রাসেলের সাইকেল

মালেক মাহমুদ / ১২:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২,২০২০

পিচঢালা পথ ধরে ছুটে চলা একটি সাইকেল। সাইকেলটি শুধু সাইকেল নয়। একটি ইতিহাস। একটি স্বদেশযাত্রার শিশুর স্বপ্ন। রাসেলের সাইকেল। সাইকেলটি একদিন রাসেলকে হারিয়ে, হঠাৎ থমকে গেল। বড্ড একা হয়ে গেল। সাইকেল ত আর একা চলতে পারে না। সাইকেলকে চালাতে হয়। রাসেলের সাইকেল চলত রাসেলের পায়ের পরশে। ঘুরত প্যাডেল। ঘুরত সাইকেলের চাকা। এগিয়ে চলত সাইকেল। আনন্দ অনুভব করত শেখ রাসেল।

এখন আর সাইকেলের চাকা ঘুরছে না। যে সাইকেলটি ছোটাছুটি করে সুখ বিলাত, সেই সাইকেলটি এখন একা, বড্ড অসহায়। একা পড়ে আছে বাড়ির আঙিনায়। রাসেল আর ফিরে আসছে না। কেন ফিরে আসছে না তাও জানছে না সাইকেল। রাসেলের অপেক্ষায় প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। কারও অপেক্ষায় প্রহর গোনা খুবই কষ্টের কাজ। সেই কষ্টের কাজটি করে যাচ্ছে রাসেলের সাইকেল। কখন আসবে প্রিয় শেখ রাসেল! কখন ঘুরে বেড়াবে প্রিয় মানুষের সঙ্গে।

