মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কি ক্ষমতা-অর্থে?

মোসলেম উদ্দিন সাগর / ৯:৪২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০১,২০১৯

মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়েছে তার মস্তিষ্কের জন্য অর্থাৎ জ্ঞান ও বিবেকের জন্য। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশিত রূপে কি আমরা তা দেখতে পাই? মানুষের জন্ম-মৃত্যু আছে, টিকে থাকার লড়াই আছে যেমন, তেমনি অন্যান্য জীব মাত্রই জন্ম-মৃত্যু আছে, টিকে থাকার লড়াই আছে। আদিম যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই মানুষ সভ্যতার যুগে প্রবেশ করেছে।

প্রকৃতির দিকে খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাই এক জীব আরেক জীবকে ভক্ষণ করে বেঁচে আছে। যেমন, সাপ ভক্ষণ করছে ব্যাঙকে, ব্যাঙ ভক্ষণ করছে পোকা-মাকড়কে, পোকা-মাকড় তৃণ, ঘাস খেয়ে বেঁচে আছে; পোকা-মাকড় ও ঘাস খেয়ে পশু-পাখি বাঁচে, মানুষ বাঁচে পশু-পাখি আর উদ্ভিদ খেয়ে। আবার মানুষকে বাঘ খায়, মরে গেলে বিভিন্ন অণুজীব যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক খেয়ে পঁচিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। জীবের মাটিতে মিশে যাওয়া মাটিকে উর্বর করে যা উদ্ভিদ মাটি থেকে গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। যাকে আমরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বলি। এ ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটলেই নেমে আসে প্রাকৃতিক বির্পযয়।

প্রকৃতির এ শিক্ষা আমাদের মূলত টিকে থাকার শিক্ষাই দেয়। তাই আমরা টিকে থাকতে গিয়ে ভুলে যাই জীব হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের অন্য কোনো দিক আছে, যা জ্ঞান ও বিবেক। সভ্যতায় আসতে জ্ঞানের যে অতুলনীয় ভূমিকা আছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শুধু টিকে থাকতে বিবেককে নিস্তেজ করে রাখছি আমরা। কিন্তু সে বিবেক জড়িত মানুষ চরিত্রের ও একটা ভারসাম্য আছে যার ঘাটতি হলে মানব সমাজের ভারসাম্য তথা শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন মানুষ যখন কারও সন্তান তখন তার মধ্যে আদর্শ সন্তানের বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, যখন তিনি বাবা-মা তখন আদর্শ মা-বাবার বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে; যখন তিনি ভাই অথবা বোন তখন ভাই-বোন হিসেবে আদর্শিক হতে হবে। কারো বন্ধু অথবা রাষ্ট্রের নাগরিক, সেবা দাতা বা গ্রহীতা প্রত্যেকটি চরিত্রের আদর্শিক কমিটমেন্ট থাকতে হবে।

এসব মানুষের মানবিক বিবেকবোধ, দায়িত্ব ও নেতিক অবনতি ঘটলে অর্থাৎ সঠিক বৈশিষ্ট্যের অভাব হলেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে বিপর্যয় অনিবার্য। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে মানুষের যে মানুষগত অবস্থান তার ব্যতিক্রম হলেই মানুষ চরিত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়ে। আর তখনই সৃষ্টি হয় অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও অস্থিরতা প্রভৃতি।

পৃথিবীজুড়ে মানুষের বসবাসের পরিবেশ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত মানবিক বিপর্যয়, দুর্নীতি, পারস্পরিক অসহনশীলতার খবর তাহলে আমাদের কি বার্তা দেয়?
বিশ্বময় বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্যমান ব্যবস্থায় দেখা যায় মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশিত ধরন ক্ষমতা, অর্থ আর জবর দখলে! নেতা বা আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সবাই দিন শেষে বাহাদুরি দেখানোর মধ্যেই তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঊচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বাসার কাজের লোকের গায়ে হাত তুলতেও অনেকে দ্বিধা করে না। ধর্মীয় শিক্ষা, প্রচলিত শিক্ষা অর্জন করেও মানুষ নেহাতই একটা প্রাণীর মতো আচরণ করছে! তাই বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সমস্যা, জাতিগত সমস্যা, সামাজিক সমস্যা, ধনী-দরিদ্র সমস্যা বেড়েই চলছে।

