‘রাষ্ট্রচিন্তা’র নতুন রাষ্ট্রদর্শন

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

মাঠে-ঘাটে-বাটে

‘রাষ্ট্রচিন্তা’র নতুন রাষ্ট্রদর্শন

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৯:৫৪ অপরাহ্ণ, জুন ০১, ২০১৯

print
‘রাষ্ট্রচিন্তা’র নতুন রাষ্ট্রদর্শন

যখন যেমনই থাকি না কেন তার চেয়ে উন্নততর থাকতে চাওয়াই মানুষের ধর্ম। ভালোর কোনো শেষ নেই। ভালো শব্দের অর্থটাও আপেক্ষিক। একেক জনের কাছে একেকটা ভালো। আবার গণমানুষের জন্য কল্যাণকামী ‘ভালো’র অর্থও শাসকগোষ্ঠী আর শাসিতদের মধ্যে আলাদা হতে পারে। তারপরও একটি সর্বজনগ্রাহ্য ‘ভালো’র দিকে আমরা এগোতে চাই। এটাই স্বাভাবিক।

‘রাষ্ট্রচিন্তা’ নামক একটি সংগঠন আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোতে গণমানুষকে বঞ্চিত করার বীজ আছে বলে মনে করছে। আর সেই বীজই চিহ্নিত করে নতুন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে দেশব্যাপী কাজ করছে এ সংগঠনটি। সেই কাজের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ মে ২০১৯ রংপুরের পুরনো পাবলিক লাইব্রেরি ভবনে একটি মতবিনিমিয় সভার আয়োজন করা হয়।

যারা এই ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোক্তা তারা অবশ্য ‘রাষ্ট্রচিন্তা’কে এখনো প্রচলিত ফর্মে সংগঠন বলতে রাজি নন। তাদের ভাষ্যমতে, দেশজুড়ে কিছু মানুষের কাছে তারা একটি ধারণা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন মাত্র। এ বছরের শেষে সারা দেশের আগ্রহীজনদের নিয়ে দুই দিনবাপী তারা সুবিধাজনক কোনো স্থানে একত্রিত হতে চান। তারা সবাই মিলে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে চান। যে কর্মপরিকল্পনা তাদের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে এবং বাস্তবায়নে কাজ করবে।

মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রের বিবিধ বিষয় উঠে আসে। সংবিধান-আইন-বিধিসহ অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকলেও উচ্চপদস্থদের সেই জবাবদিহিতার ব্যবস্থা কম। আইনের ফাঁক গলিয়ে রাঘববোয়ালরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, দুর্নীতি হচ্ছে। মানুষ প্রচলিত আইনি কাঠামোতে অসহায়ত্ব বোধ করছেন। এসব কিছু ঢেলে সাজানো জরুরি। বর্তমানে রাষ্ট্র যেভাবে চলছে এর চেয়ে আরও ভালোভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে। বর্তমানে রাষ্ট্রের চলার ত্রুটিগুলো দূর করার পথ নির্দেশ করতে চায় ‘রাষ্ট্রচিন্তা’।

‘রাষ্ট্রচিন্তা’ রাষ্ট্রের শাসকদের বিতাড়িত করে নিজেরা শাসকে পরিণত হওয়ার কথা বলছে না। আলোচনায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম। তার বক্তব্যে অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বাস্তবসম্মতভাবে ‘রাষ্ট্রচিন্তা’র কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সচেতন নাগরিকরা উপস্থিত থেকে তারাও মতামত দেন। তারা অনেকে প্রধান বক্তার কাছে প্রশ্নও রাখেন। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেও অনেক বিষয় খোলাসা হয়।

রাষ্ট্রচিন্তা মনে করে দেশের মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা নেই। সেই প্রস্তাবনা আগে ঠিক করা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালে একটি দাবি ছিল আমাদের। ফলে আমরা ব্রিটিশ বিদায় করতে পেরেছি। ১৯৭১ সালেও আমাদের সুনির্দিষ্ট পথের দাবি ছিল। সেজন্য আমরা লাখো প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি। কিন্তু বর্তমানে আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই সেটি পরিষ্কার নয়। ফলে যারা রাষ্ট্র পরিচলানা করছেন তাদের মধ্যেও সেই কাজ বাস্তবায়নের তাগিদ নেই।

