কুকরুল-বুড়াইল নদীর কথা কি আমরা জানি?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী

কুকরুল-বুড়াইল নদীর কথা কি আমরা জানি?

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৭, ২০১৮

print
কুকরুল-বুড়াইল নদীর কথা কি আমরা জানি?

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যে ৪০৫টি নদী নিয়ে ‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ শীর্ষক ছয় খণ্ডের বই প্রকাশ করেছে, সেখানে একটি নদীর নাম আছে বুড়াইল। কিন্তু এখন যে কুকরুল-বুড়াইল নদীর কথা বলছি সেটি সে বুড়াইল নদী থেকে আলাদা। এ নদীটি কখনো নদী হিসেবে সংখ্যা বিবেচনায় তালিকাভুক্ত হয়েছে কিনা জানা যায় না। তবে জমির রেকর্ডপত্রে বুড়াইল হিসেবে নাম থাকতে পারে বলে স্থানীয় কেউ কেউ জানিয়েছেন।

এ নদীটি রংপুর শহরের উত্তর পাড় ঘেঁষে প্রবাহিত। রংপুর শহরের উত্তর অংশে কেডি খাল নামে একটি খাল আছে। এ খালেরও উত্তরে চিকলির বিল এবং কুকরুলের বিল আছে। তারও উত্তরে সবুজঘেঁষা গ্রাম-জনপদ। এই গ্রামের সবুজ ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে শান্ত-স্নিগ্ধভাবে বয়ে গেছে একটি ছোট নদী। নদীটির নাম স্থানভেদে কোথাও বুড়াইল, কোথাও কুকরুল।
রংপুর শহরের উত্তরে একটি নদী থাকার ধারণা অনেক দিনের। স্থানীয় কারো কারো কাছে এ খবর পেয়েছি বেশ কিছুদিন আগে। গত ৩ নভেম্বর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং নদী সংগঠক সঞ্জয় চৌধুরীসহ রংপুর শহরের উত্তরের ওই নদীটি খুঁজতে শুরু করি। প্রথমে যাই কেডি খালের কাছে। কুকরুল বিলের পাশ দিয়ে যেখানে কেডি খাল প্রবাহিত সেখানে।
সেখানে স্থানীয়দের কাছে খবর সংগ্রহ করি রংপুরের উত্তরের নদীটির। আমরা দুজনে রিকশাযোগে সেই নদীর পাড়ে পৌঁছাই। স্থানীয় বয়স্ক লোকদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করি। অতীতে  শৈশব-কৈশোরে তারা কেমন দেখেছেন এ নদী, তখন নদীর গতি-প্রকৃতি কেমন ছিল, সেসব নিয়ে আলাপ শুরু করি। তাদের অতীত অভিজ্ঞতায় আমাদের কাছে নদীটির বিভিন্ন চিত্র ফুটে উঠতে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এ নদীটি অনেক প্রশস্ত ছিল। কলার ভেলায় তারা নদী পার হয়ে শহরে আসতেন।
স্থানীয় সাধারণদের কথার সূত্র ধরে নদীর উজান পথে রিকশাযোগে চলতে থাকি। চিকলির বিলের কিছুটা উজানে কথা বলি কয়েকজনের সঙ্গে। তার মধ্যে একজন ছিলেন আব্দুল হাকিম। তিনি তার শৈশবে দেখা কুকরুল নদীর যে চিত্রকল্প আমাদের সামনে হাজির করলেন তাতে করে আমরা নদী সন্ধানে আরও উৎসাহ বোধ করতে থাকি। আমাদের কাছে ক্রমশ একটি মাঝারি নদীর দৃশ্যকল্প চোখের সামনে ভেসে ওঠে।  
সেখান থেকে আমরা আরও উজানে খটখটিয়া নামক স্থানে যাই। সেখানে খটখটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে স্থানীয় অনেকের কাছে জানতে পারি এ নদীর নাম কুকরুল নয়। বুড়াইলের হাট থেকে এ নদীটি এসেছে। খড়খড়িয়ায় কথা হয় ৮৫ বছর বয়সী জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে। তিনি জানালেন এ নদীটি গঙ্গাচড়ার বুড়ির হাট নামক স্থান থেকে প্রবাহিত হয়ে রংপুরের বাহার কাছনার নিকটে কেডি খালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
