চাকিরপশা নদী কি উদ্ধার হবে?

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী

চাকিরপশা নদী কি উদ্ধার হবে?

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৯:১০ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০১৯

print
চাকিরপশা নদী কি উদ্ধার হবে?

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার একটি নদীর নাম চাকিরপশা। আমি বেড়ে উঠেছি এই নদী পাড়ের গ্রামে। এ নদী আমার শৈশবের নদী। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন দলবেঁধে নদীতে স্নান করতে যেতাম। সবাই বলত নদীতে স্নান করতে যাই। কি টলটলে পানিই না ছিল সে নদীর। গরমের দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে স্নান হতো। অনেক দূরের মানুষও আসতেন এই নদীতে স্নান করার জন্য। বিকালে আমরাই বলতাম নদী পাড়ে বেড়াতে যাই। শুধু তাই নয়, রাতেও আমরা এই নদী পাড়ে ঘুরতে যেতাম। দেশের সব নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা মানুষের শৈশব-কৈশোর অনেকটাই অভিন্ন। এই নদীর পাড়ে একটি ঘাটের নাম সুরির ঘাট।

সরকারিভাবে নদীটির ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালানো শুরু হয়েছে। সরকারিভাবেও যে দেশে কত নদীর সর্বনাশ করা হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। কেউ কেউ বলছেন, জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তখন উলিপুরের বিএনপির এক নেতার আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য দ্রুত একটি সড়ক তৈরি করা হয়। প্রথমে এই নদীর সর্বনাশ করা হয় নদীর ওপর আড়াআড়ি সড়ক করার মাধ্যমে। কোনো সেতুর ব্যবস্থা না করে নদীর ওপর দিয়ে সড়ক করার কারণে নদীর প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়। এতে করে উজানে এখনো অনেক স্থানে ভীষণ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। যে জমিতে আগে বছরে দুবার ধান ছাষ হতো, এখন সেখানে একবার ধানচাষ করা যায়। উজান থেকে পানি আসতে পারে না বলে ভাটির নদীরও অবস্থা করুণ হতে থাকে। ধীরে ধীরে নদীটি প্রাণ হারাতে থাকে।

স্থানীয় লোকজন নদীটিকে আর প্রবাহমান দেখতে পায় না। সে কারণে নদীটিকে বিল নামে উল্লেখ করতে থাকে। চাকিরপশা নদীর নাম হয়, চাকিরপশার বিল। কয়েক বছর এ নদীটি বিল হিসেবেই পরিচিত হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক বছরে এই বিলটিও তার চরিত্র হারাতে থাকে। বিলের ভেতর অনেক বড় বড় পুকুর হয়েছে। এখন চাকিরপশা নদী চাকিরপশার পুকুর নামে পরিচিত। কারণ প্রথমে নদী, পরে বিল বলে পরিচিত হলেও চাকিরপশায় অনেক বড় বড় পুকুর হওয়ার কারণে এখন লোকমুখে চাকিুরপশার পুকুরই বেশি পরিচিত।

চাকিরপশার পাড়ে যে সুরিরঘাট ছিল সেই ঘাটের নাম এখন হয়েছে বটতলা। সম্প্রতি রাজারহাট উপজেলার এক রিকশাওয়ালাকে বলেছিলাম সুরিরঘাট যাবে কিনা? সে চোখ কপালে তুলে আমাকে জানালো রাজার হাটে তো সুরিরঘাট নাম কোনো জায়গা নেই। আমি বিস্মিত হয়ে স্থান নির্দেশ করলে তিনি আমাকে বললেন-‘তোমরা মনে হয়, এই এলাকা নয়া আসছেন। সুরির ঘাট নয়, ওই এলাকার নাম, বটতলা।’ এই হলো চাকিরপশা নদী ও এলাকার লোকজনের অবস্থা।

চাকিরপশা নদীর সুবর্ণ অতীত জানার জন্য অশীতিপর বৃদ্ধের কাছেও যেতে হয় না। নদীপাড়ের মাঝ বয়সী মানুষ মাত্রই নিকট অতীতে এ নদী কেমন ছিল সে সম্পর্কে বলতে পারেন। স্থানীয় অনেকেই আমাকে নদীটি উদ্ধার করা সম্ভব কিনা জানতে চান। আমি বলি অবশ্যই এ নদী উদ্ধার করা সম্ভব।

চাকিরপশা নদীর পাড়ে তাকালে বোঝা যায় অতীতে কোথাও কোথাও এ নদীর প্রস্থ প্রায় এক কিলোমিটার ছিল। এ নদীর নামে রাজারহাটে একটি ইউনিয়নের নামকরণ হয়েছে। কৈলাশকুটি নামের একটি ছোট গ্রাম আছে এই নদীর মাঝ বরাবর। গ্রামটি অনেকটা দীপচরের মতো। চারদিকে পানি ছিল মাঝখানে এই গ্রাম। নৌকা ছাড়া আর কোনো পথ তাদের ছিল না।

