ঈদুল ফিতরে করণীয়-বর্জনীয়

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

ঈদুল ফিতরে করণীয়-বর্জনীয়

যুবায়ের আহমাদ ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ০২, ২০১৯

print
ঈদুল ফিতরে করণীয়-বর্জনীয়

‘লিকুল্লি কওমিন ঈদ, ওয়া হাজা ঈদুনা’ (প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব রয়েছে, এ হলো আমাদের উৎসব)। দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হয়। একই বছর বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং উল্লিখিত বাণীর মধ্য দিয়ে মহানবী (সা.) মুসলিম জাতির জন্য ঈদুল ফিতরের প্রচলন করেন।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পৌঁছে দেখতে পান সেখানকার অধিবাসীরা বছরে দুদিন খেলাধুলা (আনন্দ-উৎসব) করে থাকে। তিনি তাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুদিন খেলাধুলা করতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের এ দুদিনের পরিবর্তে অন্য দুটি উত্তম দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। (আবু দাউদ : ১/৪৪১)। উল্লিখিত বাণীর মধ্য দিয়ে মহানবী (সা.) মুসলিম জাতির জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার প্রচলন করেন।

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিতে দিতে ঈদের ময়দানে হাজির হন। নবীজি (সা.) মুসলমানদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তাদের উদ্দেশে খুতবা দিয়ে ঈদের আসল তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তাই তো আজ ঈদ এলেই রঙিন হয়ে ওঠে আমাদের চারপাশ। হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয় জাতীয় কবি নজরুলের গানটি- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...।’

ঈদ আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ কেন? এমনি এমনিতেই কি কেউ আনন্দিত হয়? নিশ্চয়ই না। হয় যখন আনন্দের কিছু ঘটে। পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলে আনন্দিত হয়; কঠিন কোনো কাজ সহজেই সমাপ্ত করতে পারলে আনন্দিত হয়। পুরস্কৃত হলে আনন্দিত হয়। ঈদের আনন্দের কারণটা কী? আনন্দের জন্য তো কোনো কারণ থাকতে হবে! এক মাস রোজার পর এদিনে সাধনার পুরস্কার হিসেবে ক্ষমাপ্রাপ্তিই সেই আনন্দের কারণ।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, আল্লাহতায়ালা ঈদের দিন ফেরেশতাদের মাঝে রোজাদারদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, ‘হে ফেরেশতারা আমার কর্তব্যপরায়ণ প্রেমিক বান্দার বিনিময় কী হতে পারে?’ ফেরেশতারা বলেন, হে প্রভু পুণ্যরূপে পুরস্কার দান করাই তো তার প্রতিদান। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব (রোজা) পালন করেছে। অতএব দোয়া করতে করতে ঈদগাহে গমন করেছে। আমার মর্যাদা, সম্মান, দয়া ও বড়ত্বের কসম আমি তাদের দোয়া কবুল করব এবং তাদের মাফ করে দেব। (বায়হাকি : ৩/৩৪৩)।

ঈদের আনুষ্ঠানিকতায় সৌহার্দ, সম্প্রীতি, মানবতা, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিকতার যে সফল সমন্বয় ঘটেছে তা কল্যাণমূলক উৎসব হিসেবে এর পূর্ণতা ও স্বকীয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরেক ধাপ। সদকায়ে ফিতর আদায়ের মাধ্যমে গরিব-দুঃখী সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ। ঈদগাহে নেই কোনো ভেদাভেদ। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো, শত্রু-মিত্র-নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায় নির্দ্বিধায়। একে-অন্যকে বুকে জড়িয়ে বছর ধরে চলে আসা শত্রুতার সমাপ্তি ঘটিয়ে দেয় নিমিষেই। একে-অন্যের মঙ্গল কামনা করে দোয়া করে মহান প্রভুর কাছে।

ঈদের দিনে করণীয় : খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াকসহ অজু করে ফজরের নামাজ নিজ মহল্লার মসজিদে আদায় করা। ভালোভাবে গোসল করা। সাধ্যমতো উত্তম (পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন) পোশাক পরিধান করা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা।

ঈদের জামাতে যাওয়ার আগে কিছু খেজুর বা মিষ্টিদ্রব্য খাওয়া। সামর্থ্য অনুযায়ী, উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা। অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা। এতিম মিসকিন ও গরিবদের সাধ্যমতো পানাহার করানো। দেরি না করে, পায়ে হেঁটে তাকবিরে তাশরিক বলতে বলতে ঈদগাহে যাওয়া। ইমাম মিম্বারে বসলে তাকবিরে তাশরিক বন্ধ করে তার আলোচনা শোনা। চেহারায় আনন্দ প্রকাশ করা। ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা। দোয়া ও ইস্তিগফার করা। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া। শুভেচ্ছা বিনিময় করা। বৈধ ও নির্দোষ আনন্দ-ফুর্তি, শরীর চর্চামূলক খেলাধুলা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ঈমানি ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ শিল্প-সংগীতও ঈদের দিনের বৈধ আনুষ্ঠানুনিকতার বাইরে নয়।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ঈদের দিন হাবশিরা খেলা করছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্রীড়ারত হাবশিদের উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ছেলেরা, খেলে যাও! ইহুদিরা জানুক, আমাদের দ্বীনের প্রশস্ততা আছে।’ (বুখারি : ১/১৭৩; মুসলিম : ২/৬০৮)। ঈদ আনন্দে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শরীরচর্চামূলক নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

বর্জনীয় : ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুদিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। সে দুদিন হলো- রোজা শেষে (এক মাস রোজার পর) ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আজহার দিন। (বুখারি : ২/৭০২)। আমাদের ঈদ উদযাপনকে যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের (রহ.) ঈদ উদযাপনের সঙ্গে মেলাই অবশ্যই বলতে হবে, এই ঈদ ইসলামের ঈদ নয় বরং আমরা বিজাতীয় সংস্কৃতির আদলে ঈদ উদযাপন করছি। ঈদগাহে নামাজে অংশগ্রহণ পর্যন্তই আমাদের ঈদ সীমাবদ্ধ। দৈনন্দিন জীবনের ইবাদতগুলোকে অবজ্ঞা করে সারা দিন টেলিভিশনে অশ্লীল সিনেমা নাটক দেখা, মহিলাদের সেজেগুজে সৌন্দর্য প্রদর্শনের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় তা নিশ্চয়ই ইসলামী সংস্কৃতি নয়।

যুবায়ের আহমাদ : খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ
বোর্ডবাজার, গাজীপুর