হেমন্তের মেঠোপথে

নাজমুল মৃধা / ১:৪৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০১,২০১৯

আমাদের বন্ধুত্ব চার বছর শেষ হয়ে পাঁচ বছরে পদার্পণ করেছে। নয় জনের বন্ধুত্বে চার বছরে এতটুকু চির ধরাতে পারেনি। বন্ধুত্বকে সজীব করে রাখতে আমরা প্রায় সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণে বের হই। এবার যেমন দেশের দুটি সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনা এবং সুনামগঞ্জ ভ্রমণ করে আসলাম।

রাজশাহী থেকে ময়মনসিংহগামী শামীম পরিবহনের একটি বাসে চড়ে আমরা নয়জন ময়মনসিংহে যাই। সেখান থেকেই শুরু আমাদের অ্যাডভেঞ্চার। পরে ময়মনসিংহ ব্রিজ থেকে রিজার্ভ সিএনজি করে রওয়ানা হই নেত্রকোনা জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দা আমাদের গ্রামের পথে। আমার জন্ম মেঘালয়ঘেঁষা বাঘবেড় গ্রামে হলেও গ্রামের সৌন্দর্যকে এতটা উপভোগ করা হয়নি কোনোদিন। এবার যেন বাকি বন্ধুদের মতো আমার চোখেও সৌন্দর্য দেবী ভর করেছিল।

নেত্রকোনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে কলমাকান্দায় আমার গ্রাম। মাঠে সোনালি ধান আর মেঘালয় পাহাড়ের মিতালি গ্রামটিকে করে তুলেছে একখ- সবুজের বুকে এক টুকরো সোনার খনি। সকাল ৯টায় যখন আমরা গ্রামে পৌঁছাই তখনও হেমন্তের শিশির বিদায় নেয়নি। হালকা শীতের আগমন আমাদের ক্লান্ত দেহে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে গ্রামটি যেন আমাদের গ্রহণ করেছে। দূরের দুর্গম রাস্তা আর ভাঙাচোরা মেঠোপথ পার হয়েই আমাদের বাড়িতে পৌঁছাতে হয়।

আমার বাড়িতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। গ্রামটিতে শিক্ষার হার শতকরা ৫ ভাগ। আমিই প্রথম বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। সারারাত গাড়িতে ফোন চাপাচাপির পরে সকলের ফোনের চার্জও শেষ। গ্রামের এক কোণে দোকানে গিয়ে ওদের ফোন চার্জে দিতে হয়েছিল। এত কষ্ট করে বাড়িতে পৌঁছানোর পর আমার মা আমাদের জন্য দেশি খাবার (টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছ, ভর্তা, শিম-টমেটো ইত্যাদির তরকারি) রান্না করে রেখেছিল সঙ্গে গোস্ত। সঙ্গে আমাদের পূর্ববঙ্গের নানা জাতের পিঠা।

দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে আমরা আমার বাড়ির সামনে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের কাছে ঘুরতে যাই। আমার বাড়ি থেকে ৫ মিনিট ধান ক্ষেত ধরে উত্তর দিকে হাঁটলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। মেঘালয় পাহাড়ের বিশালতা বন্ধুদের ক্লান্তি দূর করে ওদের খানিক সময়ের জন্য ভাবুক করে তুলেছিল। সারাদিন গ্রাম আর পাহাড়ি এলাকা ঘুরে আমরা গ্রামের বাজারে যাই রাতে। আমাদের নয়জনের মধ্যে তিনজন প্রমিলা সদস্যও ছিল।

পরদিন সকালে আমার নানা বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া আর গানের আড্ডা দিয়ে বিকেলে চলে যাই সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকা মহিষখোলা গ্রামে। বলা ভালো, আমাদের গ্রাম থেকে সুনামগঞ্জ জেলার সীমানা খুব দূরে নয়। আমাদের এই অঞ্চলটা এতটাই প্রত্যন্ত যে পুরোটাই মেঠোপথ, এখানে অটো এবং অটোরিকশা চলতে পারে না। মহিষখোলায় যেতে আমাদের বাজার থেকে ভাড়ায় বাইক পাওয়া যায়। আমরা পাঁচটি বাইক নিয়ে মহিষখোলা আমার খালার বাড়িতে চলে যাই। রাতভর সেখানে আড্ডা এবং ঘুম দিয়ে পরদিন সকালে আমার খালাতো ভাইসহ পাঁচটি ভাড়া বাইক নিয়ে রওয়ানা হই সুনামগঞ্জের দর্শনীয় স্থান নীলাদ্রি, বারাক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী এবং শিমুলবাগান দেখতে।

আমার খালার বাড়ি থেকে পূর্বদিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের নিচ দিয়ে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার রাস্তা বাইকে করে যেতে হয়। অল্প একটু রাস্তা পাকা হলেও ৩৫ কিলোমিটারের মতো রাস্তা কাঁচা। তার ওপর যেদিন আমরা ঘুরতে বের হই সেদিন আবার ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ পুরো দেশে আঘাত হেনেছে। মাথার ওপর বিষণ্ন আকাশ আর নিচে এক হাঁটু কাদার রাজত্বকে অবহেলা করে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাই। হাতের বামপাশে মেঘালয় পাহার আর বামপাশে টাঙ্গুয়ার হাওরের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতেই আমরা আমাদের গন্তব্যের দিকে যেতে থাকি।

দিনভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড়-হাওরের মিতালিতে সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জ জেলা শেষ করে আমরা রাতে বাড়ি ফিরি। তবে যাওয়ার সময় বাইকে চড়ে যেতে পারলেও আমাদের বাড়িতে ফেরত আসার সময় আর বাইকে চড়ার মতো অবস্থা ছিল না। কাদাতে বাইকগুলো হয়ে গিয়েছে ছন্নছাড়া। প্রায় রাস্তাতেই এক হাঁটু কাদা ছিল।

‘বুলবুল’ ঘূর্ণিঝড় আমাদের ভ্রমণটাকে যেন কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তবে আমাদের তারুণ্যের কাছে সে হার মানতে বাধ্য হয়। সুনামগঞ্জ পর্ব শেষ করে আমরা আমাদের বাড়িতে চলে আসি। এর পর দিন আমাদের গন্তব্য নেত্রকোনা জেলার দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করা। আমরা জেলাটির সীমান্তবর্তী সমৃদ্ধ জেলা দুর্গাপুরের বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়ে যাই পরদিন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com