আসলে কে ধার্মিক?

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

আসলে কে ধার্মিক?

সাইদ রহমান ৯:১২ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৯

print
আসলে কে ধার্মিক?

ফেসবুকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা গল্প দিয়েই শুরু করা যাক-
কোরিয়ানদের কাছে রোজা নাকি এক বিস্ময়ের নাম! রোজার বিষয়ে তাদের অনেক মজার মজার প্রশ্নও আছে। এক বাঙালির সঙ্গে সাক্ষাতে তার কয়েকটি উগরে দিলেন এক কোরীয়-
-পানিও খাওয়া যাবে না?
-সিগারেটও না?
-লুকিয়ে যদি খাও?
-যদি শাওয়ারে ঢুকে পানি খাও?

মুচকি হেসে বাঙালির জবাব, শাওয়ারে ঢুকে লুকিয়ে কেন খাব? আমি তো ইচ্ছা করলে বিরিয়ানি রেঁধে ঘরে বসেই খেতে পারি, কেউ তো আমাকে বাধা দিচ্ছে না! তখন শুরু হয় বিস্ময়ের চূড়ান্ত ধাপ-
-তাহলে কেন খাও না?
বাঙালির জবাব, এটা স্রষ্টার আদেশ। আমরা তার আদেশ পালন করি।
-তিনি দেখতে পাবেন বলে?
-তোমাদের এত সংযম!
-এত আত্ম-নিয়ন্ত্রণ!
-তবে তো নিশ্চয়ই তোমাদের দেশে কেউ মিথ্যা বলে না। কেউ পাপ করে না। কেউ কাউকে ঠকায় না, কেউ অন্যের হক নষ্ট করে না। চোর ডাকাতও নেই, পুলিশও লাগে না, জেলখানাও নেই!

এই গল্পের সত্যতা খোঁজা বাতুলতা বরং খুঁজতে হবে অন্যকিছু। গল্পের মাধ্যমে যে তেতো সত্যের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বুঝতে হবে সেটাকে। উত্তর খুঁজে বের করতে হবে, কেন ধর্ম চর্চা এবং অপরাধ হাত ধরাধরি করে চলছে। এই সময়ে এটা একটা বিশেষ গবেষণার বিষয়ও হতে পারে। আপাত বিষয়টি ‘প্যারাডক্সিক্যাল’ মনে হলেও আসলে তা নয়। যে পরম্পরায় ধর্ম আমাদের কাছে আসে, যেভাবে আমরা ধর্মকে আত্মস্থ করি, সেখানে একটা বড় ফাঁকি থাকায় এমন হচ্ছে বলে মনে হয়। সেই ফাঁকি বা গ্যাপটা হলো ‘মোরাল’।

ছোটবেলায় যে মক্তবে প্রথমবারের মতো আমাদের সঙ্গে ধর্মের পরিচয় ঘটে, সেখানে ধর্ম শেখাতে গিয়ে শিক্ষক একটা শিশুকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলেন-এ চিত্র এখনো আছে। এই তো অধর্মের শুরু, মানবিক ধর্ম ইসলাম শেখাতে গিয়ে শুরুতেই ‘অমানবিকতা’! ওই শিক্ষক নামাজ, রোজা শেখাচ্ছেন বটে কিন্তু দিতে পারছেন না মমত্ববোধ, মানবিকতা, সর্বোপরি অন্যের প্রতি সদয় হওয়ার দীক্ষা। ধর্ম যে মানবিক, মানুষের কথা বলে, মানুষের ইষ্ট করতে সর্বোচ্চ তাগিদ দেয়, অনিষ্ট করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে-এই বিষয়গুলো আড়াল করে ফেলা হয় তখন থেকেই। তাই ধর্ম আমাদের কাছে আসল রূপ নিয়ে পৌঁছে না।

ধর্মকে যদি একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে তুলনা করি তাহলে এভাবে বলা যায়, গুঁড়ির ভেতরের কালো অংশটা হলো ধর্মের মৌলিক অংশ। অপব্যাখ্যা, কুব্যাখ্যা, মনগড়া ব্যাখ্যার পলি জমে জমে ধর্ম এখন রুদ্ধ হওয়ার জোগাড়। জমেছে পুরু একটা সাদা অংশ তারপর বাকলসহ আরও নানা জঞ্জাল।

ধর্ম তো কেবল কতগুলো ‘রিচুয়াল’ নয়। সমাজে এর অনেক দায় দায়িত্ব আছে। অথচ অপব্যাখ্যা দিয়ে কিংবা আসল ব্যাখ্যা লুকিয়ে ধর্মকে মসজিদে আটকে রাখা হয়েছে। এখন আবার ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চেও এর খানিকটা অবস্থান দেখা যায়। কলা খেয়ে যে ব্যক্তি খোসাটা রাস্তায় ফেলছে তাকে কে শেখাবে, এটা করা অধর্ম। এক বেলা নামাজের চেয়ে এটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয় কিংবা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

