হাসবেবুর গল্প

রানাকুমার সিংহ / ২:২০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৪,২০২১

এক দরিদ্র মহিলার হাসবেবু নামে একটি ছোট ছেলে ছিল। ছেলেটির বাবা তাকে ছোট্টটি রেখে মারা যান। যখন হাসবেবুর পড়া শেখার সময় হলো তখন তিনি তাকে স্কুলে পাঠালেন। কিন্তু পড়াশোনায় তার মন বসে না। ঠিকই স্কুল পালাল।

 

হাসবেবুর মা তাকে একটি দর্জির দোকানে কাজ করতে দিলেন, যাতে কাপড় সেলাই শিখতে পারে। কিন্তু সে তাও শিখল না। পরে তাকে একটি জুয়েলারি দোকানে দিলেন স্বর্ণের কাজ শেখার জন্য। কিন্তু হাসবেবুর এটাও শেখা হয় না। এরপর তার মা কখনো তাকে আর কিছু করতে দেননি। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, ঘরে থাকো, আমার ছেলে। তোমার যা খুশি তা-ই করো।’

এরপর থেকে সে বাড়িতেই থাকত আর খাওয়া-দাওয়া ও চুটিয়ে ঘুম দিত।
একদিন ছেলেটি মাকে বলল, ‘মা, বাবার কী কাজ করত?’
মা উত্তর দিলেন, ‘তিনি একজন নামকরা ডাক্তার ছিলেন।’

‘বাবার বইগুলো কোথায়?’
‘অনেক দিন কেটে গেছে এবং আমি বইগুলোর যত্ন নিইনি। পুরাতন আলমারিটা ঘেটে দেখতে পারো সেখানে বইগুলো আছে কি না।’
হাসবেবু আলমারিটা খুঁজে একটি বই অক্ষত পেল। বাদবাকি সব বই পোকামাকড় খেয়ে ফেলেছে। সে অক্ষত বইটি মনযোগ দিয়ে পড়ত।

একদিন সকালে কয়েকজন প্রতিবেশি এসে তার মাকে বলল, ‘তোমার ছেলেকে আমাদের সাথে দাও, আমরা একসঙ্গে কাঠ কাটতে যাই।’ যারা এসেছিল ওদের কাঠের ব্যবসা ছিল। সংগ্রহ করা কাঠ কয়েকটি গাধা বোঝাই করে তারা শহরে বিক্রি করত।
হাসবেবুর মা খুব খুশি হলেন। তিনি ছেলের জন্যও একটি গাধা কেনার চিন্তা করলেন যাতে সেও কাঠের ব্যবসা করতে পারে।
পরদিন হাসবেবু গাধা কিনে আনল। তার কাঠের ব্যবসা জমে উঠল। একদিন কাঠ সংগ্রহে গিয়ে কাজের ফাঁকে তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল।

হাসবেবু খেলাচ্ছলে তার কাছে থাকা একটি পাথর তুলে নিল এবং অলসভাবে মাটিতে ফেলে দিল। একটি ফাঁপা শব্দ বেজে উঠলে সে তার সঙ্গীদের ডেকে বলল, ‘এখানে এসে শোনো; মাটি ফাঁকা লাগছে!’
‘আবার পাথরটি ফেলো!’ তারা চিৎকার করে উঠল। সে পাথরটি ফেলতেই ফাঁপা আওয়াজ শোনা গেল।

হাসবেবু বলল, ‘চলো আমরা খনন করি’। তারা মাটি খনন করতেই কূপের মতো একটি বড় গর্ত খুঁজে পেল, যা মধু দিয়ে ভরাট।
সকলে খুশিতে চকমক করতে লাগল। তারা বলল, ‘এটা জ্বালানি কাঠের চেয়ে ভালো! এটি আমাদের আরও টাকা দেবে। আমরা এখান থেকে মধু আহরণ করে শহরে নিয়ে যাব ও বিক্রি করব। সবাই মিলে টাকা ভাগ করে নেব।’

