আধুনিক শিক্ষার অগ্রদূত মাননান স্যার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

আধুনিক শিক্ষার অগ্রদূত মাননান স্যার

রণজিৎকুমার সরকার ১০:০৬ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০১৯

print
আধুনিক শিক্ষার অগ্রদূত মাননান স্যার

পৃথিবীতে কত রকমের মানুষ আছে! প্রত্যেক মানুষ তার কর্ম-গুণে আলাদা। মেধা ও প্রজ্ঞা, সুরুচি ও সৌজন্য, বিনয়ী, উদার মন, দায়িত্ববান, আধুনিক শিক্ষার অগ্রদূত-একসঙ্গে এসব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের মানুষ সমাজে খুব কমই মেলে। আমি এ রকম একজন মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি তিনি হলেন অধ্যাপক ড. এম এ মাননান, প্রিয় মাননান স্যার।

শিক্ষক বলতে আমরা যা বুঝি-জ্ঞান সাধক ও জ্ঞান-উৎপাদক, আদর্শ ও মূল্যবোধের ধারক, যার সংস্পর্শে এলে সেই জ্ঞান ও মূল্যবোধ কিছুটা হলেও সঞ্চালিত হয় প্রত্যাশীর মধ্যে, তিনিও প্রকৃত অর্থে তাই। একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক। অধ্যাপক মাননান স্যারও তরুণদের পথ দেখান। লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সূত্রে ধরে জিটিভির সিনিয়র রিপোর্টার এইচ এম বাবু ভাই স্যারের সঙ্গে পরিচয় করে দেন। মাননান স্যারের সঙ্গে প্রথম সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হয় ২০১৮ সালে আমার কর্মস্থল দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে।

কথা বলার একপর্যায়ে স্যার আমাকে বললেন, ‘রণজিৎ বাবু, আপনি সহজ-সরল ভালো মনের মানুষ। আপনার চেহারাই তা বলে দেয়।’ নিজের প্রশংসা শুনে সে মুহূর্তে আর কিছু বলতে পারলাম না। একটু পর বললাম, স্যার, আপনি গুণী মানুষ, অনেক ভালো মানুষ...। সেই থেকেই স্যার আমার শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক না হয়েও আমার শিক্ষক ও পিতৃতুল্য অভিভাবক।

