ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
দল আছে নেতা নেই!
চিররঞ্জন সরকার
Published : 2018-05-17 18:55:00
দল আছে নেতা নেই!

আগামীকাল যদি শেখ হাসিনা তার দলের নাম পাল্টে বিএনপি রাখেন এবং তথাকথিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ নামে বিএনপি স্টাইলে রাজনীতি চর্চা শুরু করেন, তাহলে কি বিএনপি তাকে সমর্থন করবে? না, করবে না।

কারণ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিশ্বাস অথবা অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হলো কি না সেটা তার বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে কোনো মাপকাঠি নয়। বিএনপির কট্টর নেতাকর্মী-সমর্থকদের একান্ত বিরোধিতার লক্ষ্য হলেন ব্যক্তি শেখ হাসিনা। অতএব তিনি তার দলের নাম যা-ই রাখুন, রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই গ্রহণ করুন, তাতে কিছু যায় আসে না। বিএনপির একাগ্র মনোবাসনা হলো যেনতেনপ্রকারেণ শেখ হাসিনা যেন পরাজিত হন, অপমানিত হন এবং রাজনৈতিকভাবে হেনস্তার শিকার হন।
আগামীকাল যদি শেখ হাসিনা তার দলের নাম পাল্টে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ রাখেন এবং জামায়াতি ফরমেটে কথা বলতে শুরু করেন, তাহলে কি জামায়াতে ইসলামী সব প্রতিবাদ ভুলে তাকেই সমর্থন করতে শুরু করবে? না, করবে না। কারণ এক্ষেত্রে কারণ সেই একই। শেখ হাসিনা নামক একটি ব্যক্তিগত রাজনীতির বিরুদ্ধে জামায়াতের রোষ। জামায়াত সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা আলোচনা আড্ডায় শেখ হাসিনাকেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন, তার সুপার ইম্পোজ করা ছবি শেয়ার করেন, তার প্রতি শ্লেষ ব্যক্ত করার জন্য নানা নেতিবাচক অভিধায় অভিহিত করেন। এসব থেকে যেটা বার্তা পাওয়া যায়, সেটি হলো একটি আত্মবিশ্বাসহীন মনোভাবÑআমাদের রাজনীতি জনসমর্থন আদায়ের পক্ষে যথেষ্ট হচ্ছে না, তাই তার সঙ্গে প্রতিপক্ষনেত্রীকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা, তার বিকৃত ছবি শেয়ার করাও দরকার হচ্ছে। এটা আদতে নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকেই কমজোর বলে প্রমাণ করা। রাজনীতি পর্যাপ্ত নয় বলেই তো ব্যক্তিগত আক্রমণও প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থাৎ আমাদের রাজনীতিতে শাসক আসলে কোনো দল নয়। একজন ব্যক্তি। বিরোধীদের আক্রমণের, ঘৃণার লক্ষ্য কোনো শাসক দল নয়। নিছক একজন ইন্ডিভিজুয়াল। বিএনপি, জামায়াত, ড. কামাল-ডা. বদরুদ্দোজার দলগুলোর লড়াই একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা ভালো অথবা খারাপ সেটি আজকের আলোচনার মূল বিষয় নয়। আলোচ্য যেটা সেটা হলো এই যে একজন ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা। অর্থাৎ তাকে ঘিরে একটি গোটা দেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে, একজন