মানুষের আশার ভেলা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

মানুষের আশার ভেলা

শহীদ ইকবাল ৯:৪০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

print
মানুষের আশার ভেলা

প্রথমেই যেটি বলতে চাই, এখন তো মাত্র নতুন সরকার হলো, কিছু বলার সময় আসেনি। তাই আবার পুরনো চিন্তা। তা হলো আমরা দীর্ঘ কয়েক দশকে বাঙালির চিন্তা ও উন্নয়নের বিকাশ সম্পর্কটি একটু বুঝে নিই। বাহ্যিক জগতে এখন প্রচুর সম্প্রসারণ চোখে পড়ছে। আলো ঝলোমল ইলেকট্রিক বাতি, উঁচু উঁচু অট্টালিকা, প্রাইভেট সেক্টরের কর্মযোগী জনতা, করপোরেট প্রযুক্তির প্রসার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, শিক্ষালয়-বিদ্যানিকেতন অনেক কিছু আধুনিক আদলে গড়ে উঠেছে।

চোখ ধাঁধানো কর্মকাণ্ড ব্যাকুল করে তুলেছে সবকিছু। মানুষ এসব কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যস্তও হয়ে পড়ছে। ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’-মার্কা কর্মগতিতে মানুষ এখন গতিহারা, দিশেহারা। অনেক দূর পর্যন্ত রাস্তাঘাট হওয়ার কারণে দূরত্ব কমেছে। মোবাইল প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ এখন কাছের। ফলে, ‘ঘর হইতে আঙিনা বাহির’ প্রচল কথাবার্তা এখন ভুলতে বসেছে। প্রান্তিক পর্যন্ত, স্যাটেলাইটের প্রভাব চলছে। অর্থাগম এখন নানামাত্রিক। চোরাইপথে, সুদের ব্যবসায়, কালোবাজারিতে, মধ্যস্বত্ব পুঁজিতে কেউই তেমন পিছিয়ে নেই। রাজনৈতিক ব্যবসাদাররাও বহুমুখী কর্মে ব্যস্ত। এখন এই ব্যস্ততার কতটুকু উন্নতি-চিহ্ন, সত্যিকারের উন্নতির মাপকাঠিই বা কী-বোঝা দায়। আমাদের গার্মেন্টশিল্প বা প্রবাসীদের অর্থ জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি দিচ্ছে, আর্থিক সচ্ছলতাও দিচ্ছে। কিন্তু মানবসম্পদ বা উন্নয়ন রেখাটি কি তাতে সাফল্যের সূচক স্পর্শ করেছে! আমি শুধু এসব উন্নয়ন বৃত্তের ভেতরে থেকে মানুষ ও সমাজ-সংস্কৃতির অবস্থানটুকু চিনে নিতে চাই।
আমরা একসময় সামন্ত বা ফিউডাল সমাজে বাস করতাম। তখন, ‘বারো ঘর এক উঠোন’ ছিল। পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। লেনদেনের সঙ্গে, মন আর অন্তরের স্নেহার্দ্রতাটুকু বিযুক্ত ছিল না। একে অন্যের মর্যাদা রেখে সম্মান দিয়ে সমাজে চলাফেরা করত। মূল্যবোধের অনস্বীকার্য স্তরগুলো সবাই মেনে নিত। কিন্তু সেসব তো পুরনো কথা। আর সমাজ তো এক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে না। একই সামাজিক সম্পর্ক সর্বদা মানুষের মধ্যে বিরাজমানও হয় না। তাই একসময় সমাজ পাল্টে, সম্পর্কগুলো বদলায়। প্রয়োজনগুলোও নানা সূত্রে আটকায়। কিন্তু আমাদের সমাজের পাল্টানোর স্বরূপটা তো স্বাভাবিক থাকে না। স্বাভাবিকভাবে তা হয়ও না।