পরদিন প্রত্যেক ব্যক্তি বাড়িতে যে বাটি এবং পাত্র খুঁজে পেল তাই নিয়ে আসে এবং হাসবেবু গর্তে নেমে সেগুলো সব মধুতে ভরে দেয়। সে এই কাজ তিনমাস ধরে প্রতিদিন করতে লাগল।
তিনমাস পর মধু প্রায় শেষ হয়ে গেল। গর্তের খুব গভীরে কিছু মধু দেখা যাচ্ছিল। তা দেখে অন্যরা হাসবেবুকে বলল, ‘আমরা তোমার হাতের নিচে একটি দড়ি বেঁধে রাখব এবং তোমাকে নামিয়ে দেব, যাতে তুমি বাকি সব মধু তুলে আনতে পারো। যখন তুমি কাজ শেষ করে ফেলবে আমরা তোমাকে টেনে তুলব।’

‘খুব ভালো’। সে উত্তর দিল এবং সে নিচে নেমে গেল। সমস্ত মধু আহরণের পর তার সঙ্গীরা ভাগের টাকা মেরে দেওয়ার জন্য তাকে গর্তে ফেলে চলে গেল। তারা পরামর্শ করল হাসবেবুর মাকে বলবে, তোমার ছেলে সিংহের হাতে ধরা পড়েছে এবং সিংহ তাকে টেনে জঙ্গলে নিয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করেছি তাকে অনুসরণ করতে, কিন্তু পারিনি।

হাসবেবুর এটা জানতে বেশি সময় লাগেনি, সঙ্গীরা তাকে গর্তে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু তার সাহসী হৃদয় ছিল এবং আশা করেছিল যে সে হয়ত নিজের জন্য একটি উপায় খুঁজে পেতে সক্ষম হবে। দেখতে পেল গর্তটি মাটির নিচে অনেক দূরে চলে গেছে। তার সংগ্রহ করা মধু থেকে কিছু খেয়ে রাতে ঘুমিয়ে নিল।

পরদিন সকালে, একটা বিচ্ছুকে বের হয়ে আসতে দেখে সে। বিচ্ছু বের হয়ে আসা ছোট্ট গর্তটি তার মধুর চাক কাটার ছুরি দিয়ে খনন করতে শুরু করল। একসময় ছোট্ট গর্তটি বড় হয়ে গেল এবং সে নিজেকে ওর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করাতে পারল। যখন সে বাইরে বেরোল তার সামনে একটি বড় খোলা জায়গা ও সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি পথ দেখতে পেল। পথটি ধরে চলতে চলতে একটি বড় বাড়িতে পৌঁছায়। বাড়িটির সোনার দরজা খোলা ছিল। বাড়িটির ভিতরে একটি দুর্দান্ত হল ও হলের মাঝখানে মূল্যবান পাথরের একটি সিংহাসন এবং নরম কুশনের একটি সোফা বসানো ছিল। ক্লান্ত হাসবেবু কিছু না ভেবেই ওই সোফায় ঘুমিয়ে পড়ল।

আসলে এটি সর্পরাজের প্রাসাদ ছিল। যখন সাপেরা হলের মধ্যে ঢুকল তারা রাজার সোফায় একজন লোককে পড়ে থাকতে দেখে। এ দৃশ্য দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। সৈন্যরা তাকে হত্যা করতে চাইলে রাজা বললেন, ‘ওকে একা থাকতে দাও এবং আমাকে একটি চেয়ার দাও।’ কিছুক্ষণ পর রাজা অপরিচিত ব্যক্তিটিকে আলতো করে জাগিয়ে তুলতে বললেন। সৈন্যরা তাকে জাগিয়ে তুলল। হাসবেবু উঠে বসল এবং তার চারপাশে অনেক সাপ দেখতে পেল। তাদের মধ্যে একটি খুব সুন্দর, রাজকীয় সাজে সজ্জিত।

হাসবেবু জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কে?’
‘আমি সাপের রাজা এবং এটি আমার প্রাসাদ। আর তুমি কি বলবে তুমি কে এবং কোথা থেকে এসেছ?’

