কাঁটা

সাদিয়া সুলতানা / ৩:০৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০,২০২০

বুকের ভেতরে একটা কাঁটা বিঁধে আছে। সারাক্ষণ খচখচ করে। সেই কাঁটা বুকে নিয়েই আমি দিনযাপন করি।

রাহাত অফিসের জন্য বের হয়ে যাওয়ার পর দরজা আটকে দিলে চার দেয়ালের মাঝে আমিই একমাত্র মানুষ। সংসার আমার ভীষণ প্রিয়। একা আমি বেশিরভাগ সময়ই ঘরদোর গোছানোর কাজে মগ্ন থাকি। আমার সংসার। গোছানোই চারপাশ। পরিপাটি সুন্দর। দুজন মানুষ মিলে কত আর এলোমেলো করা যায়। তবু মশারি, কাঁথা নিখুঁত ভাঁজ করা আর বিছানার চাদর টানটান না করে আমি অন্য কোনো গৃহস্থালি কাজে হাত দিই না। রাহাত আজকাল বাসায় সকালের নাস্তা করে না। অফিসের ক্যান্টিনেই সকাল আর দুপুরের খাবার খায়। তাই সকালে বা দুপুরে নিজের জন্য আহামরি কিছু রান্না করি না। রত্না এলে সবজি কেটে বা বাটনা বেটে এগিয়ে দেয়। আমি দিনের এক ফাঁকে রাতের রান্নাটা সেরে রাখি। রাতের খাবার আমি আর রাহাত একসঙ্গে খাই।

কাজকর্ম সেরে আমি শোবার ঘর লাগোয়া বিশাল বারান্দার ঝুলন্ত বেতের দোলনায় বসে দোল খাই। কখনো বা খালি দোলনাটা ঠেলে দিয়ে দোলনার দোলদোলানি দেখতে থাকি। আমার নিঃসঙ্গ দিনলিপিতে দোলনাটা চমৎকার সুখানুভূতি তৈরি করে। পড়ন্ত দিনের মন্দাক্রান্ত বাতাসের ছোঁয়া শরীরে লাগলে আমার কাঁটার ক্ষতে বেশ খানিকটা আরাম লাগে। দিনের অন্যান্য সব ভাগের চেয়ে বারান্দায় কাটানো সময়টুকু আমার খুব প্রিয়। এ বাসায় পা দিয়েই রাহাতকে বলেছিলাম, ‘আমার একটা দোলনা চাই।’ রাহাত সব ব্যস্ততার মাঝেও আমার সব আবদার পূরণ করে।

রাহাত খুব ব্যস্ত মানুষ। ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সংসারের জৌলুস বাড়ে। পৌনে চার বছর হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। সবাই বলে মানিকজোড়। চোখ জুড়ানো জুটি। আমাদের দুজনের বাবা-মাই পরম তৃপ্তিতে নিঃশ্বাস ফেলেন। আলমারিতে তুলে রাখা ন্যাপথলিনের সুবাস মাখা সারি সারি শাড়ির নিপাট ভাঁজের মতো সাজানো আমার সংসার। একেবারে পরিপাটি। চার দেয়ালের সুদৃশ্য এই গৃহকোণে ভালোবাসার নিত্য যাতায়াত। সুখের ছড়াছড়ি। তবু কেন যেন আমার বুকের ভেতরে একটা কাঁটা বিঁধে থাকে।

ভীষণ এক অস্বস্তি! অস্বস্তি কাটাতে ইউটিউব থেকে নতুন নতুন রেসিপি আপলোড করে নিয়ে রান্নাঘরে তেল, জল, মসলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাঁধতে বসি। মাঝে মাঝে রান্নার উদ্ভট সব উপকরণের খোঁজে শপিং মল চষে বেড়াই। আড়ং থেকে চুপ করে মোবাইলে তুলে আনা ছবি দেখে রাহাতের পাঞ্জাবিতে নকশা আঁকি, সুই-সুতোয় বাহারি ফোঁড় তুলি। ঘরের কাজকর্ম ফুরিয়ে গেলে ফোনে নিতুর সঙ্গে গল্প করি, সিক্রেট চ্যাটবক্সে গ্রুপ করে আড্ডা দিই নতুবা এ বছরই নাতি-নাতনির মুখ দেখাব বলে মায়ের কাছে দোয়া চেয়ে মাকে আশ্বস্ত করি। শাশুড়ি আম্মার কুশলাদি জানা হলে ল্যান্ডফোনের সেটটা কর্নার টেবিলে ঠিক করে রাখতে রাখতে তবু টের পাই, কাঁটাটা এখনও ঠিক একই জায়গায় বিঁধে আছে।