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশে তার স্বরূপ একরকম, ফলে সেখানকার পুঁজির চলনগুলো একরকম। পরে পাকিস্তানি নতুন ঔপনিবেশ নামক জাঁতাকলে মানুষ যখন পিষ্ট, তখন পুঁজি আরেক রূপ ধারণ করেছিল। কারণ, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র সেখানে কখনো শোষক, কখনো শাসকের লেজুড়বৃত্তি করে। রাষ্ট্রীয় আবর্তে পুঁজি নানা রকম অসুস্থ ও বিকৃত শ্রেণি তৈরি করে। বাড়ন্ত মানুষকে দুমড়ে ফেলে। বিকৃতভাবে ব্যক্তিমানুষকে বাড়তে সহায়তা দেয়। ভেতরে ভেতরে অসুস্থ করে ফেলে। এক একটা বিকারের জন্ম দিয়ে মনুষ্যশক্তি নিরর্থক করে ফেলে। এ ধারাটা পাকিস্তানে চলে ব্যাপকভাবে এবং অসাধুরূপে-দুর্বৃত্তায়নের ভেতর দিয়ে। কারণ, এ অঞ্চলের ন্যায় ও প্রগতির আন্দোলন রুদ্ধ করার জন্য। পাকিস্তানি রাষ্ট্রশক্তির উদ্দেশ্যই ছিল তাদের এ দেশীয় চর সৃষ্টি করে সব ইতিবাচক ও ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দেওয়া।
ফলে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, নুরুল আমিন, মোনেম খানের মতো চরিত্র জনসমাজে গজিয়ে ওঠা সহজ হয়। কিন্তু স্মরণীয়, ঠিক এর বিপরীতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বটি তৈরি হয়। ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি তখনকার এ দেশীয় রাষ্ট্রীয় চরদের পছন্দ হয়নি। কারণ, তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের লেজুড়বৃত্তি করে স্বীয় ক্ষমতা, ব্যক্তিস্বার্থ, অর্থ ও পুঁজি করায়ত্ত করেছিল। এতে করে তাদের সামাজিক সুবিধা ভোগ করাও সহজ ছিল। তাদের আচরণের ভেতরেই দ্বিধান্বিত সংকট জোরালো থাকলেও নিজের কালিমালিপ্ত বিকারকে প্রাধান্য দিয়ে উর্দুভাষীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের সামাজিক অবস্থানটি পাকাপোক্ত করতে অসুবিধা হয়নি। এ ক্ষেত্রে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও প্রান্তিক জনতার মৌলিক দাবিও তাদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়। সেটা আমাদের দেশের আর্থসামাজিক পুঁজির পূর্বাপর যে আধা-সামন্ত কাঠামো তাতে আরও নতুন বিকার তৈরি করে। মধ্যস্বত্ব পুঁজিপতিদের প্রভাব তৈরি হয়। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করে অনেকেই রাতারাতি বড়লোক হয়ে যায়। ড্রয়িংরুমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরাম-আয়েশ আর ভোগবাদিতার পাশাপাশি দেয়ালে লটকাতে থাকে আব্রাহাম লিংকনের ‘গণতন্ত্র মার্কা’ ছবি। এভাবে ন্যক্কারজনকভাবে গলিত পচা-বাসি সংস্কৃতির অপচর্চায় ড্রয়িংরুম যখন আচ্ছন্ন তখন পূর্ব বাংলায় শহরকেন্দ্রিক আবেগচঞ্চল নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির শক্তি একতাবদ্ধ হয়। ভাষা আন্দোলনই শুধু নয়, মুসলিম লীগের বিপরীতে জয় ছিনিয়ে আনে এবং আরও একটু পরে ছয় দফায় এক হয়।