হাসবেবু তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া কাহিনী সর্পরাজকে বলল। রাজা সব শুনে বললেন, ‘আপাতত আমাদের সাথেই থাকো।’ তিনি তার সৈন্যদের ঝরনার জল এবং বন থেকে ফল এনে অতিথির আপ্যায়ন করতে নির্দেশ দিলেন।

কিছুদিন হাসবেবু সর্পরাজার প্রাসাদে বিশ্রাম নিল। সে তার মা এবং গ্রামের জন্য অস্থির হয়ে উঠল। সাপের রাজাকে বললে, ‘মহারাজ, দয়া করে আমাকে বাড়িতে পাঠান। এটাই আমার প্রার্থনা।’

সাপের রাজা উত্তর দিলেন, ‘তোমাকে বাড়িতে পাঠালে ফিরে গিয়ে তুমি আমাদের অনিষ্ট করবে।’
হাসবেবু জবাব দিল, ‘আমি আপনাদের কোনো মন্দ করব না। আমাকে বাড়িতে পাঠান। আমি প্রার্থনা করি।’
সর্পরাজ বললেন, ‘আমি এটা জানি। যদি আমি তোমাকে বাড়িতে পাঠাই, তুমি ফিরে আসবে এবং আমাকে হত্যা করবে। আমি এটা করার সাহস করি না।’ কিন্তু নাছোড়বান্দা হাসবেবুর আকুতিতে শেষপর্যন্ত রাজা বললেন, ‘শপথ করো, তুমি যখন বাড়িতে ফিরে যাবে তখন যেখানে অনেক লোক জড়ো হয় সেখানে তুমি খালি গায়ে গোসল করতে যাবে না। কারণ আমাদের রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারক তোমার বুকে স্থাপিত হয়েছে।’

হাসবেবু রাজাকে কথা দিলে তিনি বাড়িতে ফেরত পাঠালেন। তার মা ছেলেকে ফেরত পেয়ে আনন্দে কান্না শুরু করে দিলেন।

ঠিক তখন শহরের এক সওদাগর খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। সমস্ত বৈদ্য বললেন, সওদাগরের নিরাময়ের একমাত্র জিনিস হলো সাপের রাজার মাংস। এই মাংস একমাত্র সেই ব্যক্তি পেতে পারেন যার বুকে একটি অদ্ভুত চিহ্ন রয়েছে। সওদাগরের লোকেরা সেই ব্যক্তির খোঁজ করতে লাগল। এদিকে হাসবেবু তিনদিন ধরে সাপের রাজাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মনে রেখে গোসল করতে যায়নি। চতুর্থ দিন এত গরম পড়ল যে অস্বস্তিতে সে সব ভুলে গেল।

গ্রামের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে জামা খুলে ফেলল। সওদাগরের লোকরা তাকে ঘিরে ধরে বলল, ‘আমাদের সেই জায়গায় নিয়ে যাও, যেখানে সাপের রাজা থাকেন।’
হাসবেবু রাজি হলো না। তারা তাকে বেঁধে মারধর করতে শুরু করল। মারধরের চোটে সে রাজি হয়ে গেল। সাপের রাজার প্রাসাদে না পৌঁছানো পর্যন্ত দীর্ঘপথ সওদাগরের লোকরা কবিরাজসহ হাসবেবুর সঙ্গে গেল।

হাসবেবুকে দেখে সর্পরাজ বললেন, ‘জানতাম তোমার কারণেই আমার মৃত্যু হবে। কে তোমাকে এভাবে মারধর করেছে?’ হাসবেবু সমস্ত ঘটনা বলল। সর্পরাজ হাসবেবুকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করল যাতে সে একজন বড় চিকিৎসক হয়।

সওদাগরের লোকরা সর্পরাজকে হত্যা করে তার মাংস নিয়ে শহরে ফিরে এল। সর্পরাজের মাংস খেয়ে সওদাগর সুস্থ হয়ে উঠল। তখন থেকে সে হাসবেবুকে খুব ভালোবাসত।

হাসবেবু একজন বড় চিকিৎসক হয়ে উঠল এবং অনেক অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করতে লাগল। দয়ালু সর্পরাজার জন্য সবসময় তার মন কাঁদত।

আফ্রিকার লোকগল্প

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com