ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫
এ মৃত্যুর দায় কে নেবে?
উমর ফারুক
Published : 2018-05-15 21:32:00
এ মৃত্যুর দায় কে নেবে?

৬ মে ২০১৮, দুপুর নাগাদ, এবার এসএসসি পরীক্ষার ফল বেরুলো। ঘরে ঘরে তখন উৎসবের আমেজ। মিষ্টির দোকানগুলোতে তখন উপচেপড়া ভিড়। রাস্তায় যানের জট। মোবাইলের নেটওয়ার্কের জট। ইন্টারনেট তখন ব্যস্ত। ফেসবুক জুড়ে তখন কেবলই অভিনন্দন বার্তা।

মিডিয়াগুলো স্কুলে স্কুলে ছুটছে লাইভ কাভার করতে। কিন্তু এই উৎসবের দিন, সারা দেশে প্রাণ গেল অন্তত তেরটি। ওরা পরীক্ষায় খারাপ করেছে। অভিমান, রাগ, ক্ষোভ, লজ্জা অথবা ভয়ে ওরা আত্মহত্যা করেছে। এই মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে না। এই মৃত্যু কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাশিত নয়। এই মৃত্যু অনাকাক্সিক্ষত। এই মৃত্যু আমাদের পারিবারিক প্রত্যাশা, সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, কে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী? কারা নেবে এসবের দায়ভার?
জারা বয়সে খুব ছোট। বয়স বছর ছয়েক। এ বছর ও রংপুরে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। জারা বেশ প্রতীভাবান ও অভিমানী। প্রতিবেশী ছোট্টবন্ধু অক্ষরের সঙ্গে ওর বেশ সখ্য। ওরা সারা দিন খেলে। কখনো বালিশ জোড়া দিয়ে ট্রেন বানায়। আবার কখনো পাতিলের মধ্যে বেলুন ঘুটে চা বানায়। পোলাও রাঁধে। কবিতা বলে। প্রচণ্ড ব্যস্ততা ওদের। সারা দিনের ব্যস্ততা। জরুরি কথা বলতে, ওদের কাছে সময় প্রার্থনা করতে হয়। কিন্তু কেন যেন আজ জারার মন ভালো নেই। নিশ্চুপ হয়ে আছে। কথা বলছে না। খেলছেও না। কারণ জানতে চাইলেও কিছু বলছে না। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার রেখা। একসময় জানা গেল কাল ওর পরীক্ষা। জারার মা পেশায় শিক্ষিকা। বাবা সরকারি চাকুরে। মেয়েকে পড়ার জন্য খুব একটা চাপ দেন না তারা। বড় আদুরে মেয়ে জারা। তবে কি পরীক্ষার চাপে জারার মন ভালো নেই? তবে কি স্কুলের চাপে জারার মন ভালো নেই? নাকি অন্যকিছু?
শ্বাশত ভট্টাচার্য রংপুরে একজন প্রতিনিধিত্বশীল মানুষ। প্রগতিশীল মানুষ। সংস্কৃতিচর্চা করেন। সমাজ উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন। সমাজ অবক্ষয় নিয়ে ভাবেন। সেদিন তিনি ছেলেকে নিয়ে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিতর্ক উৎসবের উদ্দেশে বের হলেন। দুপুরবেলা। ছেলের কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। পথে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা। ছেলের কাঁধে ব্যাগ দেখে প্রশ্ন করলেন, ছেলেকে নিয়ে কোচিংয়ে চললেন বুঝি? এটা আমাদের সমাজের বর্তমান চিত্র। আমাদের সন্তানের জীবনে শুধু দুটো অধ্যায়। কাঁধে ব্যাগ মানে হয় স্কুল, নয় কোচিং। অন্যকিছু এখানে অপ্রাসঙ্গিক। প্রকারান্তরে অপচয় ও বাহুল্য।
আমাদের মায়েরা ক্রমাগত এক সংক্রামক ব্যাধিতে জড়িয়ে পড়ছেন। ‘জানেন ভাবী, আমার ছেলেটা না, পঞ্চাশে পঞ্চাশ পেয়েছে। ভাবী জানেন, ওর হাতের লেখাটা না এত্তো সুন্দর, এত্তো সুন্দর, যে সবাই প্রশংসা করে।’ স্কুল গেটে অপেক্ষা করতে করতে কথাগুলো একজন মাকে এক অজানা প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। নেশার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সন্তানকে নিয়ে নিষ্ঠুর, বড় বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করছেন। ফলে সন্তানের জীবন থেকে খেলা উঠে যাচ্ছে। খোলা আকাশ উঠে যাচ্ছে। কার্টুন দেখা উঠে যাচ্ছে। বাকি থাকছে শুধু পড়া আর পড়া। আমাদের মায়েরা তাদের সন্তানকে নিয়ে ক্রমাগত উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠছেন। মানুষ তৈরির পরিবর্তে যন্ত্র তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে চাইছেন তারা। যার প্রভাব পড়ছে সন্তানের ওপর। ক্ষুদ্র-মানসিকতার জন্ম নিচ্ছে সন্তানের মধ্যে। সন্তান হেয় হচ্ছে। লজ্জিত হচ্ছে। অপমানিত হচ্ছে। একসময় নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। অসহায় বোধ করছে। নিকৃষ্ট মানসিকতায় ভুগছে, যা তাকে আত্মহত্যার মতো কাজেও উৎসাহিত করছে।
নিজেদের স্বপ্ন ও সামাজিক মর্যাদার জন্য, আমরা সন্তানদের অযথা বেশি চাপ দিচ্ছি। কখনো এই খারাপ কাজটি করছে পরিবার। কখনো-বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার কখনো-বা সমাজব্যবস্থা। ফলে অল্পবয়সে তাদের ফেলে দিচ্ছি এক অশুভ প্রতিযোগিতায়। ক্লাসে প্রথম বানানোর প্রতিযোগিতায়। ভালো গ্রেড পাওয়ার প্রতিযোগিতায়। একশতে একশ পাওয়ার প্রতিযোগিতায়। কিন্তু ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতা তার জীবনে কোনো কাজেই আসছে না। অশুভ এসব প্রতিযোগিতায় আমরা সংক্ষেপে সফলতা চাইছি। নোট বইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে সন্তানরা। গৃহশিক্ষকের চাপ বাড়ছে। মধ্যরাত পর্যন্ত শিশুকে জোর করে পড়াচ্ছি। খুব ভোরে ঘুম থেকে তুলে বই পড়াচ্ছি। এসব অস্বাভাবিক কার্যকলাপ সন্তানকে ক্রমাগত অসুস্থ করে তুলছে। মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে। ফলে প্রতিদিন আমাদের শিক্ষা হয়ে উঠছে নিরানন্দময়। অঙ্কুরেই জং ধরছে আমাদের সন্তানদের প্রতিভায়। আর কখনো কখনো প্রাণ দিয়ে তার মূল্য দিতে হচ্ছে।
