মসজিদে অবস্থানের ফজিলত

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

মসজিদে অবস্থানের ফজিলত

আরিফুর রহমান জসিম ৯:৫৮ অপরাহ্ণ, মে ২৫, ২০১৯

print
মসজিদে অবস্থানের ফজিলত

মাহে রমজান মানবজাতির জন্য আল্লাহর অফুরন্ত রহমত ও নেয়ামত বয়ে আনে। তন্মধ্যে ইতিকাফ বা নিয়তসহ মসজিদে অবস্থান অন্যতম। সাধারণত আমরা নেয়ামত বলতে অপ্রত্যাশিত টাকা-পয়সা, পদমর্যাদা বা অন্তত ভালো খাবার জিনিস বুঝি। কিন্তু ইতিকাফের এ নেয়ামতের স্বাদ ভিন্নতর।

ইতিকাফ শুধু আজ নয়, মানব সভ্যতার শুরু থেকে এর রেওয়াজ প্রচলিত। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) মক্কা নগরীতে যে তাওহিদি সভ্যতা ও সংস্কৃতির গোড়াপত্তন করেন তাতেও তাওয়াফ ও নামাজের সঙ্গে ইতিকাফ বিধিবদ্ধ ছিল। এমনকি হজরত ইব্রাহিম ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে কাবাঘর নির্মাণের পেছনে আল্লাহর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, এ ঘরে যেন তার বান্দারা এসে ইতিকাফ করেন। আল্লাহ বলেন, আমি ইব্রাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পাক পবিত্র রাখ। (সুরা বাকারা : ১২৫)। এই ঘোষণা ও নির্দেশ থেকেই ইতিকাফের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

শহুরে পরিবেশে কর্মজীবনে আমরা যখন হাঁপিয়ে উঠি তখন এতটুকু শান্তির আশ্রয় চাই। এমন কোনো ঠিকানা খুঁজে বেড়াই, যেখানে নিরিবিলি নির্জনে আপন মনের সঙ্গে কথা বলতে পারব। নিজেকে আবিষ্কার করতে পারব। যারা জাগতিক অর্থ, বিত্ত, বৈভব, ক্ষমতা ও পদমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত তাদের মনও অসহায়ভাবে কাঁদে এমনই একটু জায়গা, একটুখানি আশ্রয়ের জন্য। তারা ছুটে যায় পার্কে, নিসর্গের কোলে। কিন্তু তারা কি শান্তির নাগাল পায়?

নিঃসন্দেহে এ ধরনের অতৃপ্ত হৃদয়ের সবচেয়ে উত্তম ঠিকানা মসজিদ। মসজিদের নিভৃত অন্দরে ইতিকাফ। ইতিকাফে সংসারের সঙ্গে সাময়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে মানুষ চলে যায় আপন ভুবনে। সেখানে আপন মনের সঙ্গে কথা বলে। নিজেকে আবিষ্কার করে। অতীতকে বিশ্লেষণ করে। একান্তভাবে নিজেই নিজের মাঝে হারিয়ে যায়। তখনই খুঁজে পায় পরম সত্তাকে। যিনি তার আত্মার আত্মীয়। যিনি তার মনের কানে সারাক্ষণ কথা বলেন। ইন্দ্রিয় আকর্ষণ প্রলোভন ও জাগতিক ব্যস্ততায় যে কথা শুনতে পায়নি এতদিন, আজ মসজিদের নিভৃত কোণে, মহিলারা ঘরের নিঃসঙ্গ অন্দরে সে কথা শোনে, তার সঙ্গে কথা বলে।

দুনিয়ার সব মানুষই চায় পরম প্রেমাস্পদ আল্লাহর সঙ্গে তার যোগাযোগ হোক। আল্লাহ সদা রহমতের দুয়ার খুলে রাখুন তার প্রতি। কিন্তু সে পথ খুঁজে পায় না। এমন অনেক ধর্ম আছে, যার অনুসারীরা সংসার ত্যাগ করে বৈরাগী সেজেছে কিন্তু তার সন্ধান পায়নি। ‘প্রোপার চ্যানেল’ বলে একটি কথা আছে। এটা বাদ দিয়ে অযথা ঘুরলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে হবে। ইসলাম সেই সাধনার, তাকে পাওয়ার সরল-সহজ পথ দেখিয়েছে ইতিকাফের মাধ্যমে।

আজীবন বৈরাগী হয়ে পথে ঘাটে উদভ্রান্ত হওয়া নয়, বরং সংসারে সংযমী হয়ে লোকালয়ে নিজের মনের মাঝে তাকে আবিষ্কার করার প্রক্রিয়া শিখিয়েছে, যার একটি ইতিকাফ। অর্থাৎ কয়েকটি দিনের জন্য একমাত্র আল্লাহর হয়ে যাওয়া। তখনই আল্লাহর সঙ্গে আত্মার গভীর বন্ধন সৃষ্টি হবে, আত্মিক জগতের জ্ঞান, রহস্য ও সম্পদরাশি অবিরাম বর্ষিত হবে।

আধ্যাত্মিক সম্পদরাশির অন্যতম খনি লাইলাতুল কদর লাভ করতে হলে তাই প্রয়োজন ইতিকাফ। নবী করিম (সা.) তা-ই করেছেন। নবুওয়াত লাভের পূর্বেও রাসুলে পাক (সা.) মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যান মগ্নতায় কাটিয়েছেন বহু বছর। বিশেষত নবুওয়াত লাভের পূর্বে একাগ্র ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন হেরা গুহায় টানা ছয় মাস। মা খাদিজা (রা.) পানীয় ও আহার পৌঁছে দিতেন প্রিয়তম স্বামীর কাছে দুর্গম পর্বত চূড়া হেরা গুহায়।

আরিফুর রহমান জসিম : খতিব ও ইসলামী চিন্তাবিদ