দিন যায়। রাত যায়। মাস যায়। বছর যায়। যুগের পরে যুগ পার হয়ে যায়। সাইকেল দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। আর রাসেলের কথা মনে করছে। একদিন সাইকেলের পাশে দুটি পাখি এসে বসল। একটি পাখি অপর পাখিকে বলছে- এই সাইকেলটি দেখছ, এটি শেখ রাসেলের।
তাই?
হ্যাঁ।
শেখ রাসেলকে তো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কত কাকুতি মিনতি করেছে রাসেল।
এমন সময় একটি লোক চলে এলো। পাখি উড়ে গেল। সাইকেল বুঝতে পারল রাসেল আর বেঁচে নেই। সাইকেলের মনে দুঃখ ভর করল। কিন্তু দুঃখ করে কী করবে সাইকেল। তার দুঃখ ত কেউ শুনবে না। তাই সাইকেল মনে করছে শেখ রাসেলের জন্য কিছু করার দরকার। কিছু একটা করতে চায় সে। কিন্তু কী করবে ভেবে ঠিক করতে পারছে না। মনে করছে এমন একটি কথা। যে কথার ভেতরে শেখ রাসেলকে যারা ভালোবেসেছে তাদের কথা থাকবে। যারা অসহায় তাদের কাছে সহায়কের ভূমিকায় কিছু করতে পারলেই, তাদের ভালোবাসার মাঝে বেঁচে থাকবে শেখ রাসেল।
আর রাসেলের ভালোবাসার ভেতরে বেঁচে থাকবে রাসেলের সাইকেল। সাইকেল এবার সজাগ হতে চায়। জাগতে চায়। জাগাতে চায়। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়।
শেখ রাসেল ভালোবাসত শিশুবেলার বন্ধুদের। অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে। তাই সাইকেল রাসেলকে হারিয়ে তার ভালোবাসার মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চায়। সহায়ক হতে চায় তাদের কাছে। কিন্তু কীভাবে সহায়ক ভূমিকা রাখবে সাইকেল। কীভাবে থাকবে তাদের মনের মাঝে। সাইকেল কীভাবে ছড়িয়ে দেবে রাসেলের ভালোবাসা। সাইকেল ভাবছে, রাসেলকে যে ভালোবাসবে আমি তার বাহন হব। অসহায়ের সহায় হব। যে চিন্তা সেই কাজ, ভালোবাসার মানুষ খুঁজতে লাগল গ্রামীণ পথ ধরে। খুঁজে পেল মোতালেব মোহনকে। বেশ চটপটে ছেলে। নতুন কিছু জানার ইচ্ছে ভীষণ। এই মিষ্টি হাসির ছেলেটি জন্মেছে অজপাড়ায়। সেই অজপাড়ায়ও এখন পাকা পথ।
গ্রামীণ পরিবেশ ভালো লাগে মোতালেব মোহনের। বাড়ির সকলেই তাকে মোতালেব বলে ডাকে। গাঁয়ের ধুলোবালি আর সবুজ অরণ্যে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় মোতালেব। পাখির সঙ্গে গড়ে তোলে ভাব-ভালোবাসো। কোন ডালে কী পাখি বাসা বেঁধেছে সেই খবর রাখে নিয়মিত। পাখি নিয়ে সর্বদাই ছোটাছুটি। একটি ঘুঘু পাখির ছানা খুঁজে পায় মোতালেব। সেই ছানাটি খাঁচায় পুষতে চায় আপন মনে। তাই একা একা পাখির সঙ্গে কথা বলে। আনন্দে মন ভরে ওঠে। সুখের পরশ নিতে রাতে বাবার কোলে মাথা রেখে ঘুমায়।
বাবা গল্প বলেন, মোতালেব কান পেতে শোনে। বাবার কাছে গল্প শোনে দেশকে ভালোবাসতে শেখে। বাবার গল্পে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথা ফুটে ওঠে। ভালোবাসতে শেখে জাতির পিতাকে।
যার জন্য আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। এই গল্প শুনতে শুনতে কখন যে মোতালেব ঘুমিয়ে পড়ে তা মোতালেব বলতেই পারবে না। এভাবেই বেড়ে উঠছে মোতালেব। বাবা মোতাহার মোহন সহজ-সরল মানুষ। ছেলেকে লেখাপড়া করে বড় করবেন এই তার ইচ্ছে। তাই ভর্তি করে দেয় স্কুলে।
মোতালেবের স্কুলের সহপাঠী সোহাগ শোভন। দুজনে একসঙ্গে ছুটে যেত স্কুলে। বেশ পথ দুজনে হেঁটেই যেত। মজার মজার গল্প হত। সুন্দর সময় পার হত দুজনের।
১৮ অক্টোবর সোহাগ শোভনের জন্য আনন্দের আর মোতালেব মহনের জন্য বেদনার। সোহাগের বাবা সোহাগের জন্য একটি সাইকেল কিনে দিয়েছেন। সোহাগের বাবা বিদেশে থাকেন তাই সোহাগের আবদার পূরণ করেছেন অতি সহজেই। মোতালেব তার বাবার কাছে সাইকেল কিনে দিবে বলবে এমন সাহস তার ছিল না। মোতালেবের পড়ার খরচ চালানোই ছিল বাবার জন্য কষ্টের।
সোহাগ শোভন যেত সাইকেল চালিয়ে আর মোতাহার মহন স্কুলে যেত পায়ে হেঁটে। স্কুল আঙিনায় আলোচনা সভা হচ্ছে শেখ রাসেলের জন্মদিনকে ঘিরে। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শেখ রাসেল। তার ছিল একটি প্রিয় সাইকেল। বাড়ির আঙিনায় সাইকেল চড়ে ঘুরে বেড়াত। বাড়ির সবাই তাকে আদর করত। বড় আপু শেখ হাসিনার কোলে বেড়ে উঠছিল। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের প্রতিটি আঙিনায় ছিল বিচরণ। তখনো সাইকেল ছিল তার সঙ্গী। তাই সাইকেলও শেখ রাসেলকে ভালোবেসেছিল। সেই নিষ্পাপ শিশুটিকেও ১০ বছর বয়সে ১৫ আগস্টে ঘাতকরা গুলি করে হত্যা করেছিল। হত্যার পূর্বে বারবার কান্না কান্না কণ্ঠে শেখ রাসেল বলেছিলÑ আমি আমার মায়ের কাছে যাব।
হৃদয়হীনদের মন গলেনি। উল্টো গুলি করে হত্যা করে। রক্তে লাল হয় আঙিনা। ক্ষতবিক্ষত হয় সাধারণ মানুষের মন।
এই কথাগুলো শুনে মোতালেবের মন কেমন যেন হয়ে গেল। ভাবতে লাগল শেখ রাসেল যদি বেঁচে থাকতেন। আমরা পেতাম তার ভালোবাসা। রাতে মোতালেব মোহন বাবার সঙ্গে শেখ রাসেলের কথা আলাপ করে। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। দেখে শেখ রাসেল তাকে ডাকছে। বলছেÑ মোতালেব, ওঠ। চেয়ে দেখ সকাল হয়েছে। মোতালেব ঘুম থেকে ওঠে দেখে একটি সাইকেল। সামনে লেখা, রাসেলের সাইকেল।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com