জগতের সব অশান্তির মূলে তো ওই-ই, একজন আরেকজনের ক্ষতি করছে বা এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীর ক্ষতি করছে। উপকার করার কোনো প্রয়োজন নেই, সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে অন্তত এই শপথ করে যে, সজ্ঞানে আমি অন্যের ক্ষতির কারণ হব না, তাহলেই তো পনের আনা সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু ধার্মিকের কাছে ওইটুকু আশা করাই যেন সুদূরপরাহত।

পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, পাপ এবং অপরাধের মধ্যে পার্থক্য আছে। তর্কের খাতিরে কেউ দুটোকে এক বলতেই পারেন। তবে মোটা দাগে পার্থক্য হলো, যেগুলো হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক, সেগুলো লঙ্ঘন করা পাপ। আর যেগুলো হক্কুল ইবাদ তথা বান্দার হক, সেগুলো লঙ্ঘন করা অপরাধ। আল্লাহর হক যখন নষ্ট করা হয়, তখন অনুশোচনার মাধ্যমে তওবা করে সেটা মিটিয়ে ফেলা যায় কিন্তু বান্দার হক নষ্ট হলে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ সেটা বান্দার সঙ্গে বান্দার মধ্যকার বিষয়। এই দুই হক একত্রে প্র্যাকটিস না করলে ইসলাম ধর্ম পালন করা হয় না। অথচ এটাই হচ্ছে আমাদের সমাজে, দেশে।

একটা প্রশ্ন প্রায়ই মনে হয়, প্রতিবেশী নামাজ পড়লে বা রোজা রাখলে আমার কী লাভ? আমার লাভ তো তখন যখন সে আমাকে ল্যাং মারবে না। আমার পথের কাঁটা হবে না। আমার ন্যূনতম ক্ষতি করার চেষ্টা করবে না।

আমাদের সমাজে কোথায় অধর্ম, অসততা নেই? উল্টো দিকে জাপানের কথাই ধরুন, ওরা তো নামাজ পড়ে না। রোজাও রাখে না। ওদের দেশে শুক্রবারের জুমাতে রাস্তাসুদ্ধ ভিড় হয় না। বছরে দু’তিনবার ওমরাহ এবং প্রায় প্রতিবছর হজ করতে যায় না। ওরা সারাদিন ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে না। এবার প্রশ্ন, জাপানিরা কি আমাদের মতো এত ব্যাপকভাবে কর ফাঁকি দেয়? ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মেশায়? ওষুধ বিক্রেতা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রয় করে?

সদ্য ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথা বলি। জাপানকে দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয় মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণ করতে। প্রথম কথা, সময়সীমার অনেক আগেই নির্মাণকাজ শেষ করেছে। দ্বিতীয় কথা, বরাদ্দকৃত অর্থের পুরো টাকা খরচ হয়নি। বেঁচে যাওয়া ৭০০ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে তারা। চোখ কপালে তোলার মতো ঘটনা! আচানক খবর, প্রকল্প আবার ঠিক সময়ে হয় নাকি? সময়টা একটু বাড়িয়ে নিলেই তো চুরিটা আরেকটু বেশি সময় ধরে করা যায়, বরাদ্দও তরতর করে বাড়ে। আমাদের দায়িত্ব দিলে আমরা যে জাপানিদের উল্টোটাই করতাম, এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ আছে? তাহলে ধার্মিক কারা? কে ধার্মিক আর কে বকধার্মিক?

ধর্ম পালনে আমাদের মধ্যে একটা ‘স্ববিরোধী’ মনোভাব কাজ করে। সকালের আরামদায়ক ঘুম ছেড়ে যিনি ফজর নামাজ পড়লেন তিনিই খানিক পরে মাঠে গিয়ে আরেকজনের জমির আল ঠেলছেন! আপন ভাইয়ের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে আছেন অথচ ফিলিস্তিনি মুসলমানদের দুর্দশার সংবাদে উত্তাল হয়ে ওঠেন। যে অন্যায় নিজে সকাল সন্ধ্যা করেন সে অন্যায় অন্য ধর্মের কেউ করলে ‘মালাউন’ বলে হাঁক দিয়ে মার মার কাট কাট করে হামলে পড়েন।

