পুষ্পের বিলাপ

ইমরুল কায়েস / ৭:৩০ অপরাহ্ণ, মে ১৪,২০২০


টুপ করে ঝরে পড়ল; এখনো পড়ছে...।
পাতাবাহার হা করে দেখছে। একে একে জুঁই, গন্ধরাজ, শিউলি, কামিনী, বেলী, রঙ্গন, সন্ধ্যামালতী, নয়নতারা, বাগানবিলাস, রজনীগন্ধ্যা, মাধবীলতা, ঝরনা, গোলাপ, হাসনাহেনা, অলকানন্দা, অপরাজিতা, গাঁদা, দোলনচাঁপা, রক্তজবা, জবা, বকুল, সবার পাতা-পাপড়ি টুপটুপ করে ঝড়ে পড়ছে। সাতদিন থেকে কেউ পানির স্পর্শ পাচ্ছে না।
পাতাবাহার পাশের ছোট করবী চারাকে বলছে- নাতি, আশপাশে হচ্ছেটা কী রে?
-হুনলাম ঢাকায় লোকডাউন হইছে!

কথা কেড়ে নিয়ে পাশের কৃষ্ণচূড়া বলে উঠল- লোকডাউন ওইডা না রে কেলা; -এডা হইল লকডাউন আংকেল, ওয়াটারপ্লানকে জিগান বাহার দাদা।

পাতাবাহার ওয়াটার প্লানকে ডাকল- এই হালা, ওয়াটার?
-পুরা নার্সারিতে তো তুই আর তোর লেজ! হাসনাহেনাকে বলেক দাদা সালাম দিছে; আর হোন আসতে না পারলে জিগাইস, যে ঘটনা কী চারপাশ এমন তবদা মারছে কেন?
-চারপাশের মানুষজন হঠাৎ কই হান্দাইলো?
হাসনাহেনার নার্সারির পাশ দিয়ে চারলেনের এই রাস্তার দিকেই ডালপালা। সন্ধ্যে বেলা ফুটপাতের এমন কোনো মানুষ নেই যে ওর কাছে এসে দাঁড়ায় না। একটু পর ওয়াটারপ্লানের খবর- ও দাদা! হেয় তো কইলো ফুটপাতে কোনো মানুষ আসে যায় না। সকাল থেকে চেয়ে আছে।
-বলল সন্ধ্যে লাগুক, এমন ঘ্রাণ ছড়াবে, ফুলপিয়াসী মানুষ ওর দিকে না তাকায় এক কদম পা ফেলব না।
-তখন সাফ সাফ ব্যাপারটা পরিস্কার হইব।
-দাদা লন, না হয় একডা মিটিং দেন।
-হুম... পাতাবাহার দম ছেড়ে বলে- হ, দেহি। আমার তো জান আর থাহে না দাদা। পানি ছাড়া কেমনে বাঁচুম, এইডা কোনো কথা হইলো?
-ধুর হালা ওয়াটার যা ওহন।
পাতাবাহার হারিয়ে যায় পেছনের দিনগুলিতে...।
রঙয়ের দুনিয়ায় রঙিলা মানুষ! চিন্তার থই পায় না পাতাবাহার। গত আটদিন থেকে কোনো জনপ্রাণী আসে না।
একেক চারার একেক কপাল! অনেকে গাড়ির ব্যাক ডালার মধ্যে আরামে বসে যায় আবার কেউ রিকশার পা দানিতে। কোনো কোনো চারা পাপড়ি নাচিয়ে বাই দাদা; বলে বিদায় নেয়, যার ফুল নাই বা ফুল ফোটেনি সে টুপ করে একটা পুরনো পাতা গা থেকে ফেলে দিয়ে শেষ সালাম জানায়।
একেক জনের চলে যাওয়ার আনন্দটা একেক রকম! যে যেমনে যাক; যাওয়ার পর থেকে যাওয়া সবাই গল্পে বসে। যারা গেল হয়ত কেউ বারান্দায়, ডাইনিং রুমে, বেডরুমে, ড্রয়িং রুমে, দরজার সামনে, আবার কেউ বারান্দায় ঝুলবে টবের তিন দিকের লাল সবুজ নীল দড়ি দিয়ে। কেউ নকশা করা নতুন টব পাবে; কেউ মরে যাওয়া তারই কোনো জাত ভাইয়ের পুরনো টবে। দিনভর অনেক গল্প চলে থেকে যাওয়া গাছগুলোর সঙ্গে পাতাবাহারের।
পাতাবাহার দেখছে সবার কাহিল অবস্থা। কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না; আর যার ফুল নেই তার পাতা জ¦লে যাচ্ছে। পাপড়ি তো সব পুড়ে শ্মশান! আজকাল আসমানে মরাপোড়া রোদ। পাশের কাঁঠালচাঁপা এসে বলল- ও দাদা। লকডাউন কেনে হুনছো?
-করোনা নাইমে কি এক অসুখ আইছে মানুষের। হুম রে। শহর গেরাম, দেশ-বিদেশ সব সাবাড় করছে মানুষ মাইরা হালাইতেছে; এই তুই হাসনাহেনাকে ক গিয়ে হেয় সবাইকে বলুক।
সবাই পাতা ও পাপড়ি খাড়া করে শুনছে। সবাই হায় হায় করছে।
-দাদা? আমাগো কী হইবো? আর মানুষগুলিন?
পাতাবাহারের চিন্তার শেষ নেই। এত সুন্দর লকলকে চারাগাছ অকালে মারা যাবে। গোলাপগুলির সব পাপড়ি কালো কুচকুচে হয়ে ঝরে পড়ছে। এদিকে বাগানবিলাস তার তো একটি পাতাও আর লাল হচ্ছে না। খাবার নাই, যতœ নাই। সব লকডাউনে আটকা। করমচা বেচারী; আহা! তার মুখের দিকে তাকান যায় না। গন্ধরাজের কলি আর চোখ মেলছে না। শিউলি তো ঝুলে গেছে। এ কী দশা, কী হল? পাতাবাহার ওয়াটারপ্লানকে ডাকে- ওই পানিখোর, হোন! কাল বিয়ানে মিটিং আছে সবাইকে বলিস।
মিটিং চলছে...।
-দাদা, আমরা হইছুন ফুলের জাত। নিজে সুবাস ছড়াইতন ধীরে ধীরে মরি যাইতন; বলে থামে করমচা।
-পলাশ, তুই কিবা কস?
-দাদা, আমাগে এক হওন নাইগবো। জীবন দিয়া আমরা পৃথিবীর মানুষকে মনের সুখ দিয়া আইছি। আইছি না! কথা কস না কেন সবাই? সবার মুখের দিকে চায় মাধবীলতা।
সবাইকে থামিয়ে পাতাবাহার বলে- পৃথিবীর সুন্দরের পূজারি হইল মানুষ; আমরা হইলাম সেই সুন্দর জিনিস, পূজারির নৈবেদ্য। সেই মানুষ না থাকিলে ফুলের মূল্য কই?
-তোরা সবাই সাবধান থাহিস, একটা ফয়সালা কাল সকালে জানামু।
মিটিং শেষে পাতাবাহার ভাবে, মানুষ আমাদের কত যত্ন করে। নিজের কষ্টের টাকা দিয়ে ফুল কেনে। কত যতœ করে চিলেকোঠায়, প্রেমিকার খোঁপায়, বর কনের গলায়, স্মৃতির বেদিতে, বরণÑমরণে, বিদায়ে, স্বাগতমে, প্রেম নিবেদনে, বিজয়ে, বাসর ঘরে, বর যাত্রায়, বিয়ের গেটে কোথায় আমাদের রাখে না মানুষ! পরম ও অনুপম ভালোবাসা দেখায় ফুলের প্রতি। সেই মানুষের শরীর আজ করোনা হামলে পড়ছে মানা যায়?

