কলাবাগানটি বাসন্তীর নয়

তানজেরুল ইসলাম, টাঙ্গাইল থেকে ফিরে / ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯,২০২০

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার টেগামারি এলাকায় বনে অবৈধভাবে সৃজিত কলাবাগান উচ্ছেদকেন্দ্রিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর কলাবাগানটি উচ্ছেদের পর ওই এলাকাসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকজনের সঙ্গে বন বিভাগের দীর্ঘদিনের বিরোধে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
বাসন্তী নামের একজন আদিবাসী নারীর ছবিসহ ওই কলাবাগানের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বনভূমি রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠে বন বিভাগ। অন্যদিকে পূর্বপুরুষ থেকে কৃষিকাজে ব্যবহৃত বনভূমি দখলে রাখতে আন্দোলনে নেমেছেন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকজন।

টাঙ্গাইল বন বিভাগের দোখলা রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ জানান, টেগামারি এলাকায় বনের জমিতে সৃজিত ওই কলাবাগানটির মালিক বাসন্তী নন। চলতি বছর ৪০ শতাংশ বনভূমি বাসন্তীর কাছ থেকে সহিদ মিয়া লিজ নিয়ে কলাবাগান সৃজন করেন। অবৈধ এই লিজকা- ঘটিয়ে বাসন্তী হাতিয়ে নিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা।

রেঞ্জটির দোখলা সদর বিটের বনভূমি জবরদখল তালিকায় বাসন্তীর নাম রয়েছে। বাসন্তী ওই এলাকায় অন্তত সাত একর বনভূমি দখল করে রেখেছেন। মধুপুরের একাধিক প্রভাবশালী মহল আদিবাসীদের আন্দোলনে নামিয়ে বন দখল পাকাপোক্ত করতে সক্রিয় হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বন বিভাগের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের উসকে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

অন্যদিকে বাসন্তী বলেন, কলাবাগান উচ্ছেদ করায় আমার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এক লাখ টাকা। কলাবাগান সৃজন করা ওই বনভূমিতে বিগত দিনে কি ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে বাসন্তী বলেন, ‘বিগত দিনে সেখানে বড় বড় গাছ ছিল। এখনো কিছু আছে।’ এ ছাড়া তিনি ওই ৪০ শতাংশ বনভূমি সহিদকে লিজ দেননি বলে দাবি করেন।

অনুসন্ধান বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দোখলা রেঞ্জের দোখলা সদর বিটের অরনখোলা মৌজার ১৩ নম্বর সিএস দাগে ঔষধি বাগান ছিল। পরবর্তী সময়ে টেগামারি গ্রামের ওই ঔষধি বাগানটি বিনাশ করে চাষাবাদ শুরু করেন বাসন্তী। চলতি বছরের ১৫ মে বাসন্তী তার দখলে রাখা ৪০ শতাংশ বনভূমি পাশ্ববর্তী শোলাকুড়ী গ্রামের মৃত আছর আলীর পুত্র মো. সহিদ আলীর কাছে তিন বছরের জন্য লিজ দেন।

বাসন্তীর স্বাক্ষর সংবলিত লিজ প্রদানের ওই চুক্তিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, বাসন্তী তার খাস দখলস্বত্ব ভূমি থেকে ৪০ শতাংশ ভূমি মো. সহিদ আলীকে লিজ দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং মো. সহিদ আলী বনভূমি লিজ গ্রহণ করেন।

অনুসন্ধান আরও বলছে, গেল ১৪ সেপ্টেম্বর কলাবাগানটি উচ্ছেদের সময় ঘটনাস্থলেই বন বিভাগের লোকজনের ওপর হামলা চালান বাসন্তীর স্বামী গেটিসের নেতৃত্বে অন্তত ৫০-৬০ জন। এ সময় হামলাকারীরা রোপণের জন্য নিয়ে যাওয়া এক হাজার সরকারি চারাগাছ লুট করেন ও দিনমজুর জাহাঙ্গীর মিয়াকে প্রহার করে।

এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. জামাল হোসেন তালুকদার, রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল আহাদসহ বন বিভাগের লোকজনকে ধাওয়া দেন হামলাকারীরা। পরে বন বিভাগের লোকজন দোখলা বন বিশ্রামাগারে আশ্রয় নিলে সেখানে তাদের তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন হামলাকারীরা।

