লেনদেন ৯৩০ কোটি টাকা

প্রীতম সাহা সুদীপ / ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৪,২০২০

হুণ্ডি ব্যবসা, স্বর্ণ চোরাকারবার ও ভূমিদস্যুতা করে এক হাজার ৫০ কোটি কালো টাকার মালিক হয়েছিলেন মো. মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ২৪টি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ৯৩০ কোটি ২২ লাখ টাকা লেনদেন করেন তিনি। এর মধ্যে ৪১২ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যাংকগুলোতে জমা রয়েছে এবং ৫১৮ কোটি ২০ লাখ টাকা বিভিন্ন সময় উত্তোলন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১১০ কোটি টাকা ঋণও নিয়েছেন মনির।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দৈনিক খোলা কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করে। সূত্র জানায়, স্বর্ণ চোরাকারবার ও ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও অবৈধ কালো টাকার পাহাড় গড়লেও মনির গত অর্থ বছরে (২০১৯-২০) আয়কর রিটার্নে তার সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছেন মাত্র ২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মাত্র ১ কোটি ৪ লাখ টাকা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, শীর্ষস্থানীয় একজন বিএনপি নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মনিরের। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ওই বিএনপি নেতার মাধ্যমে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত ও রাজউকের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলেন মনির। এরপরই শুরু হয় ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে নামে বেনামে দুই শতাধিক প্লট ও জমি নিজের কুক্ষিগত করা। আর এসব অনিয়মে তাকে সহায়তা করে গেছেন তৎকালীন রাজউক ও গণপূর্তের কয়েকজন কর্মকর্তা।

মনিরের সব অভিযোগের তদন্ত হবে ৪ সংস্থার অধীনে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ পেয়েছি, সেগুলো র‍্যাবের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয় বিধায় আমরা সরকারের চার সংস্থাকে এ বিষয়ে তদন্ত করতে অনুরোধ জানিয়েছি। র‌্যাব শুধু ফৌজদারি কার্যবিধি নিয়ে কাজ করে।

তিনি বলেন, গোল্ডেন মনির দেশের বাইরে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বা কি পরিমাণ সম্পদ তার রয়েছে, সে বিষয়ে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অনুরোধ করেছি। তিনি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে কসমেটিকস পণ্য ও চোরাচালানের মাধ্যমে কী পরিমাণ স্বর্ণ দেশে এনেছেন, সে বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুসন্ধান করতে অনুরোধ জানিয়েছি। এছাড়া অনুমোদনহীন ৫টি বিলাসবহুল গাড়ি (প্রত্যেকটি তিন কোটি টাকা মূল্যের) আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিকে (বিআরটিএ) অনুসন্ধানের জন্য বলেছি। আর জালিয়াতির মাধ্যমে সে যে ভূমি দখল করেছে সেসব বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) অনুসন্ধানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

আশিক বিল্লাহ বলেন, মনির রাজউকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ঢাকা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক প্লট ও জমি দখল করেছেন। তদন্তে তার সম্পদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। তবে মনির যে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, আর আয়কর রিটার্নে যে পরিমাণ সম্পত্তির কথা উল্লেখ করেছেন, দুটোর মধ্যে আমরা অনেক ফারাক পেয়েছি।

মনিরের বিরুদ্ধে যত মামলা
রাজউকের ৭০টি প্লটের নথি নিজ কার্যালয়ে নিয়ে আইন বহির্ভূতভাবে নিজের হেফাজতে রাখা ও ভূমি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে একটি জালিয়াতির মামলা করেছিল রাজউক। সেই মামলাটি এখনও চলমান।

এ ছাড়া জালিয়াতি ও অবৈধভাবে বিপুল পরিমান সম্পদ অর্জন করায় মনিরের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে চলমান। এ ছাড়াও ২০০৭ সালের দিকে চোরাচালানের দায়ে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি মধ্য বাড্ডার ডিআইটি প্রকল্পে নিজ বাসা থেকে ৬০০ ভরি স্বর্ণ, অস্ত্র, মাদকসহ বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও ১০টি দেশের মুদ্রাসহ মনিরকে গ্রেফতারের পর বাড্ডা থানায় আসামি করে অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে পৃথক আরও তিনটি মামলা দায়ের করে র‌্যাব। সেসব মামলায় গত রোববার মনিরের ১৮ দিনে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

মনিরের অবৈধ সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভূমিদস্যুতা ও প্লট জালিয়াতির হোতা মনির নিজের বসবাসের জন্য রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ডিআইটি প্রকল্পে বানিয়েছেন ছয়তলা আলিশান বাড়ি। এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা মিলে ডুপ্লেক্সে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। আর ওপরের তলাগুলো ভাড়া দেওয়া ছিল। তবে করোনাকালে ভাড়াটিয়ারা বাড়ি ছাড়েন। এ কারণে পুরো ভবনে শুধু মনিরের পরিবারই ছিল।

গোল্ডেন মনির বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। তার মধ্যে রয়েছে, মনির বিল্ডার্স, গার্লস অটোকারস লিমিটেড, উত্তরার গ্র্যান্ড জমজম টাওয়ার। এছাড়া স্বদেশ প্রপার্টিজের অন্যতম পরিচালকও তিনি। জমজম টাওয়ারে মনিরের মালিকানার মূল্যমান প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। বারিধারায় গোল্ডেন গিয়ার নামে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে তার। বাড্ডার ১১ নম্বর সড়কে সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের দুটি এবং দুই কোটি টাকা দামের একটি প্লট রয়েছে। এমনকি বাড্ডায় ১০ নম্বর সড়কে একটি ছয়তলা শপিং সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে। উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে মনিরসহ চারজনের অংশীদারিত্বে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ বিঘা জমি রয়েছে। এর বাইরে কেরানীগঞ্জে প্রচুর জমিজমা ও প্লট আছে। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মনিরের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য নেওয়া হয়েছিল। নানা জালিয়াতির বিষয়ে প্রমাণ মেলার পর তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com