পছন্দের প্রতিষ্ঠান নিয়োগে তোড়জোড় শুরু

তোফাজ্জল হোসেন / ১০:০৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২,২০২০

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে কন্টেইনারবাহী জাহাজের জট বাড়ছেই। মাত্র একটি অপারেটর দিয়ে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের কারণে এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অপারেটর সংখ্যা না বাড়িয়ে একই প্রতিষ্ঠানকে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে নিয়োগ দিতে তোড়জোড় শুরু করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

অথচ সম্প্রতি একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, টেন্ডার ডকুমেন্ট এমনভাবে তৈরি করা যাবে না যাতে বড় বড় প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পায়। ছোট এবং অন্যান্য কোম্পানিকেও কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রতিযোগিতা না থাকায় একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়ার ফলে বন্দরে সেবার মানের অবনতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হতে পারে বলে মনে করছেন আমদানি-রপ্তানিকারক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইনও ক্রয় নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাবে সরকারি খাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য এ অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে জেনারেল কন্টেইনার বার্থে (জিসিবি) ছয়টি বার্থ রয়েছে এবং ছয়টি অপারেটর বার্থগুলো প্রতিযোগিতামূলকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)- এই দুটি টার্মিনালে বার্থের সংখ্যা সাতটি যা মাত্র একজন বার্থ অপারেটর পরিচালনা করে আসছে। দুটি টার্মিনালের সাতটি বার্থে মাত্র একজন অপারেটর থাকায় কন্টেইনার লোডিং আনলোডিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হয় না। যে কারণে এ দুটি টার্মিনালে জাহাজের গড় অবস্থান জিসিবির তুলনায় অনেক বেশি। দুটি টার্মিনাল তৈরির সময় দুজন পৃথক অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা করা হয়নি। একজন অপারেটরের মাধ্যমে দুটি টার্মিনাল পরিচালনা করায় বন্দর ব্যবহারকারীরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, দুটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ায় কন্টেইনার লোডিং আনলোডিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হয়না। এতে ওই প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে বন্দর, শিপিং এজেন্ট, আমদানি-রপ্তানিকারকরা জিম্মি হয়ে পড়েছে।

২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডকে কোনো টেন্ডার ছাড়াই চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)-এর কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ দেয়। এরপর থেকে সেই প্রতিষ্ঠান এককভাবে কাজ করতে থাকে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সিসিটির কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এই দরপত্রে এমন শর্তারোপ করা হয় যাতে আর কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে না পারে। গত ২৮ আগস্ট সিসিটি পরিচালনায় ছয় বছরের জন্য নিয়োগ পায় সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে আরও সোর্স খুঁজে বের করা কিংবা সরকার নিজেই এ কাজটি করতে পারে কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। পাওয়ারটেক লিমিটেডকে ছয় বছরের জন্য টার্মিনাল অপারেট নিয়োগের কাজ সর্বসম্মতিক্রমে দেওয়া হয়।

দরপত্র বাতিল করে অপারেটর নিয়োগের শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর আবেদন করেছে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পরিচালক মো. সহিদ হোসেন পৃথকভাবে প্রতিমন্ত্রী বরাবর চিঠির মাধ্যমে এ আবেদন করেন। চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার জন্য আইন ও বিধি অনুসারে স্টিভিডোরিং লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত ছিল। ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে সংস্কার কর্মসূচির আওতায় লাইসেন্সধারী স্টিভিডোরিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ ও সুনামধারী প্রতিষ্ঠান বাছাই করে জেটিতে বার্থ অপারেটর এবং বহির্নোঙরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর পদ্ধতি চালু করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর বার্থ অপারেটর সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে উক্ত গেজেট পরিবর্তন করে গত ২০১৮ সালের ১০ মে টার্মিনাল অপারেটরের সংজ্ঞা সংযোজন করে নতুন গ্যাজেট প্রকাশিত হয়।

উল্লেখ্য, টেন্ডার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটি যে বিষয়টির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় সেটি হলো কাজের অভিজ্ঞতার সনদপত্র। ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের অনুকূলে যে অভিজ্ঞতার সনদপত্র প্রদান করা হয়েছে তাতে ২০০৭ সাল থেকে টার্মিনাল অপারেটরের অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে। যা সম্পূর্ণ বেআইনি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আইন ও বিধি-বহির্ভূত।

বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত ২০১৯ সালের ২১ মার্চ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) টেন্ডার আহ্বান করে। টেন্ডারের শর্তে কন্টেইনার টার্মিনাল ও অপারেটরের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। এখানে টার্মিনাল শব্দটি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতাকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করার ফলে সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com