মাননান স্যার একজন মানবিক মানুষ, পরোপকারী। তিনি জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, সৃজনশীলতা, উদার মানবিকতা এবং সত্য ও সুন্দরের নিরন্তর নিষ্ঠাবানের সাধনায় থাকেন বলে আমার মনে হয়। মাননান স্যার আমার কাছে একজন সক্রিয় চিন্তার মানুষ, মার্কিন চিন্তাবিদ-লেখক-প্রকৃতিপ্রেমী র‌্যালফ ওয়ার্ল্ডো এমার্সনের ভাষায় গধৎ ঃযরহশরহম। এই সক্রিয় চিন্তার মানুষ তার আবেগকে রাখেন বুদ্ধির শাসনে, ইতিহাস ও সময়কে দেখেন বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে, সংকটে-সন্তাপে থাকেন স্থিরচিত্ত। এই মানুষের কাছে মানবিকতা আর সামাজিক অংশগ্রহণ গুরুত্ব পায়। সক্রিয় চিন্তার মানুষ অতীতকে আবিষ্কার করেন বইয়ের মধ্য দিয়ে, গবেষণার মধ্য দিয়ে; প্রকৃতিকে কল্পনা করেন মানস গঠনের পেছনে বড় একটি প্রভাব হিসেবে এবং সংস্কৃতির শক্তিতে পেতে চান তার সব শুদ্ধতা নিয়ে। আমি যেন এই সব মাননান স্যারের মধ্যে পাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক থাকা অবস্থায় ছাত্রদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্যার। বটবৃক্ষের মতো দিয়েছিলেন আশ্রয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় অনেককে সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন সবার প্রিয় মাননান স্যার। মাননান স্যারের নামের বানানটা একটু ভিন্ন ‘মাননান’। চিনতে সুবিধার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ‘যুগে যুগে মাননান’ স্যার নামে খ্যাত। কেননা যুগে যুগে ব্যবস্থাপনা নামে স্যারের একটি বিখ্যাত বই রয়েছে। যেটি ব্যবস্থাপনা বিভাগের আদর্শ পুস্তক বা আদর্শলিপি হিসেবে পরিচিত। অনেকের মতে, ব্যবস্থাপনা বিভাগের বাইবেল হিসেবে পরিচিত এই বইটি। বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল, আধুনিক মানুষ প্রফেসর ড. এম এ মাননান স্যার। দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি ‘পারফেকশনিস্ট অব ম্যানেজমেন্ট’ হিসেবে পরিচিত। আমাদের চোখে তিনি অনন্য, সময়ের সঠিক সন্তান। স্যার বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। গত কয়েক বছরে আমূল পরিবর্তন এনেছেন পুরো সিস্টেমে। গুণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি ডিজিটালাইজ করেছেন বাউবিকে। সেশনজট, হয়রানি, দুর্নীতি, নিয়মতান্ত্রিকতা, ম্যানেজমেন্টে এনেছেন গতি। একজন ভালো মানুষের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সেই কাজটি করে যাচ্ছেন মাননান স্যার। আর সে জন্যই স্যারকে বলা হয় আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রদূত।
এম এ মাননান স্যার ১৯৫০ সালের ১ জুন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী। ১৯৬৮-৬৯ সালে জড়িয়ে পড়েন ছাত্ররাজনীতিতে। রাজনীতি ও পড়াশোনা একসঙ্গে চলে তার। মহান মুক্তিযুদ্ধের আগেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশে-বিদেশে তরুণদের মাঝে জনসংযোগ চালান। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত করেন। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পাশে দাঁড়ান মুক্তিযোদ্ধাদের। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে স্যারের যোগাযোগটা এই সময়ে শুরু। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা দিল্লি হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তা আরও নিবিড় হয়।

১৯৮৯-৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির দায়িত্ব পালন করেন স্যার। গণতন্ত্র মুক্তির দাবিতে কথা বলতে গিয়ে বারবার এরশাদ সরকারের রোষানলে পড়তে হয় তাকে। এক জীবনে তিনি ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, রাজনীতি, বিজ্ঞান, গবেষণা, তত্ত্ব প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখেছেন অসাধারণ স্বাক্ষর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টসের পরিচালক, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চ পরিচালক, ঢাবির তিনবার নির্বাচিত সিনেটর এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্যার।

কারও সমালোচনা নয় বরং নিজের কাজটুকু পরিশ্রম, সততার সঙ্গে পালন করলে পরিবর্তন হবেই, এ ব্রতে বিশ্বাসী স্যার। এখন তার স্বপ্ন এ দেশের অলিগলিতে ম্যানেজমেন্ট ক্লাব হবে। আত্ম-উন্নয়নশীল ও চিন্তাশীল প্রজন্ম সৃষ্টি হবে। শিশুরা হবে ব্যবস্থাপনা, দর্শন ও বিজ্ঞানের বাহক।

বিশ্বমানের শিক্ষাচর্চা কেন্দ্র গড়ার স্বপ্ন স্যারের। বয়সকে হার মানিয়ে আলোর মশাল জ্বালিয়ে সে প্রত্যয়ে ছুটছেন স্যার। আমরা প্রার্থনা করি, তিনি সুস্বাস্থ্য এবং তারুণ্যের শক্তি নিয়ে আরও অনেক বছর আমাদের মধ্যে থাকুন, যাতে আমরাও তার কাছাকাছি যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আমাদের সবাই পাশে থাকবেন।

আজ ঊনসত্তরতম জন্মদিনের এই শুভক্ষণে আপনার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা। কামনা করি-শতায়ু হোন, আপনার জ্ঞান মনীষ এবং সমাজহিতৈষণার আলোকে এই দেশ ও সমাজ আলোকিত হোক, মানব কল্যাণের যাত্রাপথে আমাদের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হোক। আপনি ভালো থাকুন। সজীব থাকবেন। শুভ জন্মদিন স্যার।

রণজিৎকুমার সরকার : সাংবাদিক
ranzitsarker@gmail.com