শাশ্বত বাংলার রচনা ঠাকুরমা’র ঝুলি

শহীদ ইকবাল / ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০,২০১৯

ঠাকুরমা’র ঝুলি (১৯০৭) বাঙালির সাহিত্য, শাশ^ত বাংলার রচনা। লেখক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদার (১৮৭৭-১৯৫৬)। সকলের পাঠ্য। কেননা মাটি ও মানুষের ঐতিহ্যিক চেতন মনকে তিনি এতে পরিস্ফুট করেছেন। এগুলো এতো নিপুণ- যেখানে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র যেন ‘রসের রাজা’ হয়ে বসে আছেন। তার আগ্রহ, ধৈর্য, পরিবেশন রীতি, দায়িত্বশীলতা সবকিছু নতুনভাবে গড়ে উঠেছে আর ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’ তাতে হয়ে উঠেছে আমাদের চিরায়ত- চিরকালীন সম্পদ।

প্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলা যায়- ‘দক্ষিণাবাবুকে ধন্য! তিনি ঠাকুরমা’র মুখের কথাকে ছাপার অক্ষরে তুলিয়া পুঁতিয়াছেন তবু তাহার পাতাগুলি প্রায় তেমনি সবুজ, তেমনি তাজাই রহিয়াছে; রূপকথার সেই বিশেষ ভাষা, বিশেষ রীতি, তাহার সেই প্রাচীন সরলতাটুকু তিনি যে এতটা দূর রক্ষা করিতে পারিয়াছেন, ইহাতে তাহার সূক্ষ্ম রসবোধ ও স্বাভাবিক কলানৈপুণ্য প্রকাশ পাইয়াছে।’ এটি নির্মোহ সত্য কথা।

পূর্বের অনেক সমালোচক, এমনটাও বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ‘স্বীয় প্রতিভা’য় এমন কাজ করতে সক্ষম হননি। তাই, রবীন্দ্রনাথ সংগ্রাহক দক্ষিণারঞ্জনকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। স্বীকার করতে দ্বিধাও করেননি যে, ‘আমি হইলে ত এ কাজে সাহসই করিতাম না। ...বিলাতী কলমের যাদুতে রূপকথার কথাটুকু থাকিলেও সেই রূপটি ঠিক থাকে না।’ এই রকমের অর্থে, ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’র মর্মার্থ অনুধাবন করা সমীচীন। বাংলার পল্লীর মাটি থেকে এর রস আহৃত হয়েছে। কিন্তু এখন তো সেই পল্লী নেই! সে মূল্যবোধও হারিয়ে গেছে।

নগর ও নাগরিকতার সূত্রে পারস্পরিক যোগাযোগ, সম্পৃক্ততা কমে গেছে। মূল্যবোধের চর্চা এখন অনেকটাই অগভীর, নৈতিকতা স্থূল-শৈথিল্যপ্রবণ। স্মর্তব্য, ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’র প্রকাশেরও একটা বাস্তবতা আছে। সে অর্থে সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০৫-র বঙ্গভঙ্গ সকলকে যেন জাগিয়ে দিয়েছিল। এক সুরে তান তুলে দিয়েছিল। উনিশ শতকের পরে আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনাদর্শও এ সমাজে প্রভূত হয়ে ওঠে। ধারাবাহিকভাবে তার একটা কলরোলও যুক্ত হয়। তখনই এর প্রকাশ। কিন্তু প্রকাশের পূর্বাপর কী?

মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’ সংগ্রহ করাটা কিংবা প্রকাশ করাটা আর অন্য সব সাহিত্যের মতো নয়। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র কোনো পথচলতি কৃত্রিম কিছু আরোপ করেননি। মনের মাধুরীও মেশাননি। নিজের মনে কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও তার প্রয়োগ ঘটাননি। দরদভরা মনটাকে ‘ঠাকুরমা’র কাছে- স্বনিয়মের কোটায় বেঁধে রেখেছেন। লাগামছাড়া করেননি। কী সংযম ছিল তার! বুঝতে পারেন এবং সে ভার কার্যকর করেন, নিয়ন্ত্রিত হন, দায়বদ্ধতায় মূলে সমাচ্ছন্ন থাকেন- প্রণম্য দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদার। তার এ কাজ আমাদের স্বপরিচয়, আত্মানুসন্ধানজ্ঞাপক। লোককথা, রূপকথা, উপকথা, পুরাণ, ইতিহাস এক একটি জীবনের বাস্তব-সংবেদ। বিভিন্ন উপাদান ও মোটিফের মধ্য দিয়ে আমাদের ঐক্য, যূথরূপ, সামষ্টিক এষণা এতে পথ করে নেয়, পুনরুদ্ধারও পায়।


‘দুধের সাগর’, ‘রূপ-তরাসী’, ‘চ্যাং-ব্যাং’, ‘আম-সন্দেশ’ নিয়ে ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’। প্রধানত রূপকথা ও উপকথা এবং উপকথার পর্যায়ভুক্ত এসব রচনা। দুধের সাগর ও রূপ-তরাসী পর্বের দশটি গল্প রূপকথামূলক। ‘কলাবতী রাজকন্য’, ‘ঘুমন্তপুরী’, ‘কাঁকন-মালা’, ‘কাঞ্চন মালা’, ‘সাতভাই চম্পা’, ‘শীত-বসন্ত’ এবং ‘কিরণ-মালা’ সজ্জিত ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’। ‘রূপ-তরাসী’ পর্বে আছে ‘নীলকলম ও লালকলম’, ‘ডালিমকুমার’, ‘পাতাল-কন্যা’, ‘মণি-মালা’, ‘সোনার কাটি, রূপার কাটি’। প্রসঙ্গত বলা যায়, ইংরেজি ‘Fairy tales’ আর ‘রূপকথা’ এক নয়। ‘Fairy’ বা ‘পরী’ ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’তে নেই।

‘বাংলা রূপকথার গল্পকে হতে হবে এমন যাতে পরীদের ভূমিকা প্রধান হবে না, গল্পগুলো কোনো দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের বাহন হবে না, ইতিহাসের কোনো চরিত্র নায়ক হয়ে উঠবে না। গল্পে ভূতপ্রেত বা পশুপক্ষীর উপস্থিতি থাকলেও তারা গল্পের নিয়ন্তা হবে না। রূপকথার গল্পে যেসব পশুপাখি থাকবে তারা হবে অপ্রাকৃত- যেমন রাক্ষস-রাক্ষসী, পক্ষিরাজ, বেঙ্গমা-বেঙ্গমী, খোক্কস, শুকসারী ইত্যাদি। সবকিছুর ওপরে সেসব গল্পে প্রধানত মানুষের প্রাধান্য থাকবে। তবে সে-মানুষের বাস্তব পরিচয় থাকবে না। গল্পগুলোতে যেসব দেশের উল্লেখ থাকবে সে-সম্বন্ধে পাঠকের কৌতূহল জাগবে না। নর-নারীর ভালোবাসা এবং নিয়তি বা অদৃষ্ট হবে ওইসব গল্পের প্রধান উপজীব্য। সব গল্পকে অবশ্যই মিলনাত্মক হতে হবে এবং এতে শেষ পর্যন্ত সত্যেরও জয় হবে। এসব গল্পে দুষ্টের পরাজয় ঘটবে। প্রাচীন লোকবিশ্বাস বা ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া ওতপ্রোতভাবে তাতে জড়িয়ে থাকবে। কিন্তু সরাসরি কোনো নীতি বা উপদেশ প্রদানের মধ্য দিয়ে তা শেষ হবে না।