পৃথিবীর ১৯৯ টা দেশে নাকি করোনা। এসব দেশের ফুলগুলিরও মনে হয় একই দশা। উন্নত দেশগুলির তিনজন মানুষের দুইজন গড়ে সপ্তাহে ৩ দিন ফুল কেনে। এমন দেশেও নাকি করোনার আঘাত বেশি। শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। হায়! করোনা দেখি ফুলেরও শত্রু!
পরের দিন সকল ফুলের উদ্দেশ্যে পাতাবাহারের লিখিত ভাষণÑ ‘আমরা পুষ্প জাতি। আমাদের জন্ম নিজের হৃদয়কে অন্যের জন্য প্রস্ফুটিত করা। যা যুগে যুগে হয়ে আসছে। এই পৃথিবীর মানুষ যাদের জন্য আমাদের মর্যাদা গৌরব, জয়গান তারা না থাকলে আমরা কী করব? যোগ্য পূজারি মানুষ ছাড়া এই সুগন্ধী, মনোলোভা, মনোহর ও অনুপম দেহের কোন মূল্য আছে কি? নাই। আজকে চলো সবাই একজোট হই। পৃথিবীর যে প্রান্তে যত ফুল আছে সবার যত ছোট বড় অফুটন্ত কলি আছে একটু কষ্ট হলেও গা ঝাড়া দিয়ে উঠি। জীবনে না হয় আর একবারই ফুটব। আগামীকালের সকাল হবে পুষ্পময়। নিজের দেহের সর্বশেষ সুবাসকে নিংড়ে দিয়ে এই বসুমতিকে সুবাসিত সৌরভে ভরিয়ে দেব। সুঘ্রাণে করোনা বিষমুক্ত হবে পৃথিবী।’

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com