বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক উন্নয়নে বাংলাদেশ কতদূর!

এম. রনি ইসলাম / ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮,২০২১

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার চারটি মূল স্তম্ভের অন্যতম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘গণতন্ত্র’। গণতন্ত্রের ইংরেজি 'democracy' যার অর্থ জনগণের শাসন। অর্থাৎ গণতন্ত্র হলো জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং জনগণের জন্য সেবার নিমিত্তে জনসেবক হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। তবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংজ্ঞাটি দিয়েছেন আব্রাহাম লিংকন।

তার মতে, ‘গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য’। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানমতে, রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন মৌলিক অধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিধা নিশ্চিত হবে। জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হোঁচট খেয়েছে বারবার।

১৯৯৩ সালে ভিয়েনাতে সর্বজনীন মানবাধিকার সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে চীন, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ সব দেশের জন্য অভিন্ন মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য রাজনৈতিক অধিকারের চেয়ে অর্থনৈতিক অধিকার অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই পৃথিবীর সর্বত্র একই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা মানবাধিকারের প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্যের পক্ষে তিনটি বক্তব্য তুলে ধরা হয়। প্রথমত, রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। গণতান্ত্রিক সরকারের চেয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উপযোগী। গত কয়েক দশক ধরে কর্তৃত্ববাদী সরকারের নেতৃত্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন এ মতবাদের সমর্থক। এ বক্তব্য প্রথম জোরালভাবে তুলে ধরেন সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। দ্বিতীয়ত, এ কথা জোর দিয়ে দাবি করা হয়, দরিদ্র মানুষরা অর্থনৈতিক অধিকারকে রাজনৈতিক অধিকারের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। তাই তো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় শুধু ভাত আর একটু নুন’। অনেকেই বলে থাকেন, দরিদ্রদের কেউ কেউ গণতান্ত্রিক অধিকার চাইলেও সামগ্রিকভাবে দরিদ্রদের জন্য অর্থনৈতিক অধিকার অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্ম ও বিকাশ পাশ্চাত্য জগতে। এই মূল্যবোধ এশিয়ানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এশিয়ান মূল্যবোধে সামাজিক শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য অনেক মূল্যবান। কাজেই এশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিম-লে গণতন্ত্র অচল। লি’র বক্তব্য থেকে বলা যায়, এ কথা সত্য যে চীন, সিঙ্গাপুরের মতো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধির হার গণতান্ত্রিক ভারতের চেয়েও বেশি। এর অর্থ এই নয়, যেখানেই গণতন্ত্র অনুপস্থিত, সেখানেই প্রবৃদ্ধির হার বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহে প্রবৃদ্ধির হার বেশি হওয়ার কারণ ভিন্ন। অমর্ত্য সেনের মতে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়নি। এই দেশগুলো উন্মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতা করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারকে ব্যবহার করেছে; সাক্ষরতার হার বাড়িয়েছে এবং স্কুলশিক্ষার সম্প্রসারণ করেছে। সাফল্যের সঙ্গে ভূমি সংস্কার করেছে। বিনিয়োগ, রপ্তানি ও শিল্পায়নের জন্য উৎসাহ দিয়েছে।