রূপকথার গল্পে কোনো কৌতুকরস থাকবে না। ভাষা হবে কাব্যধর্মী। সরল, গ্রামীণ, স্নিগ্ধ ও অনুভূতিময় গদ্যে গল্পের ঘটনাবলি বর্ণিত হবে। রূপকথার স্বরূপে এসব কথার আরও গাঠনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ভ্লাদিমির ইয়াকোভ্লোভিচ প্রপ (১৮৯৫-১৯৭০) রচিত Morphology of the Folklore (১৯২৮) গ্রন্থে। তাতে ৩১টি সূত্র সন্নিবদ্ধ করেছেন ভ্লাদিমির প্রপ। প্রথমে গল্পে নায়কের অনুপ্রবেশ অতঃপর নির্দিষ্ট স্থানে গমন এবং খলনায়কের আবির্ভাব। খলনায়ক অসৎ উদ্দেশে নায়ককে সব দুর্গম অভিযানে উদ্বুদ্ধ করবে এবং তা সম্পন্ন হলে নায়িকার জীবনে তার প্রভাব পড়বে, বিরহ প্রলম্বিত হবে। এক সময় হয়তো সে মুক্তিও পাবে কিন্তু তখন সে চরম প্রতিশোধপ্রবণ হবে। নানা ইন্দ্রজাল এসে তখন তাকে বাধার সম্মুখীন করতে পারে বা বাধার মুখে পড়বে।
৩.
‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’ থেকে উদ্ধৃতি :
(ক) রাজ-সিংহাসন ফেলিয়া শীত উঠিয়া দেখেন, -মা! বসন্ত উঠিয়া দেখেন,- মা! সুয়োরানীর ছেলেরা দেখেন, -এই তাহাদের দুয়ো-মা! সকলে পড়িতে পড়িতে ছুটিয়া আসিলেন।...
(খ) পুরী র্থ র্থ কাঁপে! হাতের তরোয়াল ঝন্ ঝন্- রাজপুত্র হাকিলেন- ‘জানি না,-যে হও তুমি, রক্ষ রক্ষ দানব! -যদি রাজপুত্র হই, যদি নিষ্পাপ শরীর হয়, দৃষ্টির আড়ালে তরোয়াল ঘুরাইলাম, এই তরোয়াল তোমাকে ছাঁইবে!’

উপর্যুক্ত এসব রূপকথা ও লোককথায় অকল্যাণ ও অমঙ্গলের শক্তির বিপরীতে শুভচেতনা জয়ী হয়। কিন্তু এর পরতে পরতে ছাড়িয়ে আছে রোমাঞ্চ। উপভোগ্য এ রোমাঞ্চের ভেতরে এক সময় দেখা যায় রাক্ষস-খোক্কসের সব অপকৌশল ধরা পড়ে গেছে। বেঙ্গমা-বেঙ্গমী বা ভূত-পেত্নীর রহস্যও উন্মোচিত হয়েছে। এমন প্রতীকী ঘটনা প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিসূচক। দৈনন্দিন জীবনযাপনে আমাদের নানা ক্ষেত্রে যে কৌশলী ভূমিকা কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের যে বলিহারী আকাক্সক্ষা তা রূপকথার গল্পে বা কৌশলগত ফ্রেমে কিংবা সর্বদৈশিক রূপকথার কাহিনী-ঐক্যে-অনেকটা মিলে যায়- মেলবন্ধনও রচনা করে।

অশুভ শক্তির বিপরীতে যে শান্তি, মিলেমিশে বসবাসের যে আকাক্সক্ষা- বস্তুত তাই ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’র আকর্ষণবিন্দু। কিশোরদের কাছে গ্রন্থটির আগ্রহের কেন্দ্রও মূলত তাই। নীলকমল লালকমল গল্পে অতিপ্রাকৃত শক্তির তৎপরতা আছে। অলৌকিকত্ব কিংবা দ্বন্দ্বশীলতার বিষয়টিও এ গল্পে কম নয়। এ ছাড়া জাদুমন্ত্রের কলাকৌশলও বিদ্যমান। ‘ডালিম কুমার’ গল্পটিও এরকম। এসব গল্পে শুভবুদ্ধির জয় আর অশুভ-অপশক্তির পরাজয় ঘটেছে। এক্ষেত্রে মন্ত্র বা যাদুর যে কলাকৌশল তা সমাজের ভালো কিংবা উন্নতকিছুর দিকনির্দেশনা প্রদান করে। প্রসঙ্গত, ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’তে অপশক্তির শিকার হতে দেখা যায়, প্রধানত নারীদের। কেন? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের শোষণ ও পরিত্রাণ উভয়ই করেছে ‘পুরুষ’ (যেহেতু পুরুষ মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠিত সমাজ) দৃষ্টিকোণ থেকে।

