বাংলাদেশে বিতর্ক চর্চা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বাংলাদেশে বিতর্ক চর্চা

তৌফিকুল ইসলাম ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৮

print
বাংলাদেশে বিতর্ক চর্চা

বিতর্ক সভ্যতার বিকাশের অন্যতম সোপান। মানবীয় উৎকর্ষতার এ যুগে যুক্তিবাদী মানস গঠনে বিতর্ক এখনো ভূমিকা রেখে চলেছে। যদিও সম্প্রতি এক শ্রেণির চিন্তাবিদের মাঝে বিতর্কের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত দেখা দিয়েছে, কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বিতর্ক চর্চার আবশ্যিকতা ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিতর্ক চর্চা শুরু হয় ১৯৫৩ সালে নটরডেম ডিবেটিং ক্লাবের মাধ্যমে। অবশ্য তারও আগে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বিতর্ক চর্চা যাত্রা করেছিল। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি। যা  বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের প্রথম বিতর্ক সংগঠন।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিতর্ক চর্চার বাইরে সাংগঠনিক বলয়ে বিতর্ক চর্চা শুরু হয় নব্বই দশকের শুরুর দিকে। তখন বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন নামে বিতর্কের একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও মতের অমিলের ফলে দেশে জন্ম নেয় আরও কিছু বিতর্ক সংগঠন।
বর্তমানে ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি), ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি, ডিবেট ফর হিউম্যানিটিসহ আরও বেশ কিছু বিতর্ক সংগঠন জাতীয় পর্যায়ে কাজ করছে। ইংরেজি বিতর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ডিবেটিং কাউন্সিল (বিডিসি)।
স্কুল-কলেজ থেকেই বিতর্ক চর্চা শুরু হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে অনেক বিতার্কিকেরই হাতেখড়ি হয়। কথায় আঞ্চলিকতার টান ও জড়তাকে দূর করে দুর্দান্ত এক বক্তা হিসেবে তৈরি হয় নিয়মিত বিতর্ক করা শিক্ষার্থীটি।
সেদিন কথা হচ্ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (ডিইউডিএস) সভাপতি অনুজ রাকিব সিরাজী ও সাধারণ সম্পাদক আসাদের সঙ্গে। আগামী ৩০ নভেম্বর ডিউইডিএস তাদের প্রতিষ্ঠার তিন যুগ পালন করবে। আগেই বলেছি, এ সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের পুরোধা বিতর্ক সংগঠন। এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি দেশের সবচেয়ে বড় বিতর্কের প্ল্যাটফর্ম, এতে কোনো দ্বিমত নেই।
কারণ, ১৮টি হল ডিবেটিং ক্লাবসহ পঞ্চাশোর্ধ ডিপার্টমেন্টভিত্তিক ক্লাব নিয়ে ডিইউডিএস তার নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে। সাপ্তাহিক সেশনে বাংলা, ইংরেজি বিতর্ক নিয়ে যেমন আয়োজন থাকে তেমনি বারোয়ারী বিতর্ক, রম্য বিতর্ক ও আঞ্চলিক বিতর্কের আয়োজনও হয়। বিশেষ দিবসে আয়োজিত হয় প্ল্যানচেট বিতর্ক, যেখানে মৃত ব্যক্তিদের আত্মাকে মর্ত্যলোকে নামিয়ে নিয়ে আসা হয়। এ ছাড়া বিতর্ক উৎসবে জুটি বিতর্ক, স্রষ্টা-সৃষ্টি বিতর্কসহ নানা ফরম্যাটের বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ডিউইডিএস এক ঐতিহাসিক আয়োজন করে। টিএসসির পায়রা চত্বরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন জনসমুদ্রের ঢেউয়ে সেদিন অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের প্রীতি বিতর্ক। যা দুই বাংলার বিতার্কিকদের মাঝে এক অপূর্ব বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে।