সভ্য এর সঙ্গে ‘তা’ প্রত্যয় যোগে যে সভ্যতার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সেখানে মানব সত্তার, বিবেক সত্তার জায়গা কতটুকু আছে তা বোধগম্য নয়। মানুষ ও পশুর চরিত্র আলাদা করা যাচ্ছে না! যেমন, একটি ষাড়ের স্বভাবই হলো মানুষকে শিং দিয়ে গুঁতো মারা। কিন্তু একজন মানুষ যদি অন্য একজন মানুষকে ধাক্কা দিয়ে কিংবা ঠকিয়ে নিজের বাহাদুরি দেখায় তখন তার আর পশুর মধ্যে কতটুকু পার্থক্য থাকে?
পৃথিবীর অস্ত্বিত্ব টিকিয়ে রেখেছে উদ্ভিদ তার ত্যাগ ও সহ্যের নিদর্শন দ্বারা। তারপরও উদ্ভিদ শ্রেষ্ঠ জীব নয়। আবার জ্ঞান অর্জন করেও যেহেতু জীবের সার্বজনীন জিনোমিক খারাপ চরিত্র পরিত্যাগ করতে পারছে না সেহেতু শুধু জ্ঞানের জন্যই মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব বলা সমীচীন হবে না। কেননা হুঁশ, বিবেক বর্জিত মানুষ আর সাধারণ প্রাণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেবল জ্ঞানের সঙ্গে বিবেকের জাগ্রত আচরণেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা প্রকাশ পেতে পারে। পরিবেশ, শিক্ষা, অনুশাসন, নৈতিক জ্ঞান আমাদের প্রভাবিত করতে পারে বলেই আমরা মানুষ হিসেবে পরিচয় দেই। কিন্তু সৃষ্টির আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সর্বত্র মানুষ জ্ঞানের আলোকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ও শক্তির প্রদর্শনী দেখিয়ে যাচ্ছে।

তাই মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিতে আমাদের পরিবার শেখাচ্ছে তোমাকে যে কোনোভাবে বড় হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেখাচ্ছে ভালো ফলাফল করতে হবে, মেধাবী হতে হবে; সমাজ শেখাচ্ছে যে কোনোভাবে অর্থের মালিক হতে হবে, একটা চেয়ার দখল করতে হবে। বিবেক ছাড়া, হুঁশ ছাড়া যে মানুষই হওয়া যায় না এই শিক্ষাটা কেউ দিচ্ছে না বা প্রচলিত ব্যবস্থায় দেওয়ার সুযোগ নেই! কোনো অভিভাবক, কোনো শিক্ষক, কোনো ব্যক্তি বা কোনো সংগঠন নিজের দায় থেকে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা দিলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ কোনো সন্তান, কোনো শিক্ষার্থী যখন দেখে সমাজে মাস্তানের দাম বেশি, অপরাধীর দাম বেশি, দুর্নীতিবাজের টাকার দাম বেশি তখন সে সেটাই হতে চাইবে।