বাজারে ভালো শিক্ষার্থীর কোনো সঠিক মানদণ্ড নেই। কিভাবে মাপবো আমরা ভালো শিক্ষার্থী? কোন মানদণ্ডে মাপবো? আসলে বিষয়টা আপেক্ষিক। মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিতে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পরীক্ষা নয়, বরং পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে পড়া। কাস টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, সাপ্তাহিক পরীক্ষা, মাসিক পরীক্ষা, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষা কী নেই সেখানে! দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতা সর্বস্ব। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান। আর শুধু কর্মসংস্থান নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা সবসময়ই বিপজ্জনক। এই বিপজ্জনক পথে ক্রমাগত বিনষ্ট হচ্ছে আমাদের প্রতিভা। প্রাণ যাচ্ছে আমাদের সন্তানদের।
আইয়ুব আলী বেরোবি’র এআইএস বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। বছর দেড়েক হলো পাস করে বেরিয়েছে। ফলাফল ভালো না। ও কম পড়ত। তবে প্রচণ্ড মেধাবী। পরীক্ষার সময় কখনো অন্য কারও উত্তরপত্রের দিকে তাকাত না। ও ছিল সৎ ও সাহসী। কর্মজীবন নিয়ে ওর তেমন কোনো ভাবনা ছিল বলে মনে হয়নি। তবে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ছিল ছেলেটা। সেদিন আইয়ুব ফোন দিয়েছিল। একটা বড় চাকরি পেয়েছে ছেলেটা। পাবনায় পোস্টিং। বেতন মোটা অংকের। আইয়ুবের মতো মেধাবীরা এভাবেই টিকে যায়। ফলাফল দিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাস দিয়ে।
বর্তমানে সময় বদলে গেছে। আজকের সমাজে তারাই টিকে থাকে যারা প্রকৃতি থেকে, সমাজ থেকে জ্ঞান আহরণ করে। বাকিরা খানিকটা দৌড়াবে। সংক্ষিপ্ত প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হবে। কিন্তু দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় তারা ছিটকে পড়বে, পড়বেই। সন্তানকে নিজের মধ্যে ডুব দেওয়ার সময় দিতে হবে। নিজেকে আবিষ্কার করার সময় দিতে হবে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে, নিজেকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করে গড়ে তুলতে শেখাতে হবে। তাহলে তারা টিকে থাকবে। অন্যতায় ভঙ্গুর, বিকলাঙ্গ হয়ে বেড়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যৎ। আর তাদের জীবন দিয়ে দেবে আমাদের ভুলের মূল্য।
শিশুকাল থেকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ভয় আমাদের সন্তানের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বাড়তি চাপ আমাদের আগামীর জন্য অশুভ বার্তা বয়ে আনছে। পরীক্ষায় খারাপ করে আত্মহত্যা তারই প্রমাণ। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষায় হেরে যেতে পারি কিন্তু জীবনের কাছে পরাজয় নয়। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত বিজয়ীকে কখনই কোনো প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে যেতে হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত পড়ার চাপ, পারিবারিক অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ, শিক্ষাপদ্ধতির অশুভ প্রতিযোগিতা ক্রমাগত আমাদের ভুলপথে পরিচালিত করছে। এই ভুলপথে প্রাণ যাচ্ছে আমাদের সন্তানদের। কিন্তু কে নেবে এই সব সন্তানদের আত্মহত্যার দায়? কারা নেবে এই সব সন্তানদের আত্মহত্যার দায়? সমাজ, রাষ্ট্র নাকি পরিবার? ভাবতে হবে, এগুলো কি শুধুই আত্মহত্যা নাকি হত্যা? আমরা কি আমাদের সন্তানকে আত্মহত্যা করতে প্রলুব্ধ করছি? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি আমাদের সন্তানকে হত্যা করছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চাপ কি আমাদের সন্তানকে ভুলপথে পরিচালিত করছে? এই আত্মহত্যার দায় কার কাঁধে চাপিয়ে আমরা মুক্তি পাব? কবে রোগাক্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি হবে?

উমর ফারুক : অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
faruque1712@gmail.com




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো. আহসান হাবীব
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
ড. কাজল রশীদ শাহীন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : editorkholakagoj@gmail.com    kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by Khola Kagoj IT Team. Email : rafiur@poriborton.com
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();