রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টানুন

ঢাকা, বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ | ২০ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টানুন

মো. আতিকুর রহমান
🕐 ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০২২

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টানুন

দেশে রাজনীতির ছদ্মাবরণে যে বাণিজ্য চলছে, তার সঙ্গে প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দল জড়িত। রাজনীতি নামের এ ইজারানীতির ফলে দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন ইত্যাদি বিষয় দিন দিন অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হচ্ছে। বর্তমানে সংসদে আমলা ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এরা নির্বাচনে যে পরিমাণ টাকা খরচ করেন, তার কয়েকগুণ বেশি অর্থ উপার্জনের চেষ্টা চালান। রাজনীতি করে এদেশে কেউ বিত্ত-বৈভরের মালিক হয়নি, এমন ঘটনা বিরল। তাই রাজনীতিকে ইজারানীতি বললেও ভুল বলা হবে না বলে মনে করি।

বর্তমানে রাজনীতি ইজারানীতিতে পর্যবসিত হওয়ায় সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ভাবধারার রাজনীতি একপ্রকার তিরোহিত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আদর্শ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের মারাত্মক অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে সর্বদা এখন ‘ধর-মার-খাও’ ভাব বিরাজ করছে, যা সাধারণ জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করি।

যদিও বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা রাজনীতির ইজারানীতি নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। নব্বইয়ের পরে যে ‘গণতান্ত্রিক পর্বের’ যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন অধিকাংশ জনগণ আশা করেছিলেন, এবার আমাদের রাজনীতি ক্রমশ গণতান্ত্রিক, সুস্থ ও ইতিবাচক হয়ে উঠবে। প্রথম কয়েক বছর মোটামুটি ভালো চললেও পরবর্তীকালে তা ধীরে ধীরে দূষিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে মূল ধারার রাজনীতি লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই রাজনীতিকে এখন ‘দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি’ অনেকেই বলে থাকেন। তবে এটাও সত্য সব রাজনৈতিক দল, নেতা বা কর্মীরা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত নন। বড় দু-তিনটি দল, তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি অংশ, সংসদ সদস্যদের একটি অংশ, অঙ্গসংগঠনের নেতা-নেত্রীদের একটি অংশ এই দূষণ ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত। এরাই সরকারকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ।

মূল দলের তুলনায় সংখ্যায় তারা কম হলেও দলে ও সরকারে তারা খুব প্রভাবশালী। অনেক দুর্বৃত্ত দলের নীতিনির্ধারণেও এরা জড়িত। তাদের দাপটে, সন্ত্রাসে, অর্থ-বিত্তের ক্ষমতায় ও আত্মীয়তার জোরে দলের নীতিবান, সৎ, সজ্জন ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাদের অনেকে রাজনীতি থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমান রাজনীতিতে কালোটাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। অবৈধ অর্থ উপার্জনে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশে হত্যা, গুম, সন্ত্রাস ও লুটপাটের রাজনীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ অন্যান্য উপায়ে অবৈধ অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে। নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, এমন কী হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না, যা দুঃখজনক বলে মনে করি।

যদিও বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে একশ্রেণির শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ রয়েছেন যারা এই দূষিত ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার নন এবং নির্বাচনে তাদেরই ভোট দিয়ে জয়ী করেন। সাধারণ মানুষসহ শিক্ষিত জনগণের ভোটেই এসব দল নির্বাচিত হয় ও সরকার গঠন করে। তারা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় গিয়ে যত অনাচার ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়, যা সত্যিই বেদনাদায়ক, এই ধারার অবসান হওয়া জরুরি বলে মনে করি।

যদিও আশার কথা, পুরো শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর তুলনায় এদের সংখ্যা খুবই কম। বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী স্বাধীন চিন্তা ও মতামত প্রকাশ করতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি তারা অনুগত নন। হয়তো অনেকে একটি দল সমর্থন করেন। সেই দলকে ভোটও দেন। কিন্তু দলের সমালোচনা করতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। নিজের পদোন্নতি বা বৈষয়িক কোনো লাভের জন্য তারা দল সমর্থন করেন না বা ভোট দেন না। দেন নীতিগত কারণে, মনের তাগিদে।