বর্তমানে রাজারহাট থেকে নাফাডাঙা যাওয়ার পথে সুরিরঘাট থেকে সামান্য দূরে সড়ক সেতুর সংলগ্ন নদীটি কয়েক ফুটে পরিণত হয়েছে। চান্দামারী গ্রামের পাশ দিয়ে চাকিরপশা নদীটি প্রবাহিত হয়েছে। রাজারহাটের পশ্চিম দিক থেকে ঘড়িয়াল ডাঙা নামক আরেকটি নদী এসে এই নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। বর্তমানে ঘড়িয়ালডাঙা নদীও দখলদারদের দখলে। এ দুটি নদীর পানি নিয়ে এ নদীটি নাজিমখান নামক স্থানের কিছুটা আগে বুড়িতিস্তা নাম ধারণ করে।

বুড়িতিস্তা নদী নাজিমখান বাজার ঘেঁষে দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আগে তিস্তা নদী থেকে কিছুটা উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলা শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাটিতে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হতো। ২৫-৩০ বছর আগে তিস্তা নদী উত্তর পাড় ভেঙে অনেকটা উত্তরে এগিয়ে এলে তিস্তা নদী বুড়িতিস্তার সঙ্গে মিলিত হয়। তিস্তা সরে এসে বুড়িতিস্তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার কারণে বুড়িতিস্তা দুভাবে বিভক্ত হয়।

রাজারহাট থেকে যে চাকিরপশা তথা বুড়িতিস্তা প্রবাহিত হয়ে পূর্বে যেটি বৃহ্মপুত্রে মিলিত হতো এখন তা তিস্তায় মিলিত হচ্ছে। অর্থাৎ এ নদীটি এখন তিস্তার একটি উপনদী। আবার উলিপুরের অংশে থাকা বুড়িতিস্তা এখন তিস্তার শাখা নদী।

এখন স্থানীয় জনগণ চান, সরকারিভাবে এ নদীটি উদ্ধার করা হোক। এ নদীতে এক সময় হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে দখলের কারণে নদীর এমন অবস্থা হয়েছে যে জেলেরা মাছ ধরা পেশা ছেড়ে অন্য পেশা খুঁজে বেড়াচ্ছে। নদীটির প্রবাহ বন্ধ হওয়ার কারণে অনেক জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দখল হয়ে যাওয়া এ নদীটি উদ্ধারে এলাকার জনগণ সংগঠিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের নদী আইন অনুযায়ী একবার যে জমি নদী হিসাবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে সেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করার কোনো উপায় নেই। নদীর জমি ভাগ করে পুকুর হিসেবে লিজ দেওয়াও বেআইনি। নদীতে জলাশয় ঘোষণা করে জেলেদের জন্য লিজ দেওয়াও নিয়ম বহির্ভূত। এই অবস্থায় চাকিরপশার নদীর পুরনো দলিল দেখে দখলদার উচ্ছেদ করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ জানে না, নদীর জমি লিজ দেওয়ার আইন আছে কিনা। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের অসাধু ব্যক্তিরা অবৈধ সুবিধা নিয়ে নদীর জমি দীর্ঘদিনের জন্য লিজ দেয়। স্থানীয় সরকারি অফিসের যেসব ব্যক্তি নদীর জমি লিজ দেওয়ার কাজে সম্পৃক্ত ছিল অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

স্থানীয় জনগণ চাইলে অবশ্যই এ নদী উদ্ধার করা সম্ভব। সে জন্য সংগঠিত হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে বাধ্য করতে হবে নদীর দখলদার উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে। সেটি সম্ভব না হলে জেলা প্রশাসনের কাছে যেতে হবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছে প্রতিকার চাইতে হবে। যে প্রশাসন নদীর ওপর ব্রিজ ছাড়াই আড়াআড়িভাবে সড়ক নির্মাণ করেছে তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।

কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা না হলে যারা দখল করেছে তাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যারা নদীটির প্রাণপ্রবাহ ফেরাতে চান তাদের এই বিশ্বাস রাখতে হবে, অন্যায়ভাবে নদী সারা জীবন কেউ ভোগ করতে পারবে না। দখলকৃত নদী কোনো না কোনো সময় উদ্ধার হবেই। যারা দখলদার আছেন তাদেরও মনোবৃত্তি এই থাকা বাঞ্ছনীয় যে, রাষ্ট্রের সম্পত্তি অবৈধভাবে দিনের পর দিন দখলে রাখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান, বাংলাদেশের নদীগুলো রক্ষা হোক। সুতরাং নদীর জন্য উজ্জ্বল সময় অপেক্ষা করছে। মাঠ থেকে প্রতিবাদ গড়ে উঠলে দ্রুতই এর ফল পাওয়া সম্ভব। গণমানুষ নদীর পক্ষে।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
রংপুর ও পরিচালক, রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com