এরপরের ইতিহাস তো আরও স্পষ্ট। কিন্তু বুর্জোয়া যে চলটি শুরু হলো তা পরে অধিকার করে নিম্ন-মধ্যবিত্তের ভেতর থেকে প্রান্তিক মানুষের নেতৃত্বদানকারী একটি অংশ। যারা একাত্তরের পরে ওই একই অভিব্যক্তিতে উদ্ভাসিত হয়। বাংলাদেশের পুঁজির সম্প্রসারণ যথাযথ হয় না। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ চুর চুর করে ধসে পড়ে। পাকিস্তানি আমলে যে বুর্জোয়া পৃষ্ঠপোষকতা তারই এক ধরনের অসংস্কৃত বস্তাপচা গলিত সংস্করণ নির্মাণে এ দেশও পিছিয়ে থাকে না। এর সাংস্কৃতিক ভিত্তি যেমন দুর্বল তেমনি তার প্রতিক্রিয়াশীল রূপটাও প্রকট। সেখানে দুষ্ট রাজনীতি আর নীতিহীনতার সংস্কৃতিই তৈরি হয়। ফলে স্বাধীনতার পরে স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার জন্য খুব বেশি সময় নিতে হয়নি। যে বাংলা ভাষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রাণ দেয় তখন এ দেশেরই কিছু সন্তান পুঁজির লেজুড়বৃত্তি করে ব্যক্তিস্বার্থের ধারা এগিয়ে নেওয়ার জন্য শাসকের সম্পৃক্ততায় নিবিষ্ট থাকে। তারাই পাকিস্তানি চরদের মতো একইরূপে আবির্ভূত হয়, এই স্বাধীন বাংলাদেশেও। এরাই পরবর্তীতে কেউ ধর্মভিত্তিক দল গড়ে, কেউবা তথাকথিত বামপন্থার নামে নিজেদের ভাগ্য গোছানোয় প্রবৃত্ত হয়। এসব কথাগুলো মোটা দাগের মনে হলেও ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবমাননাকর সংস্কৃতির বর্তমান রূপটিও একই ধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফুলেফেঁপে ওঠা রূপটুকু কি এখন আমাদের নজরে আসে না!
এটা অসত্য নয়, দুর্নীতির আগ্রাসী রূপ এখন অহমিকার অধিকারী রূপ ধারণ করেছে। এ বিপুল আগ্রাসনে নৈতিক চরিত্র ও জীবনের সততার ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। কিন্তু এর সমাধান দেখা যাচ্ছে না। শাস্তির বিধানের প্রয়োগ একেবারেই নেই। ভোগবাদকে উসকে দিচ্ছে, উচ্চাকাক্সক্ষী প্রবণতা প্রবল। করপোরাল পুঁজি দুর্বৃত্ত-পুঁজিকে পাওয়ার সব ফাঁদ পেতে রেখেছে।
প্রান্তিক মানুষ অসুখকে জয় করে প্রাণান্ত পরিশ্রম করে। সারল্য তাদের প্রাণ। কর্ম তাদের নেশা। হরতাল-অবরোধ আর অনাস্থার রাজনীতি তাদের টলাতে পারে না। কর্মময় প্রাণ নিয়েই তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে। অশ্রদ্ধা করে রাজনীতিবিদদের স্পর্শ থেকে দূরে থাকে। পরিবারে, সমাজে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেখে তা নির্বিচারে মেনে নিয়েই কাজে যোগ দেয়। কারণ, কাজ ছাড়া বাঁচার বিকল্প তাদের সম্মুখে কিছু নেই। এটি প্রকৃতপক্ষে কাজে লাগাতে পারলে অনেক কিছু দ্রুত ঘটার সুযোগ ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। প্রান্তিক এসব মানুষ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। বিদেশের মাটিতে প্রাণান্ত পরিশ্রম করছে এ দেশের মানুষ। তাদের স্বোপার্জিত অর্থ এ দেশের অপর চালিকা জোগান। এ ছাড়া আমরা সবাই গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির কথা জানি। প্রাইভেটাইজেশন ঘটেছে যে মাত্রায়, সেখানে এখনো নিম্ন-মধ্যবিত্ত সেক্টর তেমন অকার্যকর হয়নি। মধ্যবিত্ত পর্যায়ে তাদের সামাজিক মর্যাদা উঠে আসছে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের পর্যাপ্ততা