এখনো ডিইউডিএস দেশের সর্ববৃহৎ বিতর্ক আয়োজন করে থাকে। শুধু তাই নয়, জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতাগুলোতেও ডিইউডিএস তার সাফল্য অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
এদিকে বর্তমানে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বাংলা ও ইংরেজি উভয় বিতর্কেই সব্যসাচী বিতার্কিক দেখা যাচ্ছে, যা খুবই ইতিবাচক। তা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের বিতার্কিকরা আরবি ভাষায়ও বিতর্ক চর্চা করে থাকে। গত বছর তারা কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
এখন দেশে প্রচুর বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। এভাবে সারা বছর বিতর্কের সঙ্গে থেকে বিতার্কিকরা যেমন জ্ঞান চর্চার দিক থেকে পরিশীলিত হচ্ছে ঠিক তেমনি অনেক ক্ষেত্রে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার আভিজাত্য বোধও চলে আসছে।
এ ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠানের ডিবেটিং ক্লাবের ধারাবাহিক  সাফল্য বজায় থাকার রেকর্ড আছে, তারা যে কোনো বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নিজেদের জয়লাভকেই একমাত্র বাস্তবতা হিসেবে আগাম ধরে নেয়। যার ফলে কখনো এর ব্যত্যয় ঘটলে                  বিতর্কের বিচারকদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে মাঝেমধ্যেই ফেসবুকে ঝড় ওঠে।
বিতর্কের অনেক বড় একটি প্রাপ্তি হচ্ছে নেতৃত্বের বিকাশ। যা খুব স্বাভাবিকভাবেই বিতার্কিকদের মাঝে তৈরি হয়। তবে এ নেতৃত্ব নিয়ে যে দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং দেখা দেয়, তা খুবই দুঃখজনক। বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার প্রত্যাশায় যেভাবে মহাপরিকল্পনা করা হয়, সেটি বাদ দিয়ে বিতর্ক নিয়ে মনোযোগী হলেই তাতে পুরো বিতর্ক অঙ্গনের আরও বিকাশ ঘটত বলে আশা করা যায়।
বিতার্কিকদের মাঝে আরেকটি বিষয় লক্ষ করা যায়, সেটি হচ্ছে সবজান্তা মনোভাব। যে কোনো কিছুতেই হামবড়া ভাব দেখানো আর পরমতসহিষ্ণুতার ভিত্তিতে অন্যের গ্রহণযোগ্য যুক্তিকে মেনে নেওয়ার মতো স্বচ্ছ মানসিকতা অনেক বিতার্কিকেরই থাকে না।
তা ছাড়া বিতার্কিকদের কাছ থেকে সুন্দর উপস্থাপনে বাংলা ভাষা এখন খুব কম শোনা যায়। বাংলা বিতর্কে ইংরেজি শব্দচয়ন নিষিদ্ধ থাকলেও এখন হরহামেশাই বাংলা বিতর্কে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হচ্ছে। আর প্রমিত বাংলায় কথা বলার চর্চাটিও এখন অনেক বিতার্কিক করে না।
বিতার্কিকরা এখন পড়াশোনা করে না, এ অভিযোগ অনেকদিন ধরেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিতার্কিকরা টপিক পাওয়ার পর সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জয়ী হওয়ার কৌশল শিখে নেয়, তারপর গুগলে সার্চ দিয়ে সামান্য একটু সময় পড়াশোনা করে বিতর্কে অংশ নেয়। কিন্তু নিয়মিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে বিতার্কিকদের আগ্রহের ঘাটতি খুব হতাশাব্যঞ্জক। কারণ, জ্ঞাননির্ভর বিতর্ক চর্চা যেমন শ্রুতিমধুর হয় তেমনি অনেক আশার জন্ম দেয়। কিন্তু তার বদলে অন্তঃসারশূন্য বিতর্ক আমাদের হতাশ করে।
এমন কিছু অভিযোগের পরও আমরা বিতর্ক চাই। কারণ, সভ্যতার জন্যই বিতর্ক দরকার। বিতর্ককে বাদ দিয়ে আমরা সভ্য সমাজ চিন্তাও করতে পারব না। তাই বিতর্ক চর্চা নিয়মিত বজায় থাকুক এবং বিতার্কিকরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সঙ্গে নিয়মিত জ্ঞানচর্চা করুক, একজন সাবেক বিতার্কিক হিসেবে আমি সেটিই প্রত্যাশা করি। বিশেষ করে বর্তমান দ্বিধাবিভক্ত সমাজে বিতর্ক চর্চা খুব বেশি প্রয়োজন।

তৌফিকুল ইসলাম : সাংবাদিক।
toufikdu1921@gmail.com