অশেষের শেষ

শাহেদ জাফর হোসেন / ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪,২০২০

একদিন বিকেলবেলা তাদের কথা হচ্ছিল মাঠের শেষভাগে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছটার তলায়। তখনই শফিকের গলায় সুর বেজে ওঠে, ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ।’

মুগ্ধতা যখন রুনুকে ঘিরে ধরে, তখন শফিক অনুনয় মাখানো কণ্ঠে বলে, খুব চাপ দিচ্ছে মা। বলেছে বউ ঘরে আনবে। পূর্বপাড়ার রশিদ কাজীর মেয়ে। বাপের জমিজমা আছে, বছরে ধান হয় তিনবার। গরু-বাছুরেরও অভাব নাই। আমাকে তুই ক্ষমা করে দে রুনু, ভুলে যাস আমাকে। মায়ের কথা ফেলতে পারি!

শফিকের কথা শুনে চোখে পানি চলে আসে রুনুর। ভাগ্যিস সন্ধ্যা নেমে এসেছিল চারপাশে। মুখ আড়াল করে চোখ দুটো মুছে নেয় লাল ওড়নায়। দূরে ভাসমান মেঘ, নীড়ে ফেরা ডানা ঝাপটানো পাখি আর ঘরে ফেরা হাটুরে মানুষের দিকে তাকিয়ে রুনু বলে ওঠে, ভালো থাকবেন তাহলে। সুখী হইয়েন সংসারে, খুব সুখী।
কথাগুলো বলতে গিয়ে বুকটা বারবার কেঁপে উঠছিল রুনুর। সব হারিয়ে চারপাশটা যেন শুন্য মনে হচ্ছে। অন্ধকার নামেনি তখনো। রুনুর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এক দৌড়ে চলে যেতে সেখান থেকে। জমির আলপথ ধরে আলতা দীঘির পাড়ে গিয়ে সারারাত বসে থাকতে। কিন্তু পায়ে যেন শিকড় গজিয়ে গেছে। অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়েই আছে যেন এই মাঠে। সেও যেন একাকী দাঁড়িয়ে থাকা আর কদম গাছ।

শফিক ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। পাখিরাও তো ঘরে ফেরে। শুধু ঘরে ফেরার ইচ্ছে জাগে না রুনুর। এই মাঠ, ফসলের খেত, গোধূলি বেলা, বয়ে চলা করতোয়া নদী। এসবই তার আপন। যেন বহুকালের পরিচিত। যাকে আপন ভাবতে শিখেছিল সেই তো সব থেকে পর ছিল এতদিন। বুঝতে ভুল হয়েছিল তাকে। সে যে অন্য মানুষ।

যাই তাহলে। নীরবতা ভেঙে বলে তাড়া দেয় শফিক।

রুনু শুধু মাথা নাড়ে। যে যাওয়ার সে তো যাবেই। আটকানোর সাধ্য সবার কি কখনো হয়? রুনু পা বাড়ায় ঘরের দিকে।

ঘরে ফিরে খিল আটকে দেয় কপাটের। অসময়ে দরজা বন্ধ দেখে চিন্তিত হয়ে ওঠেন মা। ছোট ভাইটাও কয়েকবার এসে ঘুরে যায় দরজা থেকে। রুনু দরজা খোলে না। দরজার ওপাশ থেকেই বলে দেয়- আজ রাতে আর কিছু খাবে না। কেউ যেন আর বিরক্ত না করে।

তবুও ছোট ভাইটা আবার আসে। বুবু তো এমন করেনি কোনোদিন!
-বুবু, ভাত খাবা না?
-না।
-ক্যান?
-খিদা নাই, তাই।
-কদমতলায় তুমি গেছ আজ বুবু?
-না।
রুনু চুপ হয়ে যায়।
রাত বাড়তে থাকে। রুনু শুয়ে শুয়ে ভাবে মানুষটা এমন করল কেন। মানুষ চিনতে তার কি ভুল হয়েছিল কোথাও। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। শেষরাতে দু-তিনবার দরজায় টোকার শব্দে ঘুম ভাঙে রুনুর।
ফিসফিস করে কে যেন ডাকছে।
-রুনু, এই রুনু।
শফিকের গলা। এত রাতে!
-দরজা খোল। আমাকে ক্ষমা করে দে রুনু। শফিকের কন্ঠ নিচে নেমে যায়।
-ঘর ছেড়ে এসেছি একেবারে। ভোরের ট্রেনে আমরা এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাব। দূরে। প্রথমে ঢাকায়, তারপর যেদিকে ইচ্ছে হয়। আর আসব না। ট্রেনের সময় হয়ে এল, চল তাড়াতাড়ি। কেউ দেখে ফেলবে আবার!
-না। রুনুর কণ্ঠে দৃঢ়তা। আমি যাব না কোথাও। কোথাও না। আপনি বাড়িতে যান।
রুনু দরজা লাগিয়ে দেয়। খারাপ লাগে না মোটেই। বিছানায় গিয়ে বসে পড়ে। একগ্লাস পানি খায়।
শফিক নামটা তার জীবনে এখন থেকে অতীত। যে মানুষ তাকে দিনের আলোয় ঘরে বউ করে তোলার সাহস পায়নি, তার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে ঘর ছাড়ার ইচ্ছে হয় না। রুনুর মাথাটা হালকা হয়ে যায়। অনেকক্ষণ ধরে যে বোঝাটা চেপে বসেছিল তা নেমে যেতে শুরু করে। দরজা খুলে বাইরে আসে রুনু।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে চারপাশে।
এমন ভোর অনেকদিন দেখেনি। চারপাশটা হুট করে যেন ভালো লাগায় ভরে ওঠে তার।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com