আমাদের বড় দু-তিনটি দল নানা অগণতান্ত্রিক কাজে ব্যাপৃত, নানা সন্ত্রাসী কাজে মদদ দেয়। দলীয় নেতারা (মন্ত্রী) দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আরও নানা অপকর্ম করেন। প্রায় দেখা যায়, তার প্রতিবাদে শিক্ষিত-সচেতন জনগোষ্ঠী তেমন সোচ্চার নয়। তারা নেতাদের এই অপকর্মগুলো দেখেন, বুঝতেও পারেন। কিন্তু নিজেদের পরিমণ্ডলে বা প্রকাশ্য সভায় অপকর্মের প্রতিবাদ করেন না। জোরালো ভাষায় নিন্দা করেন না। সুযোগ থাকলেও রুখে দাঁড়ান না। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতায় তারা আক্রান্ত। শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠীর খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ অপরাজনীতির প্রতিবাদ বা সমালোচনা করে লেখালেখি করেন বা কথা বলেন। বাকিরা যে অপরাজনীতিতে ক্ষুব্ধ হন না, তা নয়। তারাও ক্ষুব্ধ। কারণ, তাদের আশপাশে প্রতিদিন অপরাজনীতির নানা প্রকাশ তারা দেখতে পান। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে তারা নীরব থাকেন।

অপর দিকে দিন যতই যাচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী বক্তব্য জনমনে শঙ্কা বাড়াচ্ছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে সংলাপ হচ্ছে কিন্তু এখন পর্যন্ত আস্থার জায়গা অর্জিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত ও হানাহানি হওয়ার মতো যে পরিস্থিতি হাতছানি দিচ্ছে, আমরা তা দেখতে চাই না। আমাদের প্রত্যাশা দেশে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন ধারার রাজনীতি যাতে প্রতিষ্ঠিত হয় সে লক্ষ্যে সবার কাজ করা উচিত।

আমরা প্রায় দূষিত রাজনীতির জন্য রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করি। নিন্দা করি। দূষিত রাজনীতি ও দুর্বৃত্ত নেতাদের যারা প্রশ্রয় দেয়, আমরা তাদেরও সমালোচনা করি। কিন্তু নিরপেক্ষ নাগরিকও কি এ জন্য কম দায়ী? আবশ্যই না। কারণ আমরা সবাই ভোট দিয়েই তো তাদের নেতা বানিয়েছি। আমাদের ভোটে জয়লাভ করেই তারা সরকার গঠন করেছে। আমরা তো তাদের ভোট না দিয়ে প্রত্যাখ্যান করিনি। অযোগ্য লোকদের নেতা ও সাংসদ করার জন্য আমরাও কি কম দায়ী? আজ যদি দেশের সব সুশিক্ষিত ও সচেতন মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে দুর্নীতি ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন, নিয়মিত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতেন, তাহলে দুর্নীতি ও অপরাজনীতি এতটা বিস্তার লাভ করত না।

সামনে আবার নির্বাচন আসছে। আবার একটি দল বা জোট সরকার গঠন করবে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে সকল নাগরিক সমাজের উচিত এখন তাদের কর্তব্য কী, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করা। তাদের সুচিন্তিত সিন্ধান্ত দেশ তথা জনগণের জন্য যা অধিক জরুরি বলে মনে করি। এক্ষেত্রে যার যার অবস্থান থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা একজন সুশিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তির কর্তব্য বলে আমরা মনে করি। সেই প্রতিবাদ রাজনৈতিক দলের মতো সহিংস প্রতিবাদ হবে না। সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন, লেখালেখি, টিভি টক শো, বিবৃতি ইত্যাদি ভঙ্গিতে হবে। কিন্তু ব্যাপকভাবে হবে। তবে বাস্তবে এমন দৃশ্য আমাদের চোখে পরে না। যা মনে অধিক হতাশা জাগায়।

তাই দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে দেশের বৃহত্তর নাগরিক সমাজ সঠিক সিন্ধান্ত সময়মতো গ্রহণ করবেন এমনটিই কাম্য। আমরা চাই দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হোক, রাজনীতি হোক জনগণের সার্বিক কল্যাণে।

লেখক : সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিইউএফটি

 
Electronic Paper