আকর্ষণীয়। নিঃসন্দেহে তা আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে এটিই বড় আশার সংবাদ। ‘জনসংখ্যাই জনসম্পদ’নাম্নী যে টার্মটি নিয়ে কথা হচ্ছে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তা সফলতার মুখ দেখতে পারে এ দেশের শিক্ষিত মেয়েদের কল্যাণে, তাদের অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতার কারণে। এটি একটি অগ্রবর্তী খাত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠন-পাঠনে মেয়েরা ব্যাপকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফল আগামী দশকেই লক্ষণীয় হবে।
কিন্তু সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর মান ও কল্যাণ তো শুধু কিছু মানুষের কর্মস্থান বা চাকরি পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। সামষ্টিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান ও দেশাত্ম চেতনার ওপর তা অনেকটাই নির্ভরশীল। সেটি মৌলিক বিষয়। তা ব্যক্তিমানুষের ভেতরে প্রভাবিত হচ্ছে কম, চর্চাও কম। বর্তমান বাজারে দেশপ্রেম কথাটা রসিকতার পর্যায়ে গণ্য হয়ে চলছে। আর এটি নিয়ে যে হারে পড়াশোনা বাড়ছে, সে হারে মানুষের ভেতরে সঞ্চারিত হচ্ছে না। ব্যক্তিস্বার্থই প্রধান হয়ে উঠছে।
ব্যক্তিবিচ্ছিন্নতা বা পরিবারে যে অসহায়ত্বের কথা গোড়াতেই বলেছি, সে কারণে আমাদের দেশপ্রেম ভাবনা, নীতির প্রশ্ন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বরঞ্চ বিপরীতে ধর্মান্ধতা বাড়ছে। যুক্তি পরিষ্কার না হওয়ায় একদিকে ভোগবাদের প্রবণতা যেমন বাড়ছে তেমনি ধর্মান্ধতার বেড়াজাল থেকেও তার মুক্তি ঘটছে না। এর ফলে যে বৃত্তটি সমাজে চোখে পড়ছে, তাতে ক্ষমতাই মুখ্য। মূল্যবোধ নেই। অসাম্য পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। বিচ্ছেদ বাড়ছে। দেশপ্রেম কমছে। তাহলে সমীকরণটি কী দাঁড়ায়! সাংস্কৃতিক ক্ষয় ও বিনাশ যে মানুষের ভেতরে রচিত হচ্ছে, সে বাইরের দিকে অনেক কিছু দেখছে, পাওয়ার আশাও বাড়ছে। কিন্তু ভেতরে শান্তি পরাহত। ফলে, সন্ত্রাস-ফ্রাস্ট্রেশন-হীনমন্যতা বাড়ছে। এই জায়গা থেকে আমাদের উঠে আসা জরুরি। এ জন্য সর্বস্তরের সদিচ্ছা প্রয়োজন। এ সদিচ্ছাটা নীতি এবং মূল্যবোধের-যা এক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক শক্তিতে পর্যবসিত হতে পারে। এই শক্তিই আমাদের সম্মুখে টেনে নিতে পারে। পেছনের টানটুকু আরও পেছনে সরিয়ে পজেটিভ দ্বিধাটুকু সম্মুখের দিকে নিতে পারে। এ জন্য সবার আগে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, দক্ষ নেতৃত্বই পারে সবকিছু সহজ করে তুলতে। বর্তমান নতুন সরকার সেই সহজ কাজটি করতে সামর্থ্য হবে কি! পারবে কি স্বাভাবিকভাবে সবকিছু পরিচালিত করতে? এখন পর্যন্ত দেশবাসী আশাবাদী, যে আশাটা গত ১০ বছরে এগিয়েছে এবার তা আরও নতুন দিগন্ত যেন পায়।

শহীদ ইকবাল : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
shiqbal70@gmail.com