রতিদিন ঘটছে বিভিন্ন দুর্ঘটনা। এবারের ঈদযাত্রার শুরুর দিকে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ঢাকা সদরঘাট পল্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায় শিশুসন্তানসহ এক দম্পতি। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় অল্পের জন্য ওই যাত্রীদের জীবন রক্ষা পায়।

প্রতিবছরই ঈদের সময় পল্টুন থেকে যাত্রী নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে আহত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ এবং প্রাণ হারানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। তাই গেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করার মাধ্যমে সদরঘাটের পল্টুনে অতিরিক্তি যাত্রী প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক।

এ ছাড়া পল্টুনে সব ধরনের হকার প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা উচিত এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘাট শ্রমিক পল্টুনে অবস্থান করতে না দেওয়াই উত্তম। পল্টুনের সঙ্গে নৌকা লাগিয়ে পণ্য বিক্রি এক দম বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন। নৌকা দিয়ে যেন লঞ্চে যাত্রী উঠাতে না পারে সেদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নজর রাখতে পারলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা রোধ হবে।

দক্ষিণাঞ্চনের মানুষের ঈদযাত্রাকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা। লঞ্চযাত্রার অমানবিক কষ্টের মধ্যেও যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের খপ্পরে। এসব অপরাধীরা কীভাবে নির্বিঘ্নে তাদের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। এদের খপ্পর থেকে যাত্রীদের রক্ষায় জিরো টলারেন্স দেখানো উচিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ ছাড়াও ঘাট শ্রমিকদের অত্যাচার অন্যান্য সময়ের চেয়ে ঈদ মৌসুমে মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যায়। তারা যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো মজুরি আদায় করছে। তাদের চাহিদামতো টাকা না দিলে অনেক সময় যাত্রীদের লাগেজ লাপাত্তা হয়ে যায়। কোনো কোনো সময় যাত্রীদের শারীরিকভাবে নাজেহালও করে। নারী যাত্রী হলে তাদের নিপীড়ন আরও বেড়ে য়ায়।

ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকা-বরিশাল রুটে প্রতিবছরের মতো এ বছরও স্পেশাল সার্ভিসের নামে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কেবিন সংখ্যার তুলনায় চাহিদা রয়েছে কয়েকগুণ বেশি। তাই এবারও লটারির মাধ্যমে কেবিন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। লটারিতে পাওয়ার পরও দাম দিতে হয় বেশি। আছে কালোবাজারির বিড়ম্বনা। কালোবাজারি বন্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিলেও তা বেশি দিন ধরে রাখা যায় না।

এ ঈদে ঢাকা সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ৪৩টি রুটে ২১৫টি লঞ্চ চলাচল করছে। এসব রুটে ঈদ মৌসুমে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে তার মধ্যে শুধু ৩ জুন সোমবার এক দিনে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাড়ি ফিরবে বলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ধারণা। এ বছর ঈদে নৌযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ৩৬টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে লঞ্চযাত্রা হবে স্বস্তিদায়ক এবং এড়ানো যাবে বিড়ম্বনা। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রতিটি লঞ্চের মাস্টার ও চালকদের ইউনিফর্মে থাকতে হবে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে। মাঝনদীতে কোনো লঞ্চ রাখা যাবে না এবং নৌকায় করে যাত্রী উঠানো যাবে না। যাত্রীর সংখ্যা অনুপাতে অতিরিক্ত বয়া, লাইফ জ্যাকেটের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না। যাত্রীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর সমন্বয় কমিটি প্রয়োজনে স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিসের ব্যবস্থা করবে। ছাদে যাত্রী বহন করা যাবে না। সদরঘাটে প্রবেশের ১৪টি পথে যাত্রী নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি, বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) স্বেচ্ছাসেবকরা যৌথভাবে কাজ করবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় লঞ্চ চালানো যাবে না। কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করা যাবে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নদীবন্দর পর্যন্ত সড়কটি একমুখী করতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হবে। নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও হয়রানি রোধে রাতে পুলিশের টহলের ব্যবস্থা রাখতে থাকবে।

বিআইডব্লিউটিএর এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ হবে বলে বিশ্বাস করি। তবে আশঙ্কাও প্রকাশ করছি, সবগুলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে তো? নাকি প্রতিবছরের মতো এসব সিদ্ধান্ত থাকবে কাগজে-কলমে, আর দুর্ভোগ থাকবে ঘরমুখো লঞ্চযাত্রীদের সঙ্গী হয়ে। লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে আরও আন্তরিক হতে হবে যাত্রী সেবায়। শুধু টাকা রোজগারই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। খেটে-খাওয়া মানুষ ঈদের সময় একটু স্বস্তিতে প্রিয়জনদের কাছে ফিরবে সেই ব্যবস্থা করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য।

শামীম সিকদার : কলাম লেখক ও কলেজশিক্ষক
samimsikder@gmail.com