ইতিহাসে অনেক দেশ দেখা যায় যেখানে কর্তৃত্ববাদী সরকার শাসন করেছে কিন্তু সেখানে কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়নি। পক্ষান্তরে এমন উদাহরণও রয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। আফ্রিকা মহাদেশের বোতসোয়ানা নামক দেশটি এক্ষেত্রে বড় একটি উদাহরণ। এই দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে। ভারতে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি থেকে প্রমাণিত হয়, গণতন্ত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধকতা নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে একটি সমীক্ষায় অ্যাডাম প্রেজওরস্কি (adam przeworski) এবং ফার্নান্ডো লিমোগনো (fernando limogno) মন্তব্য করেছেন, ‘We don’t know whether democracy fosters or hinders ecomomic growth'। গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়, অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছলদের ধীরে ধীরে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রবৃদ্ধি সৃষ্টিকারী পুঁজিবাদী সম্পত্তি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। পক্ষান্তরে গণতৃেন্ত্রর বিপক্ষে বলা হয়, গণতন্ত্র দ্রুত ভোগের পরিমাণ বাড়ায়, এর ফলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী সরকার সঞ্চয় বাড়ায় ঠিকই, কিন্তু উদ্বৃত্ত অর্থ তাদের উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিগত প্রকল্পে ব্যয় করে। যুক্তি দু’দিকেই আছে। তাই গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্ক নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ ও সম্ভব নয়। তবে অমর্ত্য সেন তার, Development of freedom-১৯৯৯-এ বলেছেন, যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সে দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তার মতে, ১৯৪৭ সালে ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। প্রতিতুলনায় ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সময়কালে চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ ঘটে। চীনের দুর্ভিক্ষ ঘটেছে একারণে, সেখানে কর্তৃত্ববাদী সরকার ছিল, যার কোনো জবাবদিহি ছিল না। চীনের গণমাধ্যম ছিল নিয়ন্ত্রিত, তাই এ নিদারুণ দুর্ভিক্ষ নিয়ে সেখানে কোনো আলোচনাও হয়নি। পক্ষান্তরে ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষিত ছিল। তাই ভারতে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে হইচই পড়ে যেত এবং সরকারকে যেভাবেই হোক খাদ্য সংগ্রহ করতে হত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভাবে এবং স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকায় চীনের এ দায় ছিল না। তাই চীনে দুর্ভিক্ষ হয়েছে, ভারতে দুর্ভিক্ষ হয়নি। তাই গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করলে গরিব দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা বেড়ে যাবে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের পক্ষে দ্বিতীয় যুক্তি হল, গরিব মানুষরা অর্থনৈতিক উন্নতি চায়, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। অনেক নেতাই এ মতবাদে বিশ্বাস করেন। প্রকৃতপক্ষে এর কোনো ভিত্তি নেই। জনগণ কোথাও কর্তৃত্ববাদী শাসনকে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে জনসাধারণ আন্দোলন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। গণতন্ত্রের সমালোচকরা বলে থাকেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পাশ্চাত্যের সামাজিক পরিবেশে লালিত হয়েছে। এই মূল্যবোধের সঙ্গে প্রাচ্যের জনগণের মূল্যবোধের সম্পর্ক নেই। এই মতবাদ ঐতিহাসিকের কাছ থেকে আসেনি। এসেছে কিছু রাজনীতিবিদ, যারা কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চান। তারা প্রাচ্যের যে মূল্যবোধের সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। চীনের কনফুসিয়াস যেমন সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছেন, তেমনি তিনি আবার রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আস্থায় বিশ্বাস করতেন না। ভারতে বৌদ্ধ দর্শন গণতন্ত্রকে সমর্থন করে। সুতরাং এশীয় মূল্যবোধ নিয়ে যা বলা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মনগড়া।

মানুষের জন্য গণতন্ত্র। কেননা, গণতন্ত্র মানুষের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করে, মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং মানুষের প্রয়োজন নির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উন্মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে মানুষ তাদের ভাবের লেনদেন করে এবং এই প্রক্রিয়ায় মানুষের চাহিদা অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই চায় না, তারা মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চায়। মানবাধিকারের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড়। নাগরিকের জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য গণতন্ত্রের ভূমিকা ব্যাপক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিতর্কিত প্রশ্নসমূহ নিয়ে ঐকমত্য অথবা প্রায় ঐকমত্য গড়ে তোলাও সম্ভব। দেশের মানুষের মধ্যে মানুষের চাহিদা সম্পর্কে ঐকমত্য না থাকলে সেখানে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কষ্টকর। কাজেই উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য গণতন্ত্র অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে একথা সত্য, গণতন্ত্র হলেই সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। গণতন্ত্রের যেসব বিকল্প রয়েছে, সেসব ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক ত্রুটি রয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো ছিল গণতান্ত্রিক ও তাতে ছিল বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ইংরেজ শাসনামলের প্রাথমিক পর্যায় থেকে এ অঞ্চলে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল যার মধ্যে সন্নাসী বিদ্রোহ, ওয়াহাবি বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যদিও এ আন্দোলনগুলোকে সরাসরি গণতান্ত্রিক বলা যায় না তথাপি এগুলো ছিল জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা যা একপ্রকার গণতান্ত্রিক। পরবর্তীকালে কৃষক বিদ্রোহ ও উপজাতিদের মধ্যেও বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিশ শতকের প্রথম থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালিত হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। এরপর খেলাফত আন্দোলন, আসে অসহযোগ আন্দোলন; আসে ভারত ছাড় আন্দোলন। এসব আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের একটি লক্ষ্য ছিল দেশে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৪৭ সালে ভারতকে দু’ভাগ করে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। পাকিস্তান অঞ্চলে মুসলিম লীগের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। মুসলিম লীগ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এলেও তারা ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে আসে। এর ফলে বাংলাদেশ অঞ্চলে নতুন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়। এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ আন্দোলন ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দেশে বহুদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা। মুসলিম লীগ পাকিস্তানকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তিনি (লিয়াকত আলী খান) জনগণের প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি, একটা দলের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল যে এক হতে পারে না, এ কথাও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। একটা রাষ্ট্রে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল থাকতে পারে এবং আইনে এটা থাকাই স্বাভাবিক। দুঃখের বিষয়, লিয়াকত আলী খানের উদ্দেশ্য ছিল যাতে অন্য কোনো দল পাকিস্তানে সৃষ্টি হতে না পারে। একদলীয় স্বৈরাচারের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধু সবসময়ই বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না’। তিনি এ-ও বিশ্বাস করতেন, কোনো নেতা যদি অন্যায় কাজ করে তবে তার প্রতিকার করার অধিকার জনগণের আছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদী ও গণতন্ত্রী দুটি ধারা দেখা যায়। ষংর্ভাগ্যবশত কর্তৃত্ববাদী ধারার সূচনা ঘটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। শুরু হয় একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান সামরিক শাসকরা। সামরিক শাসক মেজর জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীকালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কিন্তু জনগণ এই কর্তৃত্ববাদী ধারা সহজেই মেনে নেয়নি। দলমত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়ায় জনগণ। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা পুনরায় চালু হয় বাংলাদেশে। কিন্তু কতটা মসৃণ বাংলাদেশের গণতন্ত্র! গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগের পরও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বিকশিত হয়নি।

গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য তিনটি উপাদানকে অপরিহার্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। সেগুলো হচ্ছে- ক. সর্বজনীন ভোটাধিকার; খ. আইনসভা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদের জন্য নিয়মিত অবাধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, বহুদলীয় নির্বাচন, গ. নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, যার মধ্যে মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠন তৈরির স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যার অধীনে সব নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা সত্যিকারের আইনি সম-অধিকার ভোগ করবেন। কোনো দেশকে গণতান্ত্রিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তার এই তিনটি মানদণ্ডে উতরাতেই হবে। কারণ এর যেকোনো একটি অনুপস্থিত হলেই অন্যগুলোর উপস্থিতি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তিনটি লক্ষণ কী অবস্থায় আছে, তা নাগরিকেরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন। ফ্রিডম হাউস নামে একটি মার্কিন সংগঠন পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহকে গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে- ক. পূর্ণ গণতান্ত্রিক বা স্বাধীন, খ. আংশিক গণতান্ত্রিক বা আংশিক স্বাধীন; গ. অগণতান্ত্রিক বা স্বাধীন নয়। সংগঠনটির ২০২১ সালের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরগুলোতে ক্রমাগতভাবে খারাপ হয়েছে; মোট স্কোর ২০২১ সালের প্রতিবেদনে দাঁড়িয়েছে ৩৯, যা ২০২০ সালের প্রতিবেদনের স্কোরের সমান; ২০১৯ সালে ছিল ৪১। একইভাবে রাজনৈতিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা ক্রমাগতভাবে নিম্নগামী হয়েছে। রাজনৈতিক অধিকারের জন্য বরাদ্দ সর্বোচ্চ ৪০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ১৫, যা ২০১৬ সালেও ছিল ২১। ফ্রিডম হাউস বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে ‘আংশিক মুক্ত’ বলে বর্ণনা করেছে। ২০১৬ সালেও বাংলাদেশকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের গণতন্ত্রের মূল্যায়নে বাংলাদেশের স্থান ছিল পঞ্চমে। মালদ্বীপ ও পাকিস্তান ছাড়া অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের অবস্থান বাংলাদেশের উপরে। ভারত ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুধু মূল্যায়নের দিক থেকেই বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক নয়, ২০১৬ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। এ অবনতির মূল কারণ হলো বাংলাদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল সেখানে ‘গণতান্ত্রিক’ কিংবা ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, নাগরিক অধিকার, সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এসব মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি : দ্য ২০২০ ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫১তম স্থানে নেমে এসেছে, যা এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বনিম্ন অবস্থান। বাংলাদেশ যে শুধু পিছিয়েছে, তা-ই নয় বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে, এমনকি মিয়ানমারের চেয়েও! তালিকায় ৬৭ নম্বরে থাকা ভুটান এ অঞ্চলে মুক্ত সাংবাদিকতার শীর্ষে। এরপরই আছে মালদ্বীপ, দেশটির অবস্থান ৭৯। তালিকায় মিয়ানমারের অবস্থান ১৩৯, ভারত ১৪২, পাকিস্তান ১৪৫, শ্রীলঙ্কা ১২৭, নেপাল ১১২ এবং আফগানিস্তান ১২২। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি)-২০২০ এর প্রতিবেদনেও আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। বিশ্বের ১২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার প্রয়োগ, নাগরিক ন্যায়বিচার এবং ফৌজদারি বিচারে বাংলাদেশের অবস্থা হতাশাজনক। বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ মৌলিক অধিকারের দিক থেকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১২৮টি দেশের মধ্যে ১২২তম অবস্থানে রয়েছে। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে নিচে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রসফায়ার, নির্যাতনসহ ২২৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দায়ী। গত বছরের আগস্ট মাসে পুলিশের হাতে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়টি জনগণের কাছে নজিরবিহীন গুরুত্ব পায়। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লিখিত গণতান্ত্রিক দেশের জন্য পরিসংখ্যানগুলো সত্যি হতাশাজনক। মানবাধিকারের তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ কতগুলো মানবাধিকার নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। এসব বেশিরভাগ অধিকার ব্যক্তি-মানুষের অধিকার যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদার গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশকে কি পারবে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্নীত হতে!

এম. রনি ইসলাম : শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com