ব্যক্তির জয় পরাজয় দেশের চর্চায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগকে যারা জেতাতে চান তারা কোনো দলকে ভোট দেন না। তারা আদতে শেখ হাসিনাকে জয়ী দেখতে চান। আওয়ামী লীগকে যারা হারাতে চান তারা আসলে শেখ হাসিনাকে পরাজিত দেখতে চান। দেশের রাজনীতির ভরকেন্দ্র হিসেবে এভাবে মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে রাখা কীভাবে সম্ভব হয়ে উঠল এটা প্রশ্ন নয়। সেই আলোচনা অনেক হয়েছে। প্রচুর চর্চাও হয়েছে। পক্ষে বিপক্ষে হাজারো যুক্তিসহ। শেখ হাসিনাকে সমর্থন করা উচিত নাকি বিরোধিতা করা সঙ্গত সেটাও এখানে আলোচ্য নয়। ওটা যার যার গণতান্ত্রিক অধিকার ও বুদ্ধিবিবেচনা দিয়েই বিচার করা কাম্য।
আমাদের নতুন প্রশ্ন হলো, এরকম আর কোনো নেতানেত্রী, যে কোনো দলেরই হোক, উঠে আসছেন না কেন? চারদিকে এত আধুনিকতা, এত ঝকঝকে প্রচারের ব্যবস্থা, এত সুযোগ, এত সমস্যা। তবুও দেশে আমরা শেখ হাসিনার মতো আর কোনো উজ্জ্বল একক শক্তিশালী চরিত্রকে দেখতে পাচ্ছি না আর! কেন? কেন বিএনপি সমর্থকদের কাছে খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো হাই-প্রোফাইল নেতা নেই? কেন বিএনপির সমর্থকরা বিএনপি নামক দলকে সমর্থন করছেন? কোনো প্রভাবশালী লিডারের জন্ম হচ্ছে না কেন? এমনকি আওয়ামী লীগেও শেখ হাসিনার পর আর কেউ নেই। যুক্তি দেওয়া হতে পারে এটা তো অন্য দলগুলোর শক্তি, যে তারা দল হিসেবেই লড়াই করছে, একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে নয়! কিন্তু তাহলে শেখ হাসিনার দরকার হচ্ছে কেন? কেন যেকোনো নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করা হয় না আওয়ামী লীগের? আবার বিএনপির এক্ষেত্রেও ‘জিয়া’ নামক পদবির দরকার হচ্ছে কেন? কেন এখনো তারেক রহমানকেই দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়? কেন তারেক রহমানের স্ত্রী জোবায়দা রহমানকে বিকল্প নেতৃত্ব ভাবা হয়? কেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিংবা আদুল্লাহ আল নোমানদের ভাবা হয় না? অন্য যে কোনো কাউকেই তো প্রজেক্ট করা যায়? তা তো হচ্ছে না! তার মানে সব দলই মনে মনে জানে একজন নায়ক অথবা নায়িকার দরকার দলের চালিকাশক্তি হিসেবে। আমাদের রাজনীতিতে স্বাধীনতার আগে থেকেই বহু নায়ক-নায়িকার আবির্ভাব ঘটেছে। অথচ বর্তমানে বহু বছর হয়ে গেল কোনো একক ক্যারিশমার চরিত্র আসছে না। যাকে পছন্দ অথবা অপছন্দ যাই করি, প্রভাবটাকে অস্বীকার করতে পারি না। সেরকম কোনো উচ্চতার, মাপের লিডার কেন পাচ্ছি না? একক চরিত্র সেই একজনই। সেই ১৯৮২ সাল থেকে শেখ হাসিনাই দলের অবিকল্প নেত্রী। তিনি এখন সত্তরোর্ধ্ব! তার প্রতিপক্ষেও একইরকম অথবা অন্তত কিছুটা একক জনপ্রিয় নায়ক বা নায়িকা নেই।
