রহস্যময় শক্তির আধার ‘বিজেএমসি’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

রহস্যময় শক্তির আধার ‘বিজেএমসি’

মঞ্জুরুল আলম পান্না ৯:৫৩ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০১৯

print
রহস্যময় শক্তির আধার ‘বিজেএমসি’

২০১৫ সালের কথা। ক্রেতা ছাড়াই ৭০০ কোটি টাকার পাটপণ্য উৎপাদন করে সরকারি জুট মিলগুলো। উদ্দেশ্য ছিল পরে ‘ক্রেতা নেই’ দেখিয়ে সেগুলো পানির দরে নিলামে নিজস্ব লোকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া। বিনিময়ে বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অসাধু কর্মকর্তারা কমিশন পাবেন। এক পর্যায়ে বিজেএমসির এই পুকুর চুরির পরিকল্পনা জানার পাশাপাশি আরও ১৫ ধরনের গুরুতর অনিয়মের সন্ধান পায় পাট মন্ত্রণালয়। পাটের বাজার তৈরির নামে শতাধিক কর্মকর্তার বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণ, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া উচ্চ বেতনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, দেশীয় বাজারে পাটের চাহিদা নিরূপণে ব্যর্থতাসহ নানা অনিয়মের বিষয়ে উত্তর জানতে বিজেএমসিকে চিঠিও দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। অসাধারণ এই কাহিনীর এটুকু পর্যন্ত জানা থাকলেও পরেরটুকু আর জানার সৌভাগ্য হয়নি।

এরকম নানাবিধ দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে স্বাধীনতার দু-এক বছর ছাড়া প্রতিবছরই সরকারি পাটকলগুলো শত শত কোটি টাকা লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও ৩টি নন-জুট। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই বিজেএমসির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯৫ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৪৬৬ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৮১ কোটি টাকা। বেসরকারি পাটকলগুলো বেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও সরকারি পাটকলগুলোর লোকসান বলতে গেলে অবধারিত। লোকসানের কারণগুলোও এখন সবার জানা।

ভরা মৌসুমে পাটের দাম কম থাকলেও তখন না কিনে প্রায় দ্বিগুণ দামে দেরিতে পাট কেনা, যন্ত্রপাতি পুরনো, উৎপাদনশীলতা কম, উৎপাদন খরচ বেশি, বেসরকারি খাতের তুলনায় শ্রমিক সংখ্যা বেশি হওয়ায় লোকসানের দায় থেকে বের হতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো। এক কথায় বলা যায়, পাটকলগুলোর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষ আর অযোগ্য ব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকলেও রহস্যজনকভাবে এর কোনো সুরাহা করা যাচ্ছে না, যার দায়ভার সরকারগুলোও এড়াতে পারে না কোনোভাবে। কারণ পাট কেনার অর্থ কেন সময়মতো বরাদ্দ দেওয়া হয় না, সরকারি পাটকলগুলোর বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত পণ্য কেন অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকে, আধুনিক যন্ত্রপাতি কেন স্থাপিত হয় না, বেসরকারি পাটকলগুলোর তুলনায় সরকারি পাটকলে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে কেন ইত্যাদি প্রশ্নের সমাধান না করে মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলাকেই সহজ পথ হিসেবে ধরে নিয়ে আসছে প্রতিটি সরকার।

২০০৭ সালে দেশের চারটি সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট কলগুলোতে পাঠানো বিজেএমসির সচিব স্বাক্ষরিত চিঠির ভাষা ছিল এমন- ‘গত ০৩/০৬/০৭ ইং অনুষ্ঠিত বিজেএমসির পরিচালকম-লীর ১৮৩,০৩/০৬-০৭ নং সভায় কর্ণফুলী জুট মিল লিমিটেড (উ.চ.ঋ সহ), এফ কে সি এবং কওমী ও পিপলস জুট মিলস লিমিটেডের অবস্থা, শ্রমিক পরিস্থিতি, কাঁচা পাটের অভাব, তীব্র অর্থ সংকট ও উৎপাদন ঘাটতি, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ইত্যাদি কারণে পারফরমেন্স সন্তোষজনক পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে না মর্মে প্রতীয়মান হওয়ায় এই চারটি মিল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।’ অর্থাৎ, নানা ধরনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতি সরকারিভাবে স্বীকার করে নেওয়া হলেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি কখনো, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাগুলো চিহ্নিত হলেও সেগুলোর নিরসনেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

