ছাপচিত্রে মুর্তজা বশীর

হাসনাত আবদুল হাই / ৮:০৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬,২০১৯

দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য শিল্পীজীবনে মুর্তজা বশীর নানাভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্যের কথা বাদ দিলেও প্লাস্টিক আর্টসে তার সৃজনশীলতার অভিব্যক্তি ঘটেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে, যার জন্য তার শিল্প-পরিচয় হয়েছে ক্রমান্বয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ। তার ভিতর সৃজনশীল প্রক্রিয়া এমনভাবে কাজ করে যে, তিনি কখনোই একঘেয়েমি বা পৌনঃপুনিকতা দেখা দিতে দেন না। বিষয় ও আঙ্গিকের নতুন দিগন্তের সন্ধানে তিনি সর্বদাই উন্মুখ হয়ে থাকেন, এটা বেশ স্পষ্ট। চিত্রকলার প্রায় সব আঙ্গিকেই তিনি ছাত্রজীবন থেকে কাজ করছেন, যে জন্য এসব নতুন নয় তার কাছে। এক জলরং ছাড়া ড্রইং, গ্রাফিক্স বা ছাপচিত্র, তেলরং, মোজাইক- সব আঙ্গিকেই তার বিচরণ স্বতঃস্ফূর্ত। তেলরঙে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, যার জন্য তেলচিত্রকর হিসেবেই তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। ড্রইংয়ে তিনি সিদ্ধহস্ত এবং তার উৎকর্ষ এখন প্রায় কিংবদন্তির মতো। ছাপচিত্রের আঙ্গিকে তিনি কাজ করেছেন মাঝে মাঝে, বিরতি দিয়ে। এই আঙ্গিকে তার কাজের সংখ্যা কম হলেও উৎকর্ষের দিক দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। শিল্পী হিসেবে মুর্তজা বশীর একজন বিশুদ্ধতাবাদী, যার জন্য যখন যে আঙ্গিকে কাজ করেছেন তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ইতস্ততা তার কোনো আঙ্গিকের কাজেই প্রভাব ফেলেনি, ছাপচিত্রেও নয়।

ছাপচিত্র দুই ধরনের। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে প্লেটের বা উপকরণের উপরিভাগের রঙের ব্যবহারে তৈরি ছবি, যেমন- উডকাট ও লিথোগ্রাফ। এখানে শিল্পী রং ব্লকের উপরিভাগে দিয়ে খোদাই করা অংশের শূন্যতা সাদায় পরিস্ফুট করে ছবি বা নকশা ফুটিয়ে তোলেন। ছাপচিত্রের দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে ইনটাগলিও পদ্ধতি, যেখানে অন্তর্গত রেখার সমাহারে ফুটিয়ে তোলা হয় ছবি। সাধারণত এসিড দিয়ে কপার বা জিঙ্ক প্লেটে এসব রেখা পরিস্ফুট করা হয়। প্রক্রিয়াটি টেকনিক্যাল শুধু নয়, বেশ জটিল; উডকাটে বা লিথোতে শিল্পীর যেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে এচিং, ড্রাই পয়েন্ট বা একুয়াটিন্টে ততটা নয়। দক্ষতার সঙ্গে ভাগ্য কিংবা দুর্ঘটনাও এখানে ভূমিকা পালন করে। বশীর দুই ধরনের ছাপচিত্রই তৈরি করেছেন, তবে দ্বিতীয় শ্রেণির আঙ্গিক রপ্ত করেছেন শিল্পীজীবনের মাঝামাঝি, সত্তরের দশকে প্যারিসে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকার সময়। এচিং, ড্রাই পয়েন্ট বা একুয়াটিন্টে ততটা নয়। দক্ষতার সঙ্গে ভাগ্য কিংবা দুর্ঘটনাও এখানে ভূমিকা পালন করে।

ছাত্রজীবনে বশীরকে উডকাট বা লিনোকাট- এই মাধ্যমে কাজ শিখতে হয়েছে পাঠ্যসূচির অন্তর্গত বিষয় হিসেবে। যখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, সেই সময় ১৯৫০ সালে নিমতলীতে জাদুঘরে অনুষ্ঠিত ঢাকা আর্ট গ্রুপের দ্বিতীয় বার্ষিক প্রদর্শনীতে তার কিছু প্যাস্টেল ও তেলচিত্র ছাড়াও একটি লিকোকাট এবং তিনটি উডকাটের কাজ প্রদর্শিত হয়েছিল।

‘সময়ের ছাপ’ নামে লিকোকাটের বিষয় ছিল এক বৃদ্ধার বলিরেখাপূর্ণ মুখের দৃশ্য। সাদা-কালো রঙে বার্ধক্যের বাস্তবতাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন কুশলী রেখায়। তিনটি উডকাটের মধ্যে আলো-আঁধারিতে কর্মরত কম্পোজিটরের উপবিষ্ট অবয়বে একই সঙ্গে ক্লান্তি ও মগ্নতার প্রকাশ ঘটেছিল। ছবিটি দেখে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রশংসা করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট আয়োজিত প্রথম চিত্রকলা প্রদর্শনীতে বশীরের তিনটি উডকাট অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে দুটি পুরনো এবং একটি ছিল নতুন। ছাত্রজীবনে অন্যান্য আঙ্গিকের পাশাপাশি তিনি যে ছাপচিত্রে মনোযোগ দিয়েছিলেন এসব তার দৃষ্টান্ত, যদিও সংখ্যায় খুব বেশি ছিল না। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে বর্ধমান হাউসে ‘চিত্রকলা ও ফটোগ্রাফি’ শীর্ষক যে প্রদর্শনী হয় সেখানে স্থান পায় ‘রক্তাক্ত একুশে’ নামে তার লিনোকাট। এতে ছিল একুশের ভাষা আন্দোলনে পুলিশের হামলায় নিহত/আহত এক আন্দোলনকারীর মাথা কোলে নিয়ে সহকর্মীর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণার ভঙ্গি। এই লিকোকাটের কাজটি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে সংকলন’-এর জন্য বশীর এঁকেছিলেন। বর্ধমান হাউসের প্রদর্শনীতে এই ছবিটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, কেননা তখনো ভাষা আন্দোলনের রেশ চলছে এবং ছাত্র থেকে শুরু করে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা কাজ করছে। বশীর তার এই লিনোকাটের কাজে মার্ক্সীয় সমাজবাদী বাস্তবতার অনুসরণে বলিষ্ঠ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং জঙ্গি প্রত্যয়ের ব্যবহার করেছিলেন, যা তাকে সমাজ পুনর্নির্মাণের কর্মী হিসেবে পরিচিতি দেয়।

১৯৫৪ সালে সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বশীর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আশুতোষ মিউজিয়ামে আর্ট অ্যাপ্রেসিয়েশনের এক কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। এই সময় তিনি লিনোকাটে তিনটি কাজ কারণে- যার নাম ছিল, বিড়ি বিক্রেতা, জুতা পলিশ করা বালক এবং সন্ধ্যায় কলকাতার একটি গলি। ছাত্রজীবনে তিনি দুটি উডকাট এবং একটি লিনোকাট করেছিলেন, যা কোনো প্রদর্শনীতