মি টু আন্দোলন ও বাস্তবতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৫

মি টু আন্দোলন ও বাস্তবতা

মঞ্জুরুল আলম পান্না ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

print
মি টু আন্দোলন ও বাস্তবতা

১.
খুব সহজে কেউ ভাবতে না পারলেও #মি টু আন্দোলনের ঢেউ হঠাৎ করে আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশে। অতি অল্প কদিনের মধ্যে একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠতে থাকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। প্রথম অভিযোগ ওঠে একটি শিল্প গ্রুপের কর্ণধারের বিরুদ্ধে। তারপর একে একে গুরুতর সব অভিযোগ উঠতে থাকে সাংবাদিক, সংবাদ পাঠক, প্রকাশক, আবৃত্তিশিল্পী, শিক্ষক, নাট্যকার, হাসপাতাল মালিকের বিরুদ্ধে। আন্দোলন দানা বাঁধে রাজপথে। অপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে একাধিক নারী সংগঠনসহ সাংবাদিকরা। সর্বশেষ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের এক নারী সাংবাদিক তার সহকর্মীর বিরুদ্ধে তুলেছেন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ।

তবে নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা প্রগতিশীল মানুষগুলোর প্রায় সবাই যেন নিশ্চুপ এখানে। কিছুদিন আগে এক নারী সাংবাদিককে একজন আইনজীবী কটূক্তি করাতেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সেদিন যারা প্রতিবাদের অগ্রভাগে ছিলেন, টিভি টকশোতে নারী অগ্রাধিকারের কথা বলেছিলেন, রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছিলেন মুহুর্মুহু হুঙ্কারে, সেই তারা এখন সামান্য কোনো কথাও বলছেন না। এই যে ক্ষেত্রবিশেষে সরব হয়ে ওঠা, আবার কখনো বা রহস্যজনকভাবে চুপ করে থাকা, এটাই আমাদের দীনতা। এই দীনতা আমাদের অপরাজনীতিকেন্দ্রিক বিভক্তির দীনতা, নির্লজ্জ সুবিধাবাদিতার দীনতা। এই দীনতা-হীনমন্যতাই সমাজ সংস্কারের পথকে আরও বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন করছে। তারপরও এ দেশের নারীরা যে সাহসী হয়ে উঠছেন, একথা বলা যায় নির্দ্বিধায়।

২.
বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ওই নারী সাংবাদিকসহ এ পর্যন্ত যারা #মি টু আন্দোলনে এই পুরুষবাদী সমাজে সাহস করে নিজেদের অন্ধকার দিনের ঘটনাগুলো তুলে ধরে অনেকের মুখোশ উন্মোচন করছেন, অভিবাদন প্রত্যেককে। তবে এ আন্দোলনে অভিযোগকারীদের সব অভিযোগই যে সত্য, তা মেনে নেওয়া একেবারেই সমীচীন নয়। এদের মধ্যে দু-একজনকে পাওয়া গেছে, যারা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কারও কারোর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন ফেসবুকে, যা তাদের লেখায় ঘটনার বর্ণনাতেই গরমিল থেকে স্পষ্ট হয়েছে।

অভিযুক্তদের কেউ কেউ যখন চ্যালেঞ্জ করেছেন, তখন চেপে গেছেন তারা। অন্যদের অধিকাংশ ঘটনা অনেক আগের হলেও তারা তাদের অভিযোগ জানিয়েছেন বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই। আর টেলিভিশনের ওই নারী সাংবাদিক তো শ্লীলতহানির অনেক ধরনের প্রমাণের কথা তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি রীতিমতো মামলা করে ফেললেন।

আলোচিত টিভি চ্যানেলটিতে কর্মরত অধিকাংশ সংবাদকর্মীসহ শ্লীলতাহানির শিকার ওই নারী সাংবাদিকের দাবি, যে পুরুষ সাংবাদিক যৌন হয়রানি করে আসছিলেন, তার আশ্রয় এবং প্রশ্রয়দাতা ওই প্রতিষ্ঠানেরই একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি একই সঙ্গে একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতাও।

তার কাছে এসব বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও তিনি নাকি কোনো ব্যবস্থা নেননি। নারী সংগঠন এবং সাংবাদিক সমাজের নির্লিপ্ততা এখানে তাই অনেকের কাছে পরিষ্কার। সহ্যসীমার বাইরে চলে যাওয়ায় নির্যাতনের বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ অন্য এক কর্মকর্তার নজরে আনেন ওই নারী। তিনি তখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এক পর্যায়ে থানায় মামলা হয় এবং অভিযুক্ত যৌন হয়রানিকারী সাংবাদিককে আটক করে পুলিশ।

৩.
এ দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীদের পক্ষ থেকে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের কথা কারোর জানা নেই। সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তার এক সহকর্মী তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলার পর ওই কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরবর্তীতে তার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। এর আগে আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশনের এক সম্পাদকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে সেই প্রতিষ্ঠানও তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও, সে সম্পর্কেও আমরা কিছু জানতে পারিনি।

অথচ কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার। ভারতে সাংবাদিক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা এম জে আকবর যৌন হয়রানির অভিযোগ মাথায় নিয়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন। বলিউড অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত খ্যাতনামা অভিনেতা নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে ১০ বছর আগে এক ছবির শুটিংয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এর জের ধরে বিগ বাজেটের ছবি ‘হাউসফুল ফোর’ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন নানা পাটেকর।

কর্মক্ষেত্রে নারীর যৌন হয়রানি ঠেকাতে জাতীয় পর্যায়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সরকার। যাকে ঘিরে #মি টু আন্দোলন শুরু, সেই মিডিয়া-মুঘল হার্ভে উইনস্টাইনও ছাড় পাননি। আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান গুগল জানিয়েছে, তারা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ হয়রানি, বৈষম্য ও এর প্রতিবিধান নীতি জনসমক্ষে প্রকাশ করবে। যৌন হয়রানির অভিযোগকারী কর্মী যাতে তার পাশে একজন সহায়তাকারী পান, সে ব্যবস্থাও করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদে গত বছর ১ নভেম্বর কাজ ছেড়ে একযোগে রাজপথে নেমে আসেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি দেশে কর্মরত গুগলের কর্মীরা।

গত দুই বছরে জাতিসংঘের স্টাফ ও কন্ট্রাক্টরদের এক-তৃতীয়াংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। জাতিসংঘ ও এর এজেন্সিগুলোর প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। কিন্তু যৌন হয়রানির শিকার মানুষগুলোর সবাই যে সাহস করে কথা বলতে পারছেন না, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক এই সংস্থার মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মন্তব্য, ‘যৌন হয়রানির বিষয়ে পুরোপুরি ও খোলামেলা কথা বলতে সক্ষম হওয়ার আগে আমাদের এখনো অনেক দূর যেতে হবে।’ যৌন সহিংসতার শিকার এ দেশের নারীদের পাশে এসে দাঁড়াতে না পারলে অপরাধপ্রবণতা জ্যামিতিক হারে বাড়বে।

বেসরকারি টেলিভিশনের নারী সাংবাদিকের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে উটপাখির মতো মুখ বুজে পড়ে থাকলে ঝড় থামবে না, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আরও ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দেবে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে। মার্কিন নারীবাদী কবি মিউরিয়েল রুকেসার বলেছেন, ‘যদি একজন নারী তার জীবনের সত্য প্রকাশ করে, তাহলে কী ঘটবে? দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে যাবে।’

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
monjurpanna777@gmail.com