একদিন একাদশ শ্রেণির ক্লাসে প্রায় দুইশ’জন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেছিলাম, তোমরা কি হতে চাও? একজনও বলেনি আমি শিক্ষক হতে চাই! কারণ জানতে চাইলে একজন বলল, স্যার আপনাদের তো কোনো ক্ষমতা নেই, ছাত্রনেতারা ধমক মারে! পরীক্ষার সময় ম্যাজিস্ট্রেট গাড়ি নিয়ে আসে, আপনাদের তো একটা গাড়িও নেই! বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেলে দেখি আমাদের প্রফেসর স্যারগণ ডিসি স্যারের অনেক পরের চেয়ার পান! আমি তখন আশ্চর্য হয়ে গেলাম একাদশ শ্রেণির ছাত্রের কথা শুনে! তাকে বুঝিয়ে বললাম, চেয়ার আর সম্মান এক জিনিস নয়, একজন প্রফেসর ডিসি মহোদয়ের উপরের র‌্যাংকের অফিসার! আবার নিজের দৈন্যদশা ভেবেও হতাশ হলাম! কারণ একজন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা যিনি সরকারি কলেজের অধ্যাপক তাকে ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সে জায়গা দিলে সরকারের কোনো অর্থ খরচ হয় না বরং সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি পেতো!

ছাত্রটি ঠিকই বলেছে, বাস্তবিকে কিন্তু চেয়ারই জ্ঞান ও বিবেককে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই ক্ষমতার দিকে সবারই অসম দৌড়! যার জন্য আজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবখানেই কলহ, অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। উল্টো পথে এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে জ্ঞানের আড়ালে পশুর শিং লাভ করে চক্রাকারে যেন সবাই ক্ষমতার গুঁতো দিতেই প্রস্তুত হচ্ছে! রাজনীতি, চাকরি, ব্যবসা এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন নিয়মিত ক্ষমতা প্রদর্শনের মহড়া চলে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত সবার কাছেই সম্মানের মাপকাটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা ও অর্থ! এ দুটি ছাড়া কেউ কাউকে সম্মান করতে চায় না। অন্যায়, অপরাধ, মানুষের স্বভাব ভৌগোলিক পরিবেশ ও সমাজ ব্যবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে কিন্তু মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে অন্যকে ক্ষমতা ও অর্থ দ্বারা! ফলে ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা ও অর্থের নিয়ন্ত্রণে বন্দী হয়ে প্রকৃত মানুষ চরিত্র বিলীন হতে চলছে। এ অবস্থার আশু সমাধানে সবার দায় থাকলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। কারণ সমাজ প্রচলিত ধারণা ও অভ্যাসের কালচারে পরিচালিত হয়।

কারণ একজন শিক্ষিত ব্যক্তি অন্যায় করলে একজন অশিক্ষিত ব্যক্তি নির্দ্বিধায় সেটা করতে চাইবে। রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কেউ অনিয়ম করলে সাধারণরা তা নিয়ম বা রেয়াজ মনে করেই করবে। আমাদের চারপাশে ক্রমশই দুঃখজনক এ সিস্টেম দৃশ্যমান হয়ে উঠছে!
যে অদৃশ্য বিবেকবোধ আমাদের কর্মে প্রকাশ পাওয়ার কথা তা মূলত পরিবেশীয় শিক্ষার অভ্যাসগত প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই অভ্যাসগত প্রক্রিয়ায় মানুষ বৈশিষ্ট্যের মানবিক চারিত্রিক ভারসাম্যের যেন ব্যাঘাত না ঘটে তার জন্য আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যাসগত কর্মে নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষার দৃশ্যমান প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।

সামাজিক, রাজনৈতিক, সরকারি, বেসরকারি সব কাজে যথাযোগ্য ভালো মানুষদের মূল্যায়নের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। এভাবে মানুষ ও জন্তু জানোয়ারের পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারলে ভালো ও মানবিক মানুষ হওয়ার ও তৈরি করার উৎসাহ নিশ্চিত বেড়ে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে জ্ঞানের সঙ্গে মানবিক বিবেকের যোগ হলেই মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব হবে। আর এ বিবেক ও মানবিকতা মরে গেলে সভ্যতার চরম শিখরে উঠেও পৃথিবী সংঘাতময় হয়ে উঠবে।

মোসলেম উদ্দিন সাগর
শিক্ষক, বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ

সম্পাদক : ড. কাজল রশীদ শাহীন
প্রকাশক : মো. আহসান হাবীব

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-১৮-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: editorkholakagoj@gmail.com
            kholakagojnews7@gmail.com