সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আনন্দভ্রমণ

ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬

মাঠে-ঘাটে-বাটে

সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আনন্দভ্রমণ

তুহিন ওয়াদুদ ৯:১৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৯

print
সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আনন্দভ্রমণ

উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে এসে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কেবল পাঠক্রমের মধ্যে ডুবে থাকে। পাঠক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয় চাকরির জন্য পাঠগ্রহণ। এখনো আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা সনদনির্ভর এবং চাকরিমুখী। আর কিছু শিক্ষার্থী আছে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি নানারকম সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হয়। বিচিত্র সেসব সংগঠন।

এদের কাজে বৈচিত্র্য থাকলেও একটি কাজে অভিন্নতা আছে- তারা প্রত্যেকেই ভালো সংগঠন হয়ে ওঠে, ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন, সমাজজীবন সর্বত্রই যা অত্যন্ত প্রয়োজন। এই শিক্ষাটা হয়ে থাকে সংগঠন থেকে। অনেকেই অবশ্য আরও কম বয়স থেকে সংগঠন যুক্ত হয়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার দিনগুলোতেও অনেক সংগঠন ছিল। সংগঠন মানে প্রাণিত সময়ে মুখরিত জীবন। যারা সংগঠন করেননি, তাদের পক্ষে এই উপলব্ধি অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি, তখনো সংগঠন ছাড়িনি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময়ে বিজ্ঞানচেতনা পরিষদ করতাম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ছিলাম। কিছুদিন ‘স্বনন’-এ গিয়েছি আবৃত্তি শেখার জন্য। এর আগে উদীচীতে কাজ করেছি। ‘চিহ্ন’ নামে একটি ছোটকাগজ করার কাজে আমরা নিয়োজিত ছিলাম। দারুণ এক উদ্যম নিয়ে আমরা ছোটকাগজটি করেছি।

সেই ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ এখনো প্রকাশিত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক শহীদ ইকবাল চিহ্নপ্রধান। শামীম নওরোজ, ফারুক এবং শফিক আশরাফ মিলে চিহ্ন নামে এই ছোটকাগজ প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন। সেই কাগজের দ্বিতীয় সংখ্যায় আমরা যুক্ত হই।

বিশবিদ্যালয়ে এখন পড়াচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম যোগদান করা দুজন শিক্ষকের একজন আমি। এখানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ‘রণন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছি। এ সংগঠনের সংগঠকরা মিলে গিয়েছিলাম আনন্দভ্রমণে।

যারা মিলে গিয়েছিলাম, তারা নাটক-সংগীত-কবিতা-নৃত্যশিল্পের কর্মী। আনন্দভ্রমণই একমাত্র লক্ষ্য। সংগঠনের নাট্যনির্দেশক শাহীন রেজা সৈকত জানাল, ভোর ৬টায় যাত্রা শুরু হবে। ৬টায় মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। যখন ৬টা বাজে, দেখলাম সবকিছুই অন্ধকার। কুয়াশাময় ভোরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যখন আলো ফুটলো, তখন সকাল সাড়ে ৭টা। সাড়ে ৭টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দেখি গাড়ি দাঁড়ানো। কেউ কেউ এখনো আসতে বাকি। ততক্ষণে শীতকুয়াশায় এক দোকানে বসে তারা লাল চায়ের কাপে ঝড় তুলেছে। যারা বিলম্বিত তাদের জরিমানা করা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। একে একে সবাই যখন এলো তখন সকাল ৮টা। যাত্রা শুরু হল।

মুহূর্তেই জমে উঠল ভ্রমণ। ভ্রমণ হয়ে উঠল আনন্দময়। এতগুলো সৃজনশীল মানুষ একসঙ্গে হলে আনন্দের ধুম পড়াটাই স্বাভাবিক। একটি শ্রেণিকক্ষে সবই সৃজনশীল হবে এমন তো কোনো কথা নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক সংগঠক মানেই অন্যদের থেকে আলাদা। বিচিত্র বিষয়ের অবতারণায় গাড়ি কলহাস্যে পরিপূর্ণ। সেলফি, ফেসবুক লাইভ সবই চলছে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, নির্বাচন নিয়ে বিবিসির খবর পর্যন্ত কোনো কিছুই বাদ থাকছে না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই দুভাগে বিভক্ত হয়ে গানের খেলা শুরু। একদল যেখানে গান শেষ করবে, অন্যদলকে শেষ শব্দের শেষ বর্ণ দিয়ে গান বলতে হবে। একজন গান শেষ করলো যার শেষ বর্ণ মূর্ধন্য-‘ষ’। অপর পক্ষ ষাঁড় দিয়ে একটি গানের কলির অবতারণা করে। এবার গানের শেষ অনুস্বার ‘ং”। এটা দিয়ে তো আর গান শুরু করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে হার-জিতের নানান বুলি আওড়াতে থাকে পরস্পর।

