ঢাকা, বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৯ মাঘ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

হারিয়ে পাওয়া

এস আর শাহ্ আলম
🕐 ৫:০০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৭, ২০২২

হারিয়ে পাওয়া

ছ’মাসের প্রেগনেন্ট শিলা, কোলে পাঁচ বছরের ছেলে রনি। ইমারজেন্সিতে এখন ডাক্তার আছেন। শিলার ডাক্তার ভাগ্যে বরাবরই ভালো। অ্যাজমা আছে রনির, তাই প্রায়ই তাকে ছেলেকে নিয়ে ছুটতে হয় ডাক্তারের কাছে। এখন আর ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লেখেন না। শুধু মুখে বলে দিলেই ওষুধের ডোজ নিয়মাবলি দ্রুত ধরতে পারে শিলা। তার জন্য ডাক্তার কোনো রকম ফি নেন না। শিলার আসতে আজ একটু দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তার ক্ষেপে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ আজ আসতে এত দেরি হলো কেন?

শিলা জবাব দেয়- কী করব স্যার, সবকিছু তো নিজেকেই সামলাতে হয়।
কথাগুলো এতটা লো ভলিউমে উচ্চারণ করল শিলা, সেটা ডাক্তারের কানে ঠিকমতো পৌঁছায়নি। ছ’মাসের সন্তান পেটে নিয়ে পাঁচ বছরের ছেলেকে কোলে করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শিলার মনে হয়েছে এটা এভারেস্ট কিংবা কেওক্রাডং পাড়ি দিচ্ছে। এখনো তার বুকটা ধড়ফড় করছে। বুকের ভেতর ধুকধুক শব্দটা কানে বাজছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। স্বামী নামের দেবতটার যত টাকা হচ্ছে, ততই লোকটা স্বার্থপর হচ্ছে। শিলার চাহিদা মনে হয় আজ তার কাছে ফুরিয়ে গেছে। কেন যে এমন লোভী মানুষটাকে শিলা বিয়ে করেছিল। সে কথা মনে হলে দু’চোখে জল এসে যায়। ডাক্তারের সম্মুখে আসন গ্রহণ করতেই পাশের কেবিনে পুরুষ কণ্ঠে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়ে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল- লোকটা এভাবে কান্না করছে কেন?
: সে অনেক কথা। ঘুমের ইনজেকশন না দেওয়া পর্যন্ত এই কান্না থামবে না। আপনি বসুন, আমি আসছি।
কান্নার আওয়াজ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ডাক্তারের পিছু পিছু শিলাও ছুটে যায়। জরাজীর্ণ বেডে বেশ আঁটোসাঁটো হয়ে শুয়ে আছে পঁচিশ-ত্রিশ বছরের এক যুবক। ইনজেকশন পুশের কারণে কান্নার শব্দটা বেশ শিথিল হচ্ছে। বেডের নিকটে এসে আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে শিলা। দীর্ঘ সাত বছর পর আবিরকে চিনতে তার কোনো কষ্ট হলো না। এসিডে ঝলসে যাওয়া পুরো মুখম-লটা কেমন জানি দগদগে লালচে ঘায়ের মতো দেখাচ্ছে। ধপাস করে বেডে বসে আবিরের কপালে হাত রেখে ‘আবির, আবির’ বলে ডাকতে লাগল। তড়িৎগতিতে ডাক্তার বললেন, কী করছেন! পেশেন্টকে ঘুমাতে দিন। বুঝতেই তো পারছেন জেগে গেলে লোকটার কী অবস্থা হতে পারে।
: স্যার, স্যার...।
: পেশেন্ট কি আপনার পরিচিত কেউ।
: সে অনেক কথা স্যার। মলিন কণ্ঠে উত্তর দিল শিলা।
: বলুন না?
: আজ থেকে সাত বছর আগে ভার্সিটিতে পড়ার সময় আবিরের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমার পাড়ার এক খালাত ভাই, প্রতিনিয়ত আমাকে উত্ত্যক্ত করত। ততদিনে আবির এবং আমার সম্পর্কটা বেশ গাঢ় হয়েছে। একদিন ক্যাম্পাস থেকে বাড়ি ফিরছি। হঠাৎ খালাত ভাই আমার পথরোধ করে বলল, আবিরের সঙ্গে দেখলে সে আমার সুন্দর মুখটা এসিডে ঝলসে দেবে।
এমন নেগেটিভ ডায়ালগ আমার খালাত ভাই বহুবার দিয়েছে। সেটাতে কোনো নার্ভাস ফিল করিনি। তাই এবারো তার ব্যতিক্রম হলো না। মাসখানেক পর ক্যাম্পাসের একটি অনুষ্ঠান শেষ করে প্রধান ফটকের সামনে ঝাউগাছের নিচে বেঞ্চে বসে আমি ও আবির কথা বলছি। ধূমকেতুর মতো হঠাৎ আমার খালাত ভাই এসে আচমকা ঠুস করে আবিরের পেটে ছুরি বসিয়ে দেয়। পকেটে রাখা একটা বোতলের মুখ খুলে আমাকে উদ্দেশ্য করে ছুড়ে মারে, মুমূর্ষু অবস্থায় আমার খালাত ভাইকে জাপটে ধরে বোতলটা নিতে গিয়ে দুর্ভাগ্যক্রমে পুরো বোতলের এসিডে আবিরের মুখম-ল ঝলসে যায়। আবিরের এ অবস্থা দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তারপর কী হয়েছে বলতে পারি না। জ্ঞান ফেরার পর শুনি হাসপাতালে নেওয়ার পথে আবির মারা গেছে। আবিরের শোকে দীর্ঘ এক বছর আমি শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। বাস্তবের কাছে সবাই পরাজিত। একথা ভেবে অবশেষে পরিবারের পছন্দ করা এক বিদেশফেরত ছেলেকে বিয়ে করি। তবে আবিরকে ছাড়া আমি আজও সুখী হতে পারিনি।
ডাক্তার সাহেব শিলার কথা শুনে দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বললেন, সত্যি, এমন গল্প এই প্রথম শুনলাম।
জলে ভেজা চোখ দুটো মুছে নাক উপরের দিকে টেনে শিলা বলল- আবির কেন এমন কান্না করে?
: ঝলসে যাওয়া স্থানগুলোতে মাঝে মাঝে ইনফেকশন দেখা দিলে তীব্র যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়।
: এর থেকে কখনো মুক্তি পাবে না?
: না। বাকি জীবনটা এভাবেই কাটাতে হবে।

 
Electronic Paper