রাহাত যখন অফিস থেকে এসে টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে দুহাতের বাঁধনে আমাকে কোমরের কাছে জুড়ে নেয় নতুবা ঠোঁটের ভাঁজে আলতো করে চুমু খায় তখন শরীর-মনে উষ্ণ হতে হতেও আমি কাঁটাটার খচখচানি টের পাই।

রাহাত বেশ সুদর্শন, বুদ্ধিমান আর সংসারী ছেলে। লোকে ঠিকই বলে, আমরা একেবারে সুখী দম্পতি। অল্প বয়সেই রাহাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রূপে-গুণে অনন্যা বউ পেয়েছে। ও বিয়ের বছর দুই আগেই মোহাম্মদপুরে পনের শ’ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের বুকিং দিয়েছে। মোটা অঙ্কের বুকিংমানি দেওয়ার পর থেকে মাসিক কিস্তি দেওয়াও শুরু করেছে। এ বছরই ডেভেলপার আমাদের ফ্ল্যাট হ্যান্ডওভার করবে। শুধু ফ্ল্যাট না, আমার শ্বশুরের রাজশাহীর জায়গা-জমি বিক্রি করে ভাই-বোনের কাছ থেকে নিজের ভাগ বুঝে নিয়ে এর মধ্যে গাড়ি কিনে ফেলেছে। ব্যাংকে বড় অ্যামাউন্টের একটা ফিক্সড ডিপোজিটও করে রেখেছে। অস্বীকার করব না, রাহাত আমাকে একবারে সুখী আর নিশ্চিন্ত জীবন উপহার দিয়েছে। আমাকে প্লাবিত করে রেখেছে সুখের জোয়ারে।

আমার মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগে ভার্সিটিতে এ ছেলেটা কেমন হ্যাংলার মতো আমার পেছন পেছন ঘুরত। আমার পাশে দাঁড়ালেই ওর মুখ পাঁ শুটে হয়ে যেত। কথা খুঁজে পেতো না। পেনড্রাইভে মডার্ন হিস্ট্রির নোটস নিতে গিয়ে যেদিন প্রথম ওর লেখা দেড় পাতার প্রেমপত্র পেয়েছিলাম সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও রাহাতের জন্য আমার বুকে তোলপাড় করে ঢেউ জাগে। জীবনের প্রথম প্রেমপত্রটা দেওয়ার পর কী গালিগালাজই না খেয়েছিল বেচারা! আমি তো বন্ধুদের সামনে হুঁশহীন বকেই চলেছিলাম আর ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। চলে আসার সময় কী মনে হতে পিছু ফিরে বলেছিলাম, ‘চিঠি ইংরেজিতে কেন লেখো! বাংলায় লেখা যায় না?’ ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্ভুত একটা আলো খেলা করেছিল রাহাতের চোখে-মুখে! দু’ঠোঁট চেপে মায়াবী ভঙ্গিতে হেসেছিল। আজও ওর সেই মুখ মনে পড়লে আমি একই রকম ভালোলাগায় কাতর হই।

রাহাত আজও সেই একই আলো চোখে নিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়ায়। রাতের অন্ধকারে নিবিড় সঙ্গমে কানের কাছে আলতো স্বরে আজও বলে, ‘জতেম সোনা... জতেম।’ ওর নিবিড় আলিঙ্গনে, ওর তপ্ত স্পর্শে আমি কাঁপি একই শিহরণে। রাহাতের প্রেমে উতল হই। তবু কেন যেন বুকের গহীনে একটা কাঁটা খচখচ করে।

এই যে সেবার আমাদের তৃতীয় হানিমুন উদযাপন করতে কক্সবাজারে গেলাম, সেবারও কাঁটাটা আমার পিছু ছাড়েনি। সমুদ্রজলে লুটোপুটি খেতে খেতে যখন রাহাতের শরীরে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছি তখনও হঠাৎ হঠাৎ কাঁটাটা আমাকে উত্ত্যক্ত করেছে। প্রথম প্রথম আমি পাত্তা দিচ্ছিলাম না। কিন্তু একে যত উপেক্ষা করতে চাচ্ছিলাম, তত যেন আরও গভীরে গিয়ে বিধঁছিল!

