বিষয়গুলো অতি-অপ্রাসঙ্গিক

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ | ৫ মাঘ ১৪২৫

বিষয়গুলো অতি-অপ্রাসঙ্গিক

উমর ফারুক ৯:২৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

print
বিষয়গুলো অতি-অপ্রাসঙ্গিক

১৯৯০ সাল। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পাড়াগাঁয়ের ছেলে। নাকে সর্দি, গায়ে ধুলো। দেশ-রাজনীতি-ভোট এগুলো বুঝি না। বুঝবার কথাও নয়। দুপুরের পর স্কুলের মাঠে খেলতে গেলাম। স্কুলের একজন শিক্ষক ডেকে ৬টা টিপসই নিলেন। ছোট আঙুল। টিপসই ভালো হচ্ছে না। স্যার ডানে-বামে কয়েকবার ঘুরিয়ে আঙুলের ছাপটাকে বড় করলেন। বয়স হওয়ার পর বুঝেছি ওটা ছিল ভোট। ৯ বছর বয়সে আমি ৬টা ভোট দিলাম। ‘হ্যাঁ’, নাকি ‘না’ কে জিতেছিল মনে নেই। তার দুই বছর পর আমি বাড়ি ছাড়ি। মানে মাকে ছাড়ি। ঢাকায় ভর্তি হই। মা তখন খুব দুশ্চিন্তা করতেন। প্রতিবার বিদায়বেলায় কাঁদতেন। বলতেন, ‘ঠিকমতো খাস। বাইরে বেরোস না। দেশের অবস্থা কিন্তু ভালো না।’

তার ১১ বছর পর, অর্থাৎ ২০০১ সালে আমি ঢাকা ছাড়লাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তখন থমথমে। পুরো ভূখণ্ডজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের রাজত্ব। মুঠোফোন তখন কেবল কারও কারও হাতে পৌঁছায় পৌঁছায় অবস্থা। মা তখন সবসময় খুব আতঙ্কে থাকতেন। কী হয়! কী হয়! আমি সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্র। হলে উঠতেই এক রাতে চাঁদা চাইলো। ওরা অবশ্য ওটাকে চাঁদা বলে ডাকতো না। অন্য নামে ডাকতো। চাঁদা দিইনি, হল ছেড়ে দিই। বাকি জীবনটা মেসেই কেটেছিল। একটা পত্রিকার কাজ করতাম। এখনো করি। গুনগুন। হুমকি দিয়ে সেটাও বন্ধ করে দেয়। আমার এক পত্রিকার সহকর্মীকে মেরে পা ভেঙে দেয়। সবকিছু বন্ধ হলো, কিন্তু মায়ের দুশ্চিন্তা বন্ধ হলো না। সেই পুরনো বাক্য-‘বাবা রুমে থেকো, রাজনীতি কোরো না।’

তারও ৯ বছর পর, অর্থাৎ ২০১০ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলাম। তখন দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায়। আমরা তখন কেবল বুক ভরে শ্বাস নিতে শিখছি। সীমাহীন প্রত্যাশায় বুক পাততে শিখছি। সুখবরের জন্য কান পাততে শিখছি। ভালো সময়গুলো তখন কেবল কাছে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু খারাপ সময়গুলো পিছু ছাড়লো না। না আমার, না দেশের। আজ আমার বয়স ৩৭। আজও সন্ধ্যা হলেই মা ফোন দেয়, ‘বাবা কই? রাতে বাইরে থেকো না। বাসায় যাও। লেখালেখির বেশি দরকার নেই। রেডিও, টিভিতে তোমার অত কথার কী দরকার? দেশের অবস্থা ভালো না।’ মায়ের কথায় মনটা বিষণ্ন হয়। সত্যিই কী দেশটা আজও ’৯০-এ দাঁড়িয়ে আছে? নাকি ’৬৯-এ? মা আজও বলে, বাবা দেশটা ভালো নেই, সাবধানে থেকো। নাকি মিথ্যা বলে? নাকি দেশটা সত্যি সত্যি মিথ্যার ওপর বড় হচ্ছে? আর কত দিন পর দেশের অবস্থা ভালো হবে?

রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক পরিবার। সময়ের স্রোতে আজ আমি একটি কন্যাসন্তানের জনক। কন্যা বড় হয়, আমার ভয়ও বড় হয়। দেশপ্রেমের জটিল ধারাপাতের সব পৃষ্ঠা আমি বুঝি না। আমি শুধু বুঝি দেশ মানে একখণ্ড স্বপ্ন, এক টুকরো আবেগ ও একজন মহানায়ক। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি আমার মুক্তচিন্তার জন্ম দিতে চেয়েছিলেন। দেশ মানে মুক্তিযুদ্ধ, দেশ মানে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা। মেয়েটার বয়স এখন চার। আরও অল্প বয়স থেকে ও বঙ্গবন্ধুকে চিনে বড় হচ্ছে, পতাকা ও মানচিত্র চিনে বড় হচ্ছে। আর একটু বড় হলে হয়তো ক্ষুদিরামকে চিনতে শিখবে। সোহেল তাজ ও সৈয়দ আশরাফকে চিনতে শিখবে। সত্যিকারের মানুষ চিনতে শিখবে। আমার বিশ্বাস, পরিবার ঠিকটা চিনলে, রাষ্ট্রও ঠিকটা চিনবে। তার মানে তো এটাও, পরিবার আতঙ্কে থাকলে রাষ্ট্রও আতঙ্কে থাকবে। তবে কী রাষ্ট্রও আতঙ্কগ্রস্ত?

সেদিন এক আলোকচিত্র শিল্পী জেল থেকে বেরোলেন। খবরটা আমার একজন ফেসবুক বন্ধু, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম একটু অন্যরকমভাবে প্রকাশ করলেন। তিনি বরাবরই তাই করেন। তার ফেসবুকে লিখলেন, ‘অপেক্ষাকৃত বড় কারাগারে আপনাকে স্বাগতম।’ হাসনাত ভাই কী বুঝিয়েছিলেন, আমি জানি না। বোধহয় ভুল বলেছিলেন হাসনাত ভাই। ধুর, দেশ কখনো কারাগার হয় নাকি? নাকি উনি সত্যি বলেছিলেন? জানি না। আমার শিক্ষকতার জীবন প্রায় ১০ বছরের। প্রতিদিন আমি ওখানে স্বপ্ন বুনি। ওরা যখন সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলো ধরে প্রশ্ন করে, আমি বোকা বনে যাই। বলি সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার পরক্ষণে ভাবি, মিথ্যা বললাম ওদের? ঠকালাম? ভাবি, এই বুঝি আমাদের গালভরা দেশ! তখন অবাক কই, হতবাক হই, হতবিহ্বল হই, লজ্জিত হই, শঙ্কিত হই। মায়ের সেই শঙ্কাটা এখন আমার ওপর ভর করেছে! আজ যে আমি বাবা, বোধহয় সেজন্য।

একটি গল্প বলি। এটিও অপ্রাসঙ্গিক। একটি ফুটফুটে কন্যা। ওদের ঘরের চালে মস্ত বড় ফুটো। তবুও সে ওর বাবার কাছে রাজকন্যা। এক দিন এক সত্যিকারের রাজপুত্র তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলো। বিয়ে করে ঘরে তুললো। রাজপরিবার-সংসারে কোনো অভাব থাকবার কথা নয়। গা-ভর্তি গহনা। ঘরভর্তি প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র। না চাইতেই সব। শাড়ি, গাড়ি, বাড়ি-সব। কিন্তু মেয়েটির জন্য ছোট্ট একটি শর্ত। কণ্ঠনালীকে শান্ত রাখতে হবে, কোনো কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা যাবে না। করলেই গারদবাস। মেয়েটা মেনে নিলো। মুখ বুজে প্রতিবাদহীন সুখ উপভোগ করতে লাগলো। এটাই ওর ভালো থাকা। এটাই ওর উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধি।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার করেছে দেশ। দেশ এখন স্পষ্ট দুই শ্রেণিতে বিভক্ত-শাসক ও শোষক। স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ। উন্নয়ন ও দুর্নীতি। গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র ও স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে একটি প্রশ্ন, কতটা এগুলো দেশ? কোন পথে আমরা? আর কতটা পথ হাঁটলে আমার সত্যিকারের উন্নত হয়ে উঠব? আর কতটা পথ হাঁটলে আমরা মুক্ত গণতন্ত্রের দেখা পাব? আর কতটা পথ হাঁটলে গণমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে? আর কতটা পথ হাঁটলে আমার বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হবে? আর কতটা পথ হাঁটলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তচিন্তার বাংলাদেশ বিনির্মিত হবে? আর কত দিন আমাদের দুশ্চিন্তার পথরেখাটা বহমান থাকবে?
পুনশ্চ : ওপরের প্রতিটি বিষয় ও প্রশ্ন অতি-অপ্রাসঙ্গিক।

উমর ফারুক : শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
faruque1712@gmail.com