এর সামাজিক কারণটি কী? শুধু রাজনীতির আঙিনায় নয়। সাহিত্য, সঙ্গীত, সিনেমা কোথাও কোনো আইকনের জন্ম হচ্ছে না। যাকে নিয়ে গোটা সমাজ আলোচনা করতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো বাঙালি একক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আর কিছু করার সাহস পায় না। আমরা নিজেরাই বিশ্বাস করি না যে এককভাবে আমি অনেক কিছু করতে পারি। একটা চেষ্টা করে দেখি না! এভাবে আর ভাবি না। অন্তরের শক্তির নিরিখে সকলেই আদতে অ্যাভারেজ তথা মানসিক শক্তিতে ক্ষুদ্র হয়ে গিয়েছি। আগে মাঝেমধ্যেই সিজনে সিজনে বাঙালির হুজুগ পেত। যেমন ডিসেম্বর ও মার্চ মাসে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ পায়। ফেব্রয়ারিতে বাংলা ভাষা পায়। বৈশাখে শাড়ি-পাঞ্জাবি আর পান্তা-ইলিশ পায়। এখন বাঙালির সারা বছর প্রতিবাদ পায়। কিছু না কিছু ইস্যুতে প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলায় আমরা মেতেই আছি। প্রতিবাদ থেকেই তো লিডারের জন্ম হয়। অথচ এখানে এত প্রতিবাদ হলেও কোনো সর্বজনগ্রাহ্য জনপ্রিয় নেতার উত্থান ঘটে না।
তোফায়েল, মতিয়া, ইনু, মেনন, সেলিমরা এসেছিলেন ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। আজকের ছাত্ররাজনীতি বলে আদতে কিছুই নেই। সেই একই কারণ। এই ছাত্রদের প্রতিবাদ পায় নন-ইস্যুতে। যেমন চাকরিতে কোটা-সংস্কার তাদের কাছে জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিবাদ-আন্দোলনের পথ ধরেই রাতের অন্ধকারে উপাচার্যের বাসভবনকে পুড়িয়ে ভস্ম বানিয়ে দেওয়া হলো। এমন কাজ যারা করল, তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ নেই! কেউ যদি জেনে যায় যে সে দলে ভারী, অমনি মেতে উঠছে ধ্বংসের খেলায়।
নানা রকম নন-ইস্যু নিয়ে আমরা মাতামাতি করছি। দুভাগ হয়ে যাচ্ছি। আলাপ আলোচনায় আগুন জ্বলছে। এই যে অগভীরতা এটা প্রমাণ করে আসলে আমাদের মধ্যে আর প্রকৃত আগুনই নেই। যে আগুনটা স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে এই সেদিন নব্বইয়ের দশক পর্যন্তও ছিল। ভুল হোক ঠিক হোক সেদিনের ছাত্র-যুবারা নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আদর্শ সমাজ গঠনের স্বপ্নে ঝাঁপিয়েছিলেন। আজকের ছাত্রসমাজ শেষ কবে কৃষকদের জন্য মিছিল করেছে? কবে শ্রমিকদের জন্য রাস্তায় নেমেছে? কবে কর্মসংস্থানের দাবিতে আন্দোলন করেছে? আমরা এখন সর্বাগ্রে ঝাঁপাই অন্যকে অবজ্ঞা করার দিকে।
আমরা নিজেরা প্রতিদিন যে সংসার, পেশা, আড্ডা, ফেসবুক, প্রেম, টিভি, যে কাজগুলো করে থাকি তা আসলে আগের দিনেরই প্রায় পুনরাবৃত্তি। পরদিনও ওই কাজগুলোতেই ব্যাপৃত থাকি। আমাদের এই জীবৎকালে এমন কিছুই খুব বেশি করি না যাতে নিজের প্রতি আমাদের গর্ব হয়। আমাদের অহংকার আছে, দম্ভ আছে, আত্মাভিমান আছে। কিন্তু নিজের প্রতি নিজেদের কতজনের আন্তরিক শ্রদ্ধা আছে? নেই। কারণ নিজেকে ছাপিয়ে, অন্যকে ছাপিয়ে নিজের চেষ্টায় এমন কিছু হয়ে উঠতে পারি না যাতে আমাদের কেউ রোল মডেল করতে পারে। আমাদের কজনকে দেখে অন্য কেউ ভাববে হ্যাঁ ওকে অনুসরণ করা যায়? ওর অনুগামী হওয়া যায়! ভাববে না। কারণ ক্রমশই আমাদের আচরণে অন্যকে অপমান করে নিজেকে জয়ী প্রমাণের প্রবণতা প্রোথিত হয়েছে। নিজের অবস্থান, কর্মে আর আদর্শে বলীয়ান হয়ে জয়ী হওয়ার চেষ্টা নেই। সেটা কঠিন।
