অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা

আখতার হোসেন আজাদ / ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬,২০২০

বৈশ্বিক আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার। ঘরে বসে ইচ্ছেমতো কেনাকাটা, পণ্য পছন্দ করা, তা সম্পর্কে বিস্তারিত সহজেই জানতে পারা এবং যানজট এড়িয়ে দোকানে ঘুরে ঘুরে ক্লান্তি করে পণ্য কেনার চেয়ে ঘরে বসে খুব সহজেই পছন্দের পণ্য ক্রয়ের সহজলভ্যতার জন্য ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইনে কেনাকাটা পদ্ধতি।

অনলাইনে কেনাকাটা সাধারণ মানুষের জীবনে যেমন স্বস্তি বয়ে এনেছে তেমনই বিপরীতে রয়েছে অস্বস্তির নীল নিঃশ্বাস। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে প্রতারণার নিত্য নতুন কৌশল। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অসদুপায় পন্থা অবলম্বনের জন্য এই খাত কলঙ্কিত হচ্ছে। তাই প্রতিনিয়ত ক্রেতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। হচ্ছেন প্রতারিত। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব) ভিত্তিক গড়ে ওঠা এসব অনলাইন বাজার থেকে পণ্য ক্রয়ের পর দেখা যায়, পণ্যের রঙ এবং গুণগত মান যেভাবে বর্ণনা করা থাকে ক্রেতার নিকট যখন পণ্যটি পৌঁছে তখন দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্ণনার সঙ্গে মিল থাকে না। কখনো বা পণ্যের অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করেও পণ্য না পাওয়া, পণ্য পেলেও তা ত্রুটিযুক্ত হওয়া এমন হাজারো অভিযোগ অনলাইনে পণ্য ক্রেতাদের থেকে পাওয়া যায়। কোনো ক্রেতা যদি একবার প্রতারিত হয় বা আস্থা হারিয়ে ফেলে তাহলে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থার ওপর সামগ্রিকভাবেই আস্থা হারিয়ে ফেলে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমূহে বিশেষ করে ফেসবুকে নামে-বেনামে বিভিন্ন পেজ খুলে চলছে অনলাইন কেন্দ্রিক ব্যবসা। বিশেষ করে দেশের তরুণ যুবসমাজ এদিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকেছে। গত কয়েক বছরে হাজার হাজার উদ্যোক্তা অনলাইন মার্কেট তৈরি করে ব্যবসা আরম্ভ করেছে। বর্তমানে পাগলা ঘোড়ার মতো এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাকরির পেছনে না ছুটে কিংবা শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি অবসর সময় নষ্ট না করে উদ্যোক্তা হওয়ার এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতারণার মাত্রা বেড়ে যখন লাগামহীন হয়ে পড়ে, তখন সেটির ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিক ফুটে উঠে বেশি।

অনলাইনে কেনাকাটায় বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও প্রতারণার অভিনব কৌশল হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘বিস্তারিত জানতে ইনবক্স করুন’ পদ্ধতি। ফেসবুকে পেজ বা গ্রুপ খুলে কেবলমাত্র পণ্যের ছবি ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ক্যাপশন দিয়ে আপলোড করা হচ্ছে। কমেন্টবক্সে কেউ পণ্যের মূল্য জানতে চাইলেই পণ্যের বিজ্ঞাপনদাতা তাতে উত্তর দেন বিস্তারিত জানতে ইনবক্স করুন। ফেসবুক পেজে বা গ্রুপে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে পরিচিত বেশ কয়েকজনকে এমনটি করার কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলাম। প্রত্যেকেরই প্রায় একই উত্তর। অনলাইন ব্যবসার এটিই নাকি নিয়ম। আর সিনিয়ররা এমনটি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি গ্রুপে পণ্যের দাম প্রকাশ্যে বললে নাকি এডমিন কর্তৃক ব্যান করেও দেওয়া হয়।

তবে এসবের পেছনে যে প্রতারণার বিস্তর জাল রয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। এমনটি করা হয় মূলত পোস্টে কমেন্ট সংখ্যা বৃদ্ধি করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য। আবার একেকজনের থেকে একই গুণগত মানের পণ্যের ভিন্ন রকম মূল্য আদায়ও থাকে অন্যতম উদ্দেশ্য। অথচ বর্তমান সরকারের পাস করা ‘ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯’ এর ৩৮ ধারায় পণ্যের দাম সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে না রাখলে ১ বছরের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হওয়ার বিধান রয়েছে।

আরেকজন অনলাইন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি আমার সঙ্গে প্রায় খোলামেলা আলোচনা করলেন। তার ভাষ্যমতে অনলাইনে কোনো পণ্যের মূল্য প্রকাশ্যে না বলার কারণ হলো তৃতীয় বা চতুর্থ ব্যক্তির মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করা। ধরুন মূল উৎপাদনকারী একটি পণ্যের বিক্রয়মূল্য ধার্য করেছে ১০০ টাকা। সে আরেকজনকে বলল ১০০ টাকার অধিক মূল্যে বিক্রয় করতে পারলে বাকিটুকু তোমার লাভ। দ্বিতীয় ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তির সঙ্গে একই চুক্তি করল। সে হয়ত ১২০ টাকার অধিক মূল্যে বিক্রয় করলে অতিরিক্ত মূল্য তৃতীয় ব্যক্তির লাভ হিসেবে দেওয়ার চুক্তি করল। আবার এদের প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন নামে ফেসবুক পেজ খুলে অভিন্ন পণ্য বিভিন্ন দামে বিক্রয় করছে। এভাবেই তৈরি হচ্ছে অনলাইনে উদ্যোক্তা। অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। আবার কেউ কেউ সামাজিকমাধ্যম সমূহে লাইভে এসে পণ্যের বিস্তারিত বর্ণনা করলেও পণ্যের মূল্য প্রকাশ্যে বলেন না।