এক পর্যায়ে হামলাকারীরা বন প্রহরীদের স্টাফ কোয়ার্টার ও সরকারি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে মধুপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অবরুদ্ধ বন বিভাগের লোকজনকে উদ্ধার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বনদস্যুরা আদিবাসীদের উসকে দিচ্ছে
হাবিবুন নাহার
বন উপমন্ত্রী

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার বলেছেন, টাঙ্গাইলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের বন বিভাগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামিয়ে যারা বন লুটের পরিকল্পনা করছেন তারা আওয়ামী লীগের কেউ না। এই সুবিধাবাদী চক্রগুলো সব সরকারের আমলেই বন হরিলুটের চেষ্টায় মত্ত থাকে।

গতকাল শুক্রবার দৈনিক খোলা কাগজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, এমন কিছু বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও আছে যারা আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে বন লুটের পরামর্শ দিয়ে উল্টো তাদের ব্যবহার করে বহির্বিশ্বে  বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব সংস্থা বিদেশি সাহায্য চায়। এ ছাড়া তারা খাবে কি।

বন সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বন রক্ষায় কঠোর না হলে গুটিকয়েক বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তেমন কিছুই করার থাকে না। আমি স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় বারবার এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। একদিকে জবরদখলকারী আর একদিকে জনপ্রতিনিধিদের চাপ। বন বিভাগ যাবে কোথায়। টাঙ্গাইলে বনভূমি রক্ষায় কিছু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সহযোগিতা করছেন না।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজারে এক ফরেস্টার বনদস্যুদের হামলায় নিহত হয়েছেন। ঢাকা সাভারে এক সহকারী বন সংরক্ষকের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা বন রক্ষায় আরও কঠোর না হলে প্রাণ দিয়েও বনভূমি রক্ষা করা সম্ভব নয়। আদিবাসীরাও তো এদেশের নাগরিক। কিছুই কি বলা যাবে না। বন ধ্বংস করে তারা কি যা ইচ্ছা তাই করবে।


বনভূমি রক্ষায় কঠোর অবস্থানে বন বিভাগ
ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক
টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা

সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক বনভূমি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে টাঙ্গাইল বন বিভাগ। আদিবাসীরা বহু বছর ধরেই বন ভোগ করছে। তবে ধীরে ধীরে তারা দখলের সীমানা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই কলাবাগানটি সহিদ মিয়ার, বাসন্তীর নয়। বাসন্তী অবৈধভাবে ৪০ শতাংশ বনভূমি সহিদের কাছে লিজ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক।

গতকাল শুক্রবার দৈনিক খোলা কাগজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বন বিভাগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আদিবাসীদের উসকে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল। আদিবাসী বলেই যে তারা বন দখল করবে আর বন বিভাগ কি বসে থাকবে। আদিবাসীরাও তো এদেশের নাগরিক। আদিবাসীরা কি আইনের ঊর্ধ্বে। তারা বনভূমির ক্ষতি করলে বন বিভাগ কি বন আইনে ব্যবস্থা নেবে না। আদিবাসীরা অন্যায় করলে তাদের কি জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে না। বনদস্যু একটি চক্র বাসন্তীকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। আমরা সহিদের জবরদখল উচ্ছেদ করেছি, বাসন্তীর নয়।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছর মধুপুর ধানাধীন বিভিন্ন এলাকায় ১৭০ একরের বেশি বনভূমি জবরদখল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। চলতি বছর দোখলা রেঞ্জে কমপক্ষে ৭০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। দোখলা রেঞ্জে ১৯ হাজার ৮৩৪ একর বনভূমির মধ্য ১২ হাজার একর জবরদখল আছে। কলাবাগানটি উচ্ছেদ কার্যক্রম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে।

আমরা তো কোনো স্থাপনা উচ্ছেদ করিনি যে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হবে। বাসন্তীর অবস্থান আগে যেখানে ছিল বর্তমানে সেখানে নেই। ধীরে ধীরে তিনি জবরদখলের আয়তন বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি যেখানে আছেন সেখানে থাকুক। নতুন করে জবরদখলের চেষ্টা করলে আমরা তো আর বসে থাকব না। আমরা আতঙ্কিত নয়। সরকারি গাইড লাইন মোতাবেক আমরা বনভূমি রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com