সঞ্জয়সহ আমরা রিকশাযোগে রওনা করি বুড়াইলের হাটে। বুড়াইলের হাটের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়াইল নদী। মূলত ওই হাটের নামকরণই হয়েছে এ নদীর নামে। সেখানে গ্রাম পুলিশ এবং মুদি ব্যবসায়ী আজিজার রহমান জানালেন নদীর আরও কিছু গল্প। ছোটবেলায় তিনি এ নদীতে সারা বছর পানি দেখেছেন। গভীরতাও ছিল অনেক। ২০-২৫ বছর থেকে নদীতে ধীরে ধীরে পানি কমতে শুরু করে। ওই হাটে বেশ কয়েকজন বয়সী মানুষ জানালেন জমির পুরাতন কাগজে বুড়াইল নদী হিসেবে উল্লেখ থাকতে পারে।
নদীর পাড়ে ৮টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে কথা বলে ক্রমে ক্রমে যে ধারণাটি পরিষ্কার হয়, এ নদীটি গঙ্গাচড়ার বুড়ির হাট নামক স্থানের একটি নিম্নভূমি থেকে উৎপন্ন হয়েছে। নদীটি প্রায় ১২ কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর রংপুর শহরের কাছেই কুকরুল বিলের একটি অংশে মিলিত হয়েছে। এ নদীটির স্থান ভেদে আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। কোথাও কোথাও এটি নদী কোথাও খাল বলে উল্লেখ করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী এই ১২ কিলোমিটার পথে কোথাও কোথাও নদীটির তলদেশ ভরাট হয়েছে। নদীটির মূল প্রবাহ অনেকটাই এখনো দখলে যায়নি।
এ নদীটি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। রংপুরের উত্তরে বর্ষায় যে পানি হয় তা এই নদী ধরে ভাটিতে প্রবাহিত হয়ে থাকে। প্রথমে এ পানি পড়ে কুকরুলের বিলে। সেখান থেকে সিগারেট কোম্পানি নামক স্থানের কাছে কেডি খালে। কেডি খালের পানি রংপুর শহরের পূর্বদিকে সাতমাথা নামক স্থানের কাছে মিলিত হয় শ্যামাসুন্দরী নদীতে। শ্যামাসুন্দরী নদীর পানি মাহিগঞ্জের কাছে মিলিত হয় খোকসা ঘাঘট নদে। খোকসা ঘাঘটের পানি নিয়ে নদীটি দমদমা নামক স্থানে মিলিত হয়েছে ঘাঘটে। ঘাঘট নদ এই পানি বহন করে নিয়ে যায় গাইবান্ধায় যমুনা নদীতে। এভাবেই রংপুরের উত্তরসংলগ্ন বুড়াইল নদীর পানি সমুদ্রপথে প্রবাহিত হয়।
রংপুর জেলা প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করলে এ নদীটির ইতিবৃত্ত খুঁজে এর পরিচর্যায় রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করতে পারে। জেলা প্রশাসন নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নদীটির অতীত-বর্তমান অবস্থা জেনে নিতে পারে। নদীটি রক্ষায় স্থানীয় জনগণেরও উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রয়োজন আছে। সবার সমন্বিত উদ্যোগেই কেবল নদী রক্ষা সম্ভব।
ক্রমে ক্রমে এ নদীটির যে করুণ দশা হয়েছে, তাতে করে বোঝাই যাচ্ছে যদি এ নদীর পরিচর্যা যথাযথ না হয় তাহলে এ নদীটি বিলুপ্ত হবে। তখন রংপুরের উত্তর জনপদে থাকা একটি বড় জনগোষ্ঠী বিপদে পড়বে। একটি নদী সবসময়ই জীবনের জন্য ইতিবাচক। সেই নদীকে মেরে ফেলা কখনোই কল্যাণের হবে না। কোথাও কুকরুল কোথাও বুড়াইল নামের এ নদীটি পুরাতন রুপ ফিরে না পেলেও তার বর্তমান প্রবাহে গতি সঞ্চারিত হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও
পরিচালক, রিভারাইন পিপল
wadudtuhin@gmail.com