আমরা আজ লঘুতার চ্যাম্পিয়ন! লিডার বা নায়ক হওয়ার প্রধান শর্ত হলো অন্যরা আমাতে মুগ্ধ হবে। জনতা মনে করবে আমার মধ্যে এমন কিছু আছে যা আর কারও মধ্যে পাওয়া যাবে না। একে বিশ্বাস করা যায়। একে নির্ভর করা সম্ভব। ইনি আমাদের কথা বলেন। আর সর্বোপরি পারলে ইনিই পারবেন। এরকম কোনো লিডার আর দেশে আসছে না। কারণ আমাদের নিজেদের ওপরই তো বিশ্বাস নেই যে আমার সত্যিই গুরুত্ব কতটা। সেই কারণেই এই সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা প্রতিটি প্রতিবাদে আছি, প্রতিদিনের সুপ্রভাতে আছি, প্রতিদিনের রাজনীতিতে আছি, ক্রিকেট, ঈদ-আর ধর্মে আছি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আছি। কিছু না কিছু বলছি। শেয়ার করছি। পোস্ট করছি। কারণ কী? কারণ হলো একটি বহুল প্রচলিত ইংরেজি আপ্তবাক্য। বাক্যটির সংক্ষেপিত রূপ বেশি জনপ্রিয়। ফোমা। পুরো কথাটি হলো ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট!’ অর্থাৎ আমাদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে না তো? আমরা হারিয়ে যাচ্ছি না তো পরিচিতদের মন থেকে? আমাকে ভুলে যাচ্ছে না তো? আমারও কিছু বলার আছে...আমার কথার গুরুত্ব দাও সবাই...। এই তাড়নাকেই বলা হয় ফিয়ার অফ মিসিং আউট। এটা যদি গ্রাস করে তাহলে তো বুঝতে হবে আমাদের আত্মবিশ্বাস শূন্য। এরকম সমাজ থেকে নেতার জন্ম হবে কীভাবে? তাই হচ্ছেও না। নতুন এই যুগে বাংলায় দল আছে, নেতা নেই। ভিড়ের জয়গান আছে। ভিড়তন্ত্রে নেতা জন্মায় না। একক শক্তি নেই, দল আর ভিড়ের শক্তি তাই বাড়ছে। যেহেতু অনেকগুলো একের যোগফলেই ভিড় বা দল তৈরি হয়, তাই সেইসব দলের শক্তিতেও আন্তরিক প্রাণ নেই। আছে নেহাত দেহের শক্তি। যেটা অত্যন্ত স্থূল। প্রাণের শক্তির সহজাত আকর্ষণ আছে, দেহের শক্তির আছে নিছক বলের জোর। বল দিয়ে জোর খাটানো যায়, মন টানা যায় না।
নিজেরা বাস করি ফাঁকি আর দ্বিচারিতার মানসে। প্রতারণা আর অসততার বিরুদ্ধে আমরা গর্জে উঠি দল আর সমষ্টির প্রতিবাদে, অথচ পকেটে ছেঁড়া নোট থাকলে সংগোপনে চেষ্টা করি বাজারে, দোকানে, অথবা অন্ধকারে রিকশাচালককে গছিয়ে দিতে! আমরা আসলে অসম্ভব এক হিপোক্র্যাট জাতিতে পরিণত হচ্ছি!

 




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো. আহসান হাবীব
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
ড. কাজল রশীদ শাহীন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : editorkholakagoj@gmail.com    kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by Poriborton IT Team. Email : rafiur@poriborton.com
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();