নীরবতার আওয়াজ শুনুন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

নীরবতার আওয়াজ শুনুন

তৌফিকুল ইসলাম ৯:১০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

print
নীরবতার আওয়াজ শুনুন

সমাজে আমরা সবাই বাস করি, কিন্তু প্রতিটি মানুষ আমরা ভিন্ন। অনুভূতির বোধটা আমাদের সবার আছে, তবে আমরা সবাই এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র। তবুও আমরা একই চিন্তাধারার মানুষরা এক হয়ে বৃত্ত বাঁধি। চিত্তের আপনায় নির্মাণ করি নিজস্ব এক জগৎ। যেথায় আমরা মুক্ত, স্বাধীন আর চিন্তার উৎকর্ষতায় সুনির্মল।

এত চেনা ঘর আর বৃত্তাবদ্ধ আলপনায় তবু ঝড় ওঠে, থেমে যায় সুখের স্নিগ্ধ উল্লাস। মাতোয়ারা স্বপ্নের ঢেউয়ে আনন্দেরা কোথায় যেন উড়ে যায় ডানা মেলে। আমরা বিষণ্ন হই, মন খারাপের গদ্যগুলো ডায়েরির পাতায় উপড়ে ওঠে।

সবকিছুর মাঝেও আমরা স্বপ্ন দেখি শত প্রতিকূলতায় আর সীমাবদ্ধ যাপনের অভিলাষে। দিনশেষে তখন বড্ড একা লাগে। অনুভূতির দ্যোতনায় নিঃসীম পরাবাস্তবতা শেকড়কে আঁকড়ে ধরে থাকতে বলে। কিন্তু আমরা ছুটে চলি অসীম পানে, যেখানে নীড়ে ফেরা পাখিরা ঘর বাঁধে একটু সুখের আশায়।

জীবনের এই তো চেনা রূপ, আশা-নিরাশার দোটানায় জীবন এগিয়ে চলে। আমরা থেমে থাকি না। আমাদের সম্ভাবনাকে লালন করি পরম মমতার আদরে। স্পর্শ অনুভূতি ফিকে হয়ে যেতে চাইলেও বিস্ময় ঘোরে আঁকড়ে থাকি পৃথিবীর যত প্রত্যাশা বিন্দুকে।

মনের ভেতর ঘোর আসে, আপ্লুত নয়নে দুঃখেরা বাসা বাঁধতে চায়। কিন্তু সুখের নেশায় মনের অলিন্দে কষ্টকে আমরা ঠাঁই দেই না। এ জীবন ঢেউ বাঁধে হারিয়ে ফেলা মানুষের সন্ধানে। ফিরে ফিরে মনের বাড়িতে হানা দেয় দুঃসহ স্মৃতির জানালাগুলো।

আকাশ পানে ক্ষুদ্র প্রাপ্তিগুলো একাকী রুদ্রনীল বাস্তবতায় বাঁধ ভাঙার আওয়াজ শোনাতে চায়। ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে বন্ধনের আলোয় প্রতিটি সৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে স্বর্গে যাওয়ার প্রত্যয় বুনে আপন অন্তরাল।

মাঝ সমুদ্রে কূল হারিয়ে দিশেহারা নাবিকের মতো আমাদের জীবনও ছন্দ হারায়। ক্ষণিকের এ জীবনে সাজানো পরিবারের মিথস্ক্রিয়া আর গতানুগতিক সামাজিক স্রোত যে গতিপথে ধাবিত, তা নির্দিষ্ট ছকে জেগে থাকুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

কারণ জীবন হেরে গেলে শুধু জীবনের অপচয় হয় না, অপচয় হয় মনুষ্যত্বের। অবমাননা আর অবক্ষয়ের মানে সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ পানে যোগ্য সময়কে পথচলার সঙ্গী করা সবারই কাঙ্ক্ষিত।

মোদ্দাকথা, জীবনে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। হতাশ হওয়াটা মানবতার বিরুদ্ধাচরণ বলেই গণ্য করা যায়। আমরা পথ চলব, পথচলায় যদি বিঘ্ন আসে তাহলে অন্ধকারের শেষ প্রান্তেও আমরা আলোর সন্ধান করব। তবেই না সার্থকতা, স্রোতে গা ভাসিয়ে সব বদ্ধতাকে আগলে রাখা তো জীবনের সমার্থক হতে পারে না।

এদিকে অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কতটা এগিয়ে গিয়েছি, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমরা অনুভূতিগুলোকে কীভাবে লালন করি বা আমাদের অনুভূতি কীভাবে গড়ে ওঠে তা নিয়ে চিন্তাশীল মানুষের চিন্তার কোনো অন্ত নেই। এ চিন্তা অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে তোলে। চিন্তার জয় হয়, এটা সর্বজনীন বাস্তবতা। তাই তো জগৎবিখ্যাত চিন্তা সাধকদের এত সুনাম।

আসলে এ অনুভূতিটাই আমাদের আসল সম্পদ। অনুভূতির অন্তরালে আমরা যে মানসিকতা লালন করি, সেটাই আমাদের অনুভূতির বীজকে পরিস্ফুটিত করে।

এ ক্ষেত্রে অনুভূতির যে প্রত্যয় সেটা সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ অভিব্যক্তির পরিচায়ক। কারণ, নিত্যদিনের ব্যস্ততায় আমরা নিজেকে ভুলে যাই। নিজেকে সময় দিই না বলে আমাদের অনুভূতি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তাই অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অহঙ্কার আর ঔদ্ধত্য যেন অনুভূতির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে সেটা সবসময় সজাগ চোখে খেয়াল করতে হবে। তাই অনুভূতির জয় হোক, সে অনুভূতি আনন্দের, সে অনুভূতি পরমতমহিষ্ণুতার; তবেই না মানবতা ঋদ্ধ হবে। জেগে থাকবে বিবেকের অতন্দ্রপ্রহরী। নব নিত্য উল্লাসে আর শেকড়ের সন্ধানে।

সে জাগ্রত অনুভূতির সন্ধানেই এ শব্দ কথার প্রস্ফুটন, অনুভূতি অন্তরাল থেকে যা সদা দৃশ্যমান। নব তরুণের ঝঙ্কার থেকে প্রবীণ প্রাজ্ঞ মননে চির বিরাজমান।

অদৃশ্য সুতোর বাঁধনে অনুভূতির লাটাইকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি। এজন্যই আমরা শ্রেষ্ঠতার প্রতীক মানুষ। যা সমাজে নিত্যতায় আমাদের প্রকাশ করে নব উদ্ভাসে।

আসলে এ অনুভূতি নিজে নিজে জন্মায় না। এটা নানা উৎস হতে আমাদের মম চিত্তে প্রবেশ করে। পরিবারের শিক্ষা, বন্ধুতার আগল আর চারিপাশের পরিবেশ আমাদের অনুভূতি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এ অনুভূতি কখনো ভেঙ্গে যায়, আবার জেগে ওঠে; তাই অনুভূতির বিনির্মাণ এক চলমান প্রক্রিয়া।

এজন্য নীরবতার আওয়াজ শুনতে হয়। হিরন্ময় মৌনতায় নিজেকে জানতে হয়। শত কোলাহল আর শব্দ ঝঙ্কারের মাঝেও নিজের অনুভূতির যত্ন নিতে হয়। কারণ অনুভূতিটা যে আমার, আপনার সবার।

তৌফিকুল ইসলাম : সাংবাদিক
toufikdu1921@gmail.com