গণমানুষ যদি জাতির সামনে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা দাবিতে পরিণত করতে পারে তাহলে যারাই ক্ষমতামুখী হবে তারাই সেই দাবি বাস্তবায়নমুখী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কাঠমোতে যাওয়ার চেষ্টা করবে। ‘রাষ্ট্রচিন্তা’র পক্ষে যারাই বক্তব্য রাখেন তাদের সবার মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস আছে যে এ কাজ করা কঠিন হবে না। গণমানুষের মধ্যে কল্যাণকামী রাষ্ট্রগঠনের তাগিদ আছে। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তারাও কল্যাণকামী হবেন। তবে সংবিধান থেকে শুরু করে সরকারি সব কাঠামোতে যত সীমাবদ্ধতা আছে সেসব দূরীকরণের কণ্ঠ উঁচু করতে হবে।

আলোচনায় প্রশ্ন উঠেছিল নতুন রাষ্ট্র কাঠামোয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হবে। এই প্রশ্নের জবাবে আয়োজকরা জানান, এগুলোর কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। আগামীতে সবার মতামতের ভিত্তিতে সেটি ঠিক করা হবে। অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম তাদের এই চেষ্টাকে একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে বলে উল্লেখ করছিলেন। তিনি এও জানাচ্ছিলেন, এই সংগঠনের কোনো কেন্দ্রীয় কার্যক্রম বলে কিছু নেই। রাষ্ট্রচিন্তা নামের সংগঠন সারা দেশে যেগুলো হবে সেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে।

বিজ্ঞানচেতনা পরিষদের সংগঠক রায়হান কবিরের সঞ্চালনায় আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক চিনু কবির। আলোচনার সূত্রপাত তিনি করেছিলেন। রাষ্ট্র কীভাবে মানবিক রাষ্ট্র হতে পারে, বর্তমান রাষ্ট্র কতখানি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং মানবিক রাষ্ট্র সেসব বিষয়ের ওপর তিনি আলোকপাত করে আলোচনা উন্মুক্ত করেন। ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি কথা বলেন। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় অর্ধশত বছর হতে চললেও গণক্ষমতাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পেছনে এখনো অনেক বাধা আছে। সেই বাধা অতিক্রম করার কথা তিনি উল্লেখ করেন। গবেষক ও সংগঠক রাখাল রাহা ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ নিয়ে দেশব্যাপী কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আশাবাদ প্রকাশ করেন।

যুগে যুগে প্রতিকূল যাত্রী সবসময়ই ছিল। যারা নতুন নতুন চিন্তা-দর্শন নিয়ে মানুষের কাছে এগিয়ে এসেছেন। কখনো সেই দর্শন-চিন্তা সমকালে গৃহীত হয়েছে কখনো পরবর্তী সময়ে হয়েছে। সমকালে নিন্দিত হয়ে মহাকালে নন্দিত হয়েছে এ দৃষ্টান্তও আছে। মানুষের কল্যাণমুখী চেষ্টা কখনো বৃথা যায়নি। চেষ্টাটাই এর বড় সফলতা। রাষ্ট্রচিন্তা প্রকৃত অর্থেই একটি নতুন ভাবনা।

নতুন ভাবনা এ কারণে নয় যে তারা কল্যাণকামী রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিষ্ঠা চাইছে। কল্যাণকামী রাষ্ট্র সব যুগেই মানুষ কামনা করেছে। নতুন এই কারণে যে, আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অসার বিষয় চিহ্নিত করে রাজনীতিকদের দিয়েই রাষ্ট্র মেরামতের চেষ্টা করা। নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। অনেক মানুষকে একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়ে নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা এখানে নেই। মানুষকে জাগিয়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য। কারও ওপর কোনো মত চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে ভাবার সুযোগ এবং ক্ষেত্র এখানে অবারিত। মতান্তর অর্থ শত্রুতা নয়, মতান্তরেরও সৌন্দর্য থাকতে পারে সেই চেষ্টা এখানে বিদ্যমান। একটি মানবিক, কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো দূর করে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় রাষ্ট্রচিন্তা কাজ করছে।

তুহিন ওয়াদুদ : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও
পরিচালক, রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com