রোজা এলেই মাথায় টুপি দিয়ে দোকানদার যে পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেন এটার এমনি এমনি করেন না। তিনি আসলে টুপির কাছে আশ্রয় নেন, টুপি দিয়ে চুল ঢাকেন না, অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করেন। এদের যে নেতা (ইমাম), তিনি যদি মসজিদে গেলে স্পষ্ট করে বলতেন, আপনাদের মধ্যে যারা পঞ্চাশ টাকার জিনিস দুইশ টাকা বিক্রি করে এসেছেন তাদের জন্য নামাজটা জরুরি নয়।

বোধকরি, মুসল্লিদের কাছে সেটা হয়ে উঠতো একদম অচেনা কথা। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে? ইমাম নিজেও তো অমনটা বিশ্বাস করেন না।

‘ইসলামিক দেশগুলো কতখানি ইসলামিক’-এ নিয়ে গবেষণা করেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হুসেন আসকারী। প্রায় প্রত্যেক বছরই তিনি এমন একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। ইসলাম ধর্মে রাষ্ট্র ও সমাজ চলার বিধান যে দেশগুলো প্রতিদিনের জীবনে মেনে চলে তা খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, যারা সত্যিকারভাবে ইসলামিক বিধানে চলে তারা কেউ মুসলিম দেশের নয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, সবচেয়ে বেশি ইসলামিক বিধান মেনে চলা দেশ হচ্ছে নিউজিল্যান্ড এবং দ্বিতীয় অবস্থানে লুক্সেমবার্গ। তারপর পর্যায়ক্রমে আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও কানাডা। মালয়েশিয়া ৩৮তম, কুয়েত ৪৮তম, বাহরাইন ৬৪তম, এবং অবাক করা কাণ্ড, সৌদি আরব ১৩১তম অবস্থানে। গ্লোবাল ইকোনমি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান সৌদিদেরও নিচে।

ড. হুসেন আসকারীর ভাষ্য, মুসলমানরা নামাজ, রোজা, হিজাব, দাড়ি, লেবাস নিয়ে অতি সতর্ক। কিন্তু রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলেন না। মুসলমানরা পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি ধর্মীয় বয়ান, ওয়াজ নসিহত শোনে কিন্তু কোনো মুসলিম দেশ পৃথিবীর সেরা রাষ্ট্র হতে পারেনি। অথচ গত ষাট বছরে মুসলমানরা অন্তত ৩০০০ বার জুমার খুতবা শুনেছে।

গবেষণায় একজন চাইনিজ ব্যবসায়ীর ভাষ্য তুলে ধরা হয়েছে-‘মুসলমান ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে এসে নকল জিনিস বানানোর অর্ডার দিয়ে বলে, অমুক বিখ্যাত কোম্পানির লেবেল লাগাবেন। পরে যখন তাদের বলি, আমাদের সঙ্গে খাবার খান, তখন তারা বলে, এই খাবার হালাল না, তাই খাব না। তাহলে নকল মাল বিক্রি করা কীভাবে হালাল হলো?’

যারা এই গবেষণাকে ইহুদি নাসারার ষড়যন্ত্র বলার জন্য ঠোঁট নাড়তে যাচ্ছেন, তাদের বলছি, থামুন, প্রশ্নটা আপনার বিবেকের কাছেই রাখুন। দেখবেন, একই উত্তর মিলবে। বোঝার জন্য আপনাকে একটা তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারি-আপনি কি জানেন, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলোতে একের পর এক কারাগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অপরাধীর অভাবে! আর আমাদের অবস্থা-ধারণক্ষমতার অন্তত তিন গুণ!

মোদ্দা কথা দাঁড়ায় জর্জ বার্নার্ড শ-এর এই কথাটি-‘ইসলাম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং মুসলমানরা হচ্ছে নিকৃষ্টতম অনুসারী।’ তাহলে বাংলাদেশের মুসলমানরা মানে আমরা নিশ্চয়ই নিকৃষ্টতম থেকেও বেশি কিছু। আমাদের দেশে অনেক মুসলমান আছে, কিন্তু ইসলাম নেই। তাদের দেশে মুসলমান নেই কিন্তু ইসলাম আছে!

মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনো ‘ইজম’ জগৎকে শুদ্ধ করতে পারবে না একমাত্র ব্যক্তি নিজে ছাড়া। নিজের যা যা করণীয়, পালনীয় তা সুচারুরূপে করতে পারলে জগৎ শুদ্ধ হয়ে উঠবে নিমিষেই। ‘ট্রেন্ড’ হিসেবে ধর্ম পালন করার চাইতে না করা ঢের ভালো। ধর্ম চর্চা তো অনেক হলো, এবার না হয় তার সঙ্গে একটু ‘মানুষ’ হওয়ারও চর্চা করি।

সাইদ রহমান : সাংবাদিক
sayd.rahman99@gmail.com