আত্মহত্যা রোধে শিক্ষায়তনের ভূমিকা

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

আত্মহত্যা রোধে শিক্ষায়তনের ভূমিকা

জ্যোতির্ময় নন্দী ৯:৪১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

print
আত্মহত্যা রোধে শিক্ষায়তনের ভূমিকা

পত্রিকার পাতায় কিংবা বেতার-টিভির খবরে আমরা প্রায়ই পাই কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার খবর। প্রেমে ব্যর্থতা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা খারাপ ফলাফল, বখাটেদের অত্যাচার, অথবা নিছকই গভীর অবসাদে ভোগার কারণে অসংখ্য কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী আত্মহত্যা করে থাকে, শুধু আমাদের দেশে নয়, কম-বেশি বিশ্বের সব দেশে।

আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের (এএফএসপি) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ‘যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর-মৃত্যুর একটা বড় কারণ হলো আত্মহত্যা এবং এটা এ দেশের জাতীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটা বড় উদ্বেগের কারণ।’

এ প্রবণতা ঠেকানোর জন্য প্রতিবেদনটিতে সুপারিশ করে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু কিশোর-কিশোরীরা তাদের বেশিরভাগ সময় বিদ্যালয়ে কাটায়, তাই বিদ্যালয়ভিত্তিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচির কার্যকারিতা আত্মহত্যার বিষয়ে কিশোরদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে এবং এ প্রবণতা প্রতিরোধ করতে সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে।’

কিশোর আত্মহত্যার ব্যাপারে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো পরিসংখ্যান আছে কিনা জানা নেই। তবে নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, সংখ্যাটা খুব ছোট হবে না। প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক বা সামাজিক অত্যাচার, ইভটিজিং প্রভৃতি কারণে দেশের এখানে-ওখানে কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার খবর তো বছরভরই পাওয়া যায়। আর স্কুল-কলেজের পরীক্ষার ফলাফল বেরুনোর পর তো কিশোর আত্মহত্যা পাইকারি হারে দাঁড়ায় বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার বিরাট একটা অংশ তাদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো সহপাঠীর সঙ্গে প্রেমে প্রতারিত হওয়া, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা খারাপ ফলাফল করা, শিক্ষাগত কোনো অপারগতা বা অক্ষমতার জন্য বা অন্য কোনো কারণে শিক্ষকের হাতে নির্যাতিত বা অপমানিত হওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে বা বাইরে বা আসা-যাওয়ার পথে ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়া প্রভৃতি আপাততুচ্ছ অনেক কারণে এ দেশে প্রতিবছর অসংখ্য কিশোর-কিশোরীকে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাবা-মা অপমানিত হওয়ায় এক ছাত্রীর আত্মহত্যার এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটে গেল গত ৩ ডিসেম্বর খোদ রাজধানীতেই। ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, রাজধানীর এক স্বনামধন্য স্কুলে শ্রেণি পরীক্ষা চলাকালে সঙ্গে মোবাইল ফোন রাখায় এক ছাত্রীকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরদিন মেয়েটির বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে এনে তাদের যৎপরনাস্তি অপমান করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের কাছে তারা করজোরে ক্ষমা চেয়েও ক্ষমা তো পাননি, বরং তাদের পরদিন স্কুলে এসে ছাত্রীটির টিসি নিয়ে যেতে বলা হয়। নিজের চোখের সামনেই বাবা-মায়ের এ অপমান, হেনস্তা মেয়েটা সহ্য করতে পারেনি। ঘটনার পর বাসায় ফিরে বিনাবাক্যব্যয়ে মেয়েটি নিজের ওড়নার ফাঁস গলায় লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনকে আমরা নিশ্চয় সমর্থন করব না। কিন্তু সেটা ঠেকাতে গিয়ে লঘুপাপে গুরুদণ্ড যেন না হয়, সেটা যেন একটি কোমল প্রাণকে ব্যথিত না করে, তার চোখের সামনেই তার সবচেয়ে সম্মানের, সবচেয়ে আদরের মানুষগুলোর মানমর্যাদা ধুলোয় লুটিয়ে না পড়ে, দণ্ডবিধানের সময় দণ্ডদাতাদের সেটা নিশ্চয় মনে রাখা উচিত ছিল। ঘটনাটির পর মেয়েটি যদি তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকাদের ওপর সব শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার এমনকি নিজের জীবনের ওপরেই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে, তা হলে তাকে নিশ্চয় দোষ দেওয়া যায় না। কারণ কিশোর-কিশোরীরা সাধারণত এমন স্পর্শকাতর চরিত্রেরই হয়ে থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশু-কিশোরদের জীবনের সিংহভাগ জুড়ে থাকে। তাদের চরিত্র ও প্রবণতা নির্ধারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অধিকাংশের শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্বের ওপর উপযুক্ত পড়াশোনা বা ধ্যানধারণা নেই। স্কুলের পাঠক্রমেও শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্বের বা মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলত যা হওয়ার তাই হয়ে থাকে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে ঝরে যায় অনেক কচি-কোমল প্রাণ।

একটা বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে, বর্তমান সময়ে আমাদের সন্তানরা খুবই প্রতিকূল, যান্ত্রিক, অবরুদ্ধ একটি পরিবেশ-প্রতিবেশের মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি এমনিতেই তাদের অবসাদগ্রস্ত, অসামাজিক, সমাজবিরোধী, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার নিয়ত প্রণোদনা জোগায় এবং একপর্যায়ে আকস্মিক বা ধীরলয়ে আত্মহননের দিকে এগিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে তাদের পরিবার বা শিক্ষায়তন যেন এমন কোনো নেতিবাচক বা বৈরী আচরণ না করে, যা এ প্রণোদনার পেছনে আরও ইন্ধন জোগাবে।

জ্যোতির্ময় নন্দী : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
jtmnandy@gmail.com