আমি আর রাহাত হাসছিলাম। অপার আনন্দে সমুদ্রজলে খেলছিলাম। তবু কী যে হলো!

বুকের ভেতর থেকে কাঁটাটা বের করার পথ খুঁজে ব্যর্থ হয়ে কতবার ভেবেছি রাহাতকে বিষয়টা খুলে বলব। কিন্তু রাহাত পাগলের মতো ছবি তুলছিল আর আমাকে বারবার জড়িয়ে ধরছিল, পরম সুখের বিভ্রমে ভেসে বেড়াচ্ছিল, তাই আমি ওকে বলতে পারিনি। সেই সমুদ্রতটে বুকের ভেতরের নিলাজ কাঁটাটার সাথে কোথায় যেন মায়া বিভ্রমের একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা হয়েছিল। শেষ অবধি মায়াই জিতে গিয়েছিল। হোটেলে ফিরে শক্ত করে রাহাতকে জড়িয়ে ধরে আমি পরম প্রশান্তিতে ঘুমোতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। সেই যে সেই কাঁটা! বুকের ভেতরে খালি খচখচ করল যে! ঘুমাতে দেয়নি।

নাহ্ সুখের কোনো অভাব নেই আমার। সারাদিনে কথা বলার মানুষের অভাবও নেই। যদিও রত্না ছাড়া বাসায় মুখোমুখি কারও সঙ্গে কথা বলা হয় না।

রত্না কাজ করতে করতে টুকটুক করে অনেক কথা বলে। লাজুক লাজুক মুখে ঘুরে ফিরে ওর স্বামীর গল্পই করে বেশি। গার্মেন্ট ছুটির দিনে ওর স্বামী ওকে সিনেমা দেখতে হলে নিয়ে যায়, বছর না ঘুরতে নতুন মোবাইল কিনে দিয়েছে, খুব বেশিদিন ওকে আর মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করতে দেবে না, লোকটার একটা মেয়ে বাচ্চার খুব শখ ইত্যাদি ইত্যাদি। গল্পের সঙ্গে সঙ্গে ওর সরু হাতে স্বামীর কিনে দেওয়া সিটিগোল্ডের চুড়ি টুংটাং করে বাজে।

মাঝেমাঝে রত্না নানান দার্শনিক কথাবার্তাও বলে, ‘আফা, বড়লোকের হইল সুখের অসুখ। আমাগো অসুখ-বিসুখ আছে, সুখের অসুখ নাই। গরিবের সুখ হইল ঘুমে। সারাদিন কাম কইরা এক পেট খাইলে সুখে ঘুম আহে।’

রত্নার চোখে-মুখে লেগে থাকা পরিতৃপ্তির হাসি দেখে মাঝে মাঝে আমি চমকে উঠি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ওর বুকেও কী কোনো কাঁটা বিঁধে আছে? সংকোচে রত্নাকে কখনো এই প্রশ্ন করতে পারিনি। বলতে পারিনি, ‘সেই কবে থেকে আমার বুকে বিঁধে থাকা একটি কাঁটা দগদগে ঘাতে আঘাত করার মতো আমাকে খোঁচাচ্ছে, বলত মেয়ে তোমার কি এমন কোনো কাঁটা আছে?’

আজ থেকে আট মাস তের দিন আগে একটা বিষয় নিয়ে তীব্র বাদানুবাদের সময়ে রাহাতের হাত উঠেছিল আমার ওপর। ঝগড়ার বিষয়টা মনে নেই। শুধু মনে আছে আগুনচোখে রাহাত আমার দিকে হাত তুলেছিল। নাহ্, আমাকে মারেনি, শুধু হাত তুলেছিল।

কী আশ্চর্য সেই দৃশ্যটা আজও কাঁটা হয়ে বুকের ঠিক মাঝখানে বিঁধে আছে!

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com