আরএমপির প্রশাসনিক কর্মকর্তার এত সম্পদ!

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী / ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯,২০২০

রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল লতিফের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত শুরু হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আব্দুল্লাহীল কাফি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এরই মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল লতিফ আরএমপিতে যোগ দেওয়ার পর বিপুল সম্পদের মালিক হন। পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি, থানা থেকে মাসোহারা তোলা, নিয়োগ, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, মালামাল না কিনেই বিল উত্তোলন এবং ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি এসব সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবদুল লতিফ ২০০৭ সালে প্রধান সহকারী হিসেবে আরএমপিতে যোগ দেন। এ পর্যন্ত তিনি চতুর্থ শ্রেণির ১৪ জন কর্মচারী নিয়োগ করেছেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে নিয়েছেন ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা করে। আরএমপির ১২টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) অন্যদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে নেপথ্যে ভূমিকা রাখেন তিনি। এ কারণে থানার ওসিরা তাকে ‘বড় ভাই’ বলেও সম্বোধন করেন। লতিফের বিরুদ্ধে আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে প্রতিটি থানা থেকে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সূত্রটি আরও জানায়, ২০১৭ সালে লতিফ একদিনেই ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের নিজ নামীয় হিসাব থেকে ৪০ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর হিসাব থেকে ৫৮ লাখ টাকা তোলার জন্য চিঠি দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি জানতে পারলে একজন কর্মচারীর এত টাকার বিষয়ে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দেয়। ওই সময় তিনি ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে সবকিছু সামলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরএমপির এ কর্মচারীর নগরীর আলীগঞ্জ মৌজায় প্রায় দুই কোটি টাকার ১০ কাঠা জমি, কাজিহাটা মৌজায় আড়াই কোটি টাকার চার কাঠা জমি, নাটোর শহরে আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ১০ কাঠা জমি, নাটোরের বাগাতিপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে দুই কোটি টাকার ৪০ বিঘা জমি এবং ঢাকায় দুই কোটি টাকার দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া নামে-বেনামে রাজশাহী শহরে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি।

দরপত্র আহ্বান করলেও সকল ঠিকাদারকে শিডিউল না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে লতিফের বিরুদ্ধে। তিনি ২০১৫ সাল থেকে বেশিরভাগ মেরামত ও সংস্কার কাজ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা থেকে শুরু করে আরও অনেক কাজ চারঘাটের সারদার আবদুর রহমান মুন্না নামে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে করছেন। এ ঠিকাদারের পরিবারের সদস্যদের নামে ১০-১২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি জালিয়াতি করে এ ঠিকাদারকে তিনি কাজ দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে লতিফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। কিন্তু তিনি এখনো আরএমপিতে বহাল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত আরএমপিতে মেরামত ও সংস্কার কাজ হয়েছে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হয়েছে ১১ কোটি টাকার। এসব মেরামতে ব্যয় করা হয়েছে ৫৭ লাখ টাকা। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, মেরামত ও সংস্কার কাজের ৩০ ভাগ কাজ করে বাকিটা লুটপাট করেছেন লতিফ ও তার মনোনীত ঠিকাদার। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়েছে বাজারদরের চেয়ে অধিক মূল্যে। আর্চওয়ে গেটের বাজার মূল্য ৭০ হাজার টাকা থাকলেও শিডিউল মূল্য ছিল তিন লাখ ২০ হাজার টাকা। সাড়ে তিন হাজার টাকার সিসি ক্যামেরার শিডিউল মূল্য ছিল ১২ হাজার টাকা। এছাড়া ৫০-৫২ হাজার টাকা দামের কম্পিউটার কেনা হয়েছে ৯৮ হাজার টাকায়।

সূত্র আরও জানায়, প্রিন্টারের কালির শিডিউল মূল্য ছয় হাজার টাকা। লতিফ প্রতি মাসে ৫০টি কালির বিল করেন তিন লাখ টাকা। অথচ নতুন কালি না কিনে রিফিল করেন ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ কালির নামেই প্রতি মাসে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন লতিফ। প্রতি মাসে অন্যান্য স্টেশনারি সামগ্রীর বিল করেন ৪-৫ লাখ টাকা। আর মালামাল কেনা হয় বড়জোর ৭০-৮০ হাজার টাকার। এগুলো পত্রবাহক আজিজুল ইসলামকে দিয়ে কেনান। এজন্য প্রতি মাসে তাকেও ১৫ হাজার টাকা দেন লতিফ।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯-২০ সালে টাঙ্গাইলের ঠিকাদার মো. শাহিনের সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যবসা করেন লতিফ। ২০১৫ সালে ৭০ লাখ টাকার ওষুধ না কিনে টাকা আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হলে পুলিশ সদর দফতর হাসপাতালের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্টকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে বদলি করে। আর আরএমপির প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল লতিফকে টেন্ডার এবং কেনাকাটা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে লতিফ আছেন একই দায়িত্বে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে লতিফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই আগেই চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু চিঠি পড়ে লতিফের হাতেই। তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। সম্প্রতি আরেকটি টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে গত ৯ আগস্ট একটি নির্দেশনা জারি করে পুলিশ সদর দফতর। এতে বিভাগীয় মামলা অথবা বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য বলা হয়। বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার আবদুস সালামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি তদন্ত করছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে আবদুল লতিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি কথা বলতে চাননি।

আরএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, আবদুল লতিফের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে তদন্ত শেষেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে পুলিশ সদর দফতর।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com