পাটকলগুলোর দুরবস্থার দায় থেকে শ্রমিক নেতাদেরও মুক্তি দেওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। মিল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির সঙ্গে তাদের থাকে শক্ত সংশ্লেষ, পাশাপাশি ঘুষের বিনিময়ে সংখ্যাতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয় কথিত শ্রমিক নেতাদের চাপাচাপি আর হুমকি-ধামকিতে। অথচ সব পাপের দায় এসে পড়ে হতভাগা সাধারণ শ্রমিকদের ঘাড়ে। কিছুদিন পরপরই ১০-১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া পড়ে শ্রমিকের, কখনো বা মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পথে বসেন হাজার হাজার শ্রমিক। সংসারের ঘানি টানতে না পেরে চরম হতাশা থেকে কেউ বা আত্মহত্যা করেন, কেউ বা আরও অমানবিক কোনো পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন। খুলনার পিপলস জুট মিল বন্ধ হয়ে গেলে নারী শ্রমিকদের অনেকে পতিতাবৃত্তিতে নামতে বাধ্য হন, যা আমার নিজের চোখে দেখা।

পাটের সম্ভাবনা এখন বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি, এর পেছনের অন্যতম কারণ পরিবেশ সচেতনতা। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হচ্ছে পাটের নতুন নতুন বাজার। গাড়ি ও বিমানের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন এবং সৌন্দর্যবর্ধনে পাটজাত পণ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্র যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি বিএমডব্লিউ, ভক্স ওয়াগনের মতো বিশ্বখ্যাত গাড়ির বহু যন্ত্রাংশ তৈরিতেও ব্যবহার বাড়ছে পাটের। পেপার অ্যান্ড পাল্প, ইনসুলেশন, জিও টেক্সটাইল, হেলথকেয়ার, ফুটওয়্যার, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন, স্পোর্টস শিল্পও এখন অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে পাটের ওপর। ইউরোপের ২৮টি দেশে একযোগে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় সুযোগ এসেছে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির। কিন্তু এসবের তেমন কোনো কিছুই কাজে লাগাতে পারছি না আমরা।

২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে পাট খাতকে লাভজনক করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পাটের পুরনো গৌরব আর ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া খুলনার খালিশপুর জুট মিলস, দৌলতপুর জুট মিলসহ বেশ কয়েকটি জুটমিল ফিরিয়ে নিয়ে আবার চালু করে সরকার। পাট কিনতে এবং শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাবদ গত ১০ বছরে বিজেএমসিকে সাত হাজার কোটি টাকা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তারপরও দায় কাটিয়ে উঠতে পারছে না রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি। বিজেএমসির কিছু অসাধু কর্মকর্তার অদূরদর্শিতা-দুর্নীতির আর সিবিএ নেতাদের দৌরাত্ম্যের কারণে নতুনভাবে জেগে ওঠা পাটের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আবারও ধ্বংস হতে চলেছে। গেল ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাই বলেছেন, ‘পাট এমন একটি পণ্য, যার কিছুই ফেলনা নয়। অতএব কেন এতে লোকসান হবে? আমি কোনো লোকসানের কথা শুনতে চাই না, বরং পাটশিল্প কীভাবে লাভজনক হবে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে তার আবেগ এবং দৃঢ়তার কণ্ঠে এমন কথা উচ্চারণ করলেও দুর্নীতিবাজদের কাছে তা ধোপে টিকছে না।

এদিকে ২০১৫ সালে জাতীয় নতুন পে-স্কেল চালুর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হলেও একই সময়ে শ্রমিকদের জন্য জাতীয় মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের ঘোষণা কার্যকর হয়নি আজও। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মজুরি বকেয়া থাকায় পরিবারে সদস্যদের নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন পাটকল শ্রমিকরা।

রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতায় ৯ দফা দাবি আদায়ে ক’দিন পরপরই রাজপথকেই ঠিকানা করে নিতে হচ্ছে ক্ষুব্ধ ৭০ হাজার মেহনতি মানুষকে। আসন্ন ঈদকে উপলক্ষ করে সরকার তাদের বেতন-ভাতা-বোনাস বাবদ ১৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও শ্রমিকরা তা যথাসময়ে পাবে কিনা এ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। নেপথ্যে, রাষ্ট্র যখন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত একটা প্রশাসন দ্বারা দুর্বৃত্তায়িত, তখন একজন প্রধানমন্ত্রী অথবা হাজারও শ্রমিকের কণ্ঠ কতটুকুই বা উচ্চকিত হতে পারে!

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক
monjurpanna777@gmail.com