একটি জাতীয় নদী চাই

ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে ২০১৯ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী

একটি জাতীয় নদী চাই

ড. তুহিন ওয়াদুদ ১০:১০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০১৯

print
একটি জাতীয় নদী চাই

আমাদের ফুল-ফল-পাখি-পশু-উদ্যানসহ অনেক ক্ষেত্রেই ‘জাতীয়’ স্বীকৃতি আছে। আমাদের নদী প্রশ্নে সেই ‘জাতীয়’ স্বীকৃতি মেলেনি। অথচ, বাংলাদেশ হচ্ছে নদীমাতৃক দেশ। আমাদের জীববৈচিত্র্য, আমাদের জীবিকা সবকিছুর সঙ্গে নদ-নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আমাদের দেশ ছিল সহস্রাধিক নদ-নদীর দেশ। সেই সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। এর অন্যতম কারণই হচ্ছে, আমরা নদীকে আমাদের জীবনের কাজে ব্যবহার করিনি। নদী ব্যবহারে আমাদের সবরকম সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা নদীকে আপন না করে দূরেই ঠেলে দিয়েছি।

নদী আমাদের অভিশাপ নয় আশীর্বাদ-একথা আমরা মুখে বললেও এখনো কার্যত স্বীকার করি কি না সন্দেহ। তা না হলে আশীর্বাদকে কেউ পায়ে ঠেলে দিতে পারে? আমাদের দেশে যেসব বিষয়ের সঙ্গে ‘জাতীয়’ প্রসঙ্গটি আছে সেসবের প্রতি আমাদের ঐক্যবদ্ধ একটি ভালোবাসা আছে। জাতীয় ফুলটির প্রতি এক প্রকার বিশেষ ভালোবাসা উপলব্ধি করা যায়।

আমাদের যদি একটি জাতীয় নদী থাকত তাহলে নিশ্চয় সেই নদীটিকে দূষণমুক্ত রাখা হতো। নিশ্চয়ই সেই নদীটিকে দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হতো। সেই নদীটি হয়ে উঠত আমাদের বিনোদনের অন্যতম স্থান। পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হতো। প্রতিবছর প্রয়োজনীয় খনন করা হতো। যেহেতু জলের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকত তাই সে নদীটির বুক বেয়ে চলত নৌযান। সেই নদীতে প্রচুর মাছ চাষ হতো। এক কথায় নদীটি পেত তার সব ধরনের অধিকার। সে কারণে আমরা একটি জাতীয় নদীর দাবি করে আসছি দীর্ঘদিন ধরে।

তিস্তা নদীকে জাতীয় নদী হিসেবে ঘোষণার যে দাবিটি উত্থাপন করা হয়েছে তার নেপথ্যে অনেক কারণ বিদ্যমান। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। তিস্তার অনেক শাখা নদী আছে এবং তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের উপনদী। তিস্তা নদীর জলপথ ব্যবহার করে দেশের সব প্রান্তে যাওয়া সম্ভব। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভারতের সেভেন সিস্টারস খ্যাত সাতটি প্রদেশের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রচুর মুনাফা করতে পারবে। তিস্তার পানিই রংপুর অঞ্চলের মঙ্গা দূরীকরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হওয়ার আগে তিস্তা পাড়ের এক বিশাল জনগোষ্ঠী তিন বেলা করে খাওয়ার সুযোগ পেত না। তারা তিন বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছেন তিস্তা সেচ প্রকল্পের কারণে।

তিস্তাকে বলা হয় উত্তরের জীবনরেখা। তিস্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন। এই তিস্তার আজ মরণদশা। যদি তিস্তাকে জাতীয় নদী ঘোষণা করা হয় তাহলে সরকার তিস্তাকে করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে না। ভারত যে অন্যায়ভাবে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে তিস্তাকে মৌসুমি নদীতে পরিণত করছে তার বিরুদ্ধে সরকারও রুখে দাঁড়াবে। বর্তমানে তিস্তার পাড়ে লাখ লাখ মানুষ পানির অভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জেলে, মাঝি সম্প্রদায়। শুধু তাই নয় নদীটি মরতে বসেছে। যদি তিস্তাকে জাতীয় নদী করা হতো তা হলে এ নদীটি যে বিশেষ যত্ন লাভ করত তার মধ্য দিয়ে নদীটি লাভ করত বারোমাসি প্রাণ।

বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় নদী জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই নদী দেশের যে কোনো নদীই হতে পারে। যেমন বাংলাদেশ-ভারত স্বীকৃত আন্তঃসীমান্তীয় নদীগুলোর মধ্যে কুলিক বাংলাদেশের একমাত্র নদী যেটি বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ে উৎপন্ন হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। এ নদীকে জাতীয় নদী ঘোষণা করা যেতে পারে। জনজীবনে দেশের সব নদ-নদীর কোনো কোনো ইতিবাচক প্রভাব আছে। দেশের যে কোনো একটি নদীকে জাতীয় নদী ঘোষণা করে সেই নদীকে আদর্শ নদীতে পরিণত করা সম্ভব।

জাতীয় নদী ঘোষণা প্রক্রিয়াটির প্রতি সরকারের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়। বরং জাতীয় নদী ঘোষণা সরকারের একটি অনেক বড় অর্জন হিসেবেই পরিগণিত হবে। বাংলাদেশে যারা নদী নিয়ে কাজ করেন তাদের কাছে ‘জাতীয় নদী’ স্বপ্নপূরণের সমান বলে বিবেচিত হবে।

নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের সংগঠক হিসেবে এটুকু অনুমান করতে পারি- যদি একটি নদীকে জাতীয় নদী ঘোষণা করা হয় তাহলে সেই নদীটি সরকারের সবরকম যত্ন পাবে। সব রকম যত্ন পেলে আমরা একটি আদর্শ নদী পাব। এই আদর্শ নদীটিই আমাদের পথ দেখাবে অন্য নদীগুলোকেও আদর্শ নদীতে পরিণত করার।

বর্তমান সরকার নদীর প্রতি অনেক মনোযোগ দিয়েছে। একটি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি নদীকে স্বতন্ত্র সত্তা ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে আরও শক্তিশালী করারও নির্দেশনা এসেছে। বাংলাদেশে এখন একটি নদীর জাতীয় স্বীকৃতি সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। রিভারাইন পিপলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন থেকে এই দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে নদী প্রসঙ্গে খুবই আশাবাদী।

বাংলাদেশে যারা নদী নিয়ে কাজ করছেন তাদের সবাইকে আহ্বান জানাই তারা সোচ্চার হবেন একটি জাতীয় নদীর দাবিতে। দেশের নদীবাদী সংগঠনগুলো একসঙ্গে এই দাবি উত্থাপন করলে জাতীয় নদীর স্বীকৃতি মিলবে যে কোনো একটি নদী। প্রথমে সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকা জরুরি, সরকার একটি নদীকে জাতীয় নদী করতে চায়। তারপর কোন নদীটিকে জাতীয় নদী করা যায় সেই প্রসঙ্গ। তবে আমরা মনে করি, এ জন্য তিস্তাই উপযুক্ত।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক,
বাংলা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও
পরিচালক, রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com