১২ জন শিক্ষার্থী যারা এ ভ্রমণে ছিল, তারা সাবাই স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্র্যময়। বিনয়বোধে সবাই সমৃদ্ধ। এরা সবাই শুধু শিল্পের সমঝদার নয়, শিল্পীও বটে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চৌধুরী তো রীতিমতো গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী। নদী নিয়ে তার ‘আজ রক্ত নালি শুকিয়ে গেছে রক্ত শূন্য দেশ’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তার এই গান শুনে প্রখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজের একটি গানে সুর এবং কণ্ঠ দেওয়ার কথা বললে সঞ্জয় চৌধুরী আনন্দের সঙ্গে তা গ্রহণ করেন এবং সেই গানও জনপ্রিয়তা লাভ করে। অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু এ গানে অংশ নিয়েছেন।

শাহীন রেজা সৈকত অত্যন্ত সম্ভাবনাময় নাট্যনির্দেশক। ক্যাম্পাসে তার বেশ কয়েকটি নাটকে নির্দেশনার কাজও করা হয়েছে। তার নির্দেশিত নাটকের মধ্যে অন্যতম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোড়ায় গলদ’। এ ছাড়াও সে অনেক নাটক লিখেছে এবং নির্দেশনা দিয়েছে। আকাশ নাচ করে এবং নৃত্যনির্দেশক। প্রীতম কুণ্ডু খুব সুন্দর গান করে। রাজীবের গানের বিষয়ে আগ্রহের কমতি নেই। কুমারী হ্যাপী রায়ও ভালো শিল্পী। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো শিল্পীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্পীরাই সেদিন গিয়েছিল পঞ্চগড়।

কোথায় সকালের নাশতা আর কোথায় দুপুরের খাবার তার কোনোটাই ঠিক করা নেই। সকালের নাশতা করার আগে পঞ্চগড়ে সবাই মিলে নেমে যায় করতোয়া নদীতে। করতোয়ার জলে নেমে চলে উল্লাস। রিভারাইন পিপলের ‘করতোয়া সুরক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক রেজা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়।

করতোয়ার পাড়ে বালুর ওপর চলে দৌড় প্রতিযোগিতা। সেখান থেকে পঞ্চগড়ে নাশতা শেষ করে যাওয়া হয় পঞ্চগড়ে রকস মিউজিয়ামে। শুধু বাংলাদেশে নয়, এশিয়া মহাদেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘরে। সেখান থেকে কাজী অ্যান্ড কাজী চা সাম্রাজ্যে। ডাহুক নদীর বয়ে গেছে এর ভেতর দিয়ে। সেখানে জমে ওঠে এক পসলা আড্ডা। সেখানে গাছভর্তি আমলকী। অনেকে জোরে গাছ ঝাঁকুনি দিয়ে আমলকী কুড়িয়ে খায়। সেই সঙ্গে সবার মুখে একই গান- ‘আমলকী বনে দেখো/ বসন্ত এসে গেছে’।

সেখান থেকে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট যাওয়া হয়। এ পাশে বাংলাদেশ, ও পাশে ভারত। ভারতের ট্রাক আসছে। সোজা দুদিকে দুটি পতাকা উড়ছে। সবাই মিলে সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হচ্ছিল।

এর পরই যাওয়া হয় মহানন্দা নদীর পাড়ে। তেঁতুলিয়ায় গিয়ে রাজীব নদীতে নেমে ম্লান করছিল। তেঁতুলিয়ার পাড়ে যখন আমরা পৌঁছাই তখন গোধূলি। দারুণ এক উপভোগ্য সময় ছিল তখন। পাড়েই চোখে পড়লো কানাইডিঙ্গা নামের একটি গাছ। সবার ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশ থেকে দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার। এ আশা অপূর্ণ রেখেই ফিরতে হয় রংপুরে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে হয় সকালে, নয়তো বিকেলে। সূর্যের আলো ওই পাহাড়ের গায়ে পড়লে বর্ণিল হয়ে ওঠে। কিন্তু যে স্থান থেকে পাহাড় দেখা যায়, সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফেরার সময় পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের কাছে করতোয়া নদী। জোছনায় নদীর পাড়েই সবাই নেমে আরেক পসলা আড্ডা হয়, যদিও নদীতে কোনো পানি ছিল না।

দিনটির সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, এটা ঠিক। কিন্তু স্মৃতিতে তা উজ্জ্বলতর একটি দিন। আবারও আসুক এমন দিন। সেই অপেক্ষায়...।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও পরিচালক, রিভারাইন পিপল।
wadudtuhin@gmail.com