ভোগান্তির শেষ এখানেই নয়। ইনবক্সে পণ্য সম্পর্কে মেসেজ আদান-প্রদানের পর বিক্রেতা থেকে প্রস্তাব করা হয় পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য এবং কুরিয়ার চার্জ সম্পূর্ণ অথবা অর্ধেক অগ্রিম পরিশোধ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, টাকা দেওয়ার পর ক্রেতার ফেসবুক আইডিকে ব্লক করে দেওয়া হয় বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য সরবরাহ করা হয়। কাক্সিক্ষত মানের পণ্য না পেয়ে ক্রেতা পেইজের ইনবক্সে অভিযোগ করলে তার আইডি ব্লক করে দেওয়া হয় এবং নারী ক্রেতা হলে তার নাম ও ফোন নম্বর ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এসব পেইজের সঠিক ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেওয়া থাকে না বলে প্রতারণার সুরাহা পাওয়ার জন্য যথাযথভাবে কোনো পদক্ষেপও নেওয়া যায় না। অথচ ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার আইনের ৪৪ ধারায় উল্লেখ আছে, পণ্যের মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করলে অনধিক ১ বছর কারাদ- বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হতে পারেন। ৪৫ ধারা অনুযায়ী, ক্রেতার সঙ্গে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা সরবরাহ না করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদ- বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দন্ডে দ-িত হতে পারেন।

প্রতারণার হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো দেশে এখনো অনলাইন ব্যবসার নীতিমালা তৈরি হয়নি। এতে একদিকে যেমন প্রতারণার মাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের কল্যাণে অনলাইনে কেনাকাটার যে ধারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে তা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এই খাতটি আরও সম্ভাবনাময়। কারণ শহরে যেসব পণ্য সচরাচর পাওয়া যায় গ্রামে তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গ্রামে অনেক মানুষ আছেন যাদের ক্রয় ক্ষমতা রয়েছে। কারণ হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিটেন্স আসে যার অধিকাংশ গ্রামে বা ছোট শহরে যায়। একইভাবে গ্রামের মহিলারাও সূচিশিল্পে বেশ পারদর্শী। নকশি কাঁথা, চাদর প্রভৃতি অনলাইনের মাধ্যমে সহজেই বিক্রয় করতে পারেন। তবে প্রথমেই খাতটিতে শৃঙ্খলা আনতে হবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে পণ্য বিক্রির সুযোগ পেতে হলেও বিক্রেতাকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আনুষঙ্গিক তথ্য দাখিল করতে হয়। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাইয়ের পরই একজন বিক্রেতাকে পণ্য বিক্রির জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যে কেউ ইচ্ছে করলেই অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞাপন দিতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ফেসবুক পেজ খুলে স্পন্সর করে (ফেসবুক পেজ বুস্ট) সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অনেকেই পণ্য বিক্রয় করছেন, যাদের অনেকের মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। যার ফলে সৎ উদ্যোক্তারা অনলাইন বাজারে আস্থাহীনতার জন্য পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো একটি পণ্য সাধারণ বাজারে যে মূল্যে বিক্রয় হয়, তার থেকে অনেক বেশি মূল্যে বিক্রয় করে থাকে অনলাইন ব্যবসায়ীরা। আবার একই পণ্য বিভিন্ন ব্যক্তি অসঙ্গতিপূর্ণ বিভিন্ন মূল্যে বিক্রয় করে থাকে।

ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব ভোগান্তি দূর করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা অতীব প্রয়োজন। যারা ব্যবসা করতে বা উদ্যোক্তা হতে চান, তাদেরকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কিংবা সরকারের নির্ধারিত অধিদফতর থেকে নিবন্ধন করতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। উদ্যোক্তার জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিস্তারিত তথ্য সরকারের তথ্য ভা-ারে রাখতে হবে। কোনো প্রকার শর্ত ছাড়া পণ্য হাতে পাওয়ার পরে মূল্য পরিশোধের সুব্যবস্থা করতে হবে। বিবরণ অনুযায়ী পণ্য না পেলে কিংবা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য পেলে তা সহজেই ফেরত নিয়ে পরিবর্তন করে দিতে হবে এবং পণ্য পরিবর্তনের যাবতীয় খরচ বিক্রয়কারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।

ক্রেতা প্রতারিত হলে অভিযোগ করার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং অভিযোগটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। তবেই অনলাইনে প্রতারণার করাল গ্রাস থেকে ভোক্তারা মুক্তি লাভ করবে। একই সঙ্গে এই খাতে সর্বসাধারণের আস্থা ফিরে আসবে।

উন্নত দেশসমূহ ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপকতর উন্নতি লাভ করেছে। সময় ও শ্রম কম দিতে হয় বলে এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশা ত্যাগ করে সেবাদানের মানসিকতা তৈরি করলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থার আরও জনপ্রিয়তা অর্জন করানো সম্ভব। অধিক ঘনবসতিপূর্ণ আমাদের এই বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদিত পণ্য পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে একদিকে যেমন বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব; তেমনই বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুসম্পর্কও গড়ে তোলা সম্ভব।

আখতার হোসেন আজাদ : কেন্দ্রীয় প্রচার ও সাহিত্য সম্পাদক
কনজুমার ইয়ুথ বাংলাদেশ (সিওয়াইবি) ও
শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com