মন্ত্র বা যাদুবলে নারী বিপদে পড়লে প্রধানত পুরুষরাই এগিয়ে এসেছে এবং সেটাই তার কৃতিত্ব, নারীও সেটি চায়- ফলে নারী-উদ্ধারের কাজটি পুরুষদেরই, প্রকারান্তরে পুরুষ-আস্থাও নারীদের। তাতেই পুরুষের বল বৃদ্ধি কিংবা সামাজিক মর্যাদা সাবলীল থাকে। আর নারীর লৈঙ্গিক ব্যাপারটি তো আছেই। র‌্যাডিক্যাল নারীবাদী সুলামিথ ফায়ারস্টোনকে এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করা যায়। কারণ, লিঙ্গিয় স্তরায়নই নারীর শ্রেণি ও সমাজ-মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে।

‘কাঞ্চনমালা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘কিরণমালা’, ‘মণিমালা’, ‘কলাবতী রাজকন্যা’, ‘কাঁকনমালা’ সব সৌখিন উচ্চতার ‘রমণী’। চিরায়ত বা আবহমান ঐতিহ্যে তারা এক কৃষ্টিতে গড়া। ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’র প্রায় সবগুলো গল্পই নারীপ্রধান। নারীর অসহায়ত্ব যেমন এতে ফুটে ওঠে তেমনি রূপময় ঐতিহ্যেরও তাতে প্রকাশ ঘটে। তবে পুরুষ তাতে একপ্রকার কর্তৃত্বপ্রবণ, বলশালী এবং আধিপত্যবাদী। সেখানে নারীরাও তা মান্য জ্ঞান করেছে। কিন্তু পুরুষ মূল্যবোধে এর গুরুত্ব কী?
পুরুষ অসহায় নারীকে উদ্ধার করতে এসেছে। পুরুষ কখনো শোষকও তো! আবার পুরুষের চোখেই নারীর অভিজ্ঞতাও সমাজে বিচার্য বিবেচিত হয়েছে। সেভাবেই তারা সমাজে বা গল্পে প্রতিষ্ঠিত। ফলে তাদের লিঙ্গিয় মর্যাদাও ওই মাপেই পুনর্গঠিত।

ফায়ারস্টোনের তত্ত্বও তাই বলে। ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’র অলৌকিক শক্তি বা অতিপ্রাকৃত শক্তিও নারী-পুরুষ মনস্তত্ত্বের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। নারী এবং পুরুষ উভয়ই অলৌকিক শক্তি দ্বারা প্রভাবাচ্ছন্ন। এগুলো অনেকটা টোটেমিক মিথের মতো অন্তর্লীনও বটে। রাক্ষস-খোক্কস থেকে শুরু করে নানা অবাস্তব প্রবণতা এ মিথের অন্তর্ভুক্ত, প্রশ্রয়ভুক্তও।

মানুষের ভেতরে ‘সত্যের জয় মিথ্যার ক্ষয়’ ভাবনাটি সামষ্টিক অবচেতনে সৃজিত। সেজন্য নানা প্রতীকের মাধ্যমেও তা রূপকাশ্রয় ঘটে। এই প্রতীকায়নে মানবমনের অবচেতন বা নির্জ্ঞান স্তর প্রণীত। একইসঙ্গে, তা দ্বান্দ্বিক চিন্তার স্বরূপে মানুষের সহজাত ও পূর্ব-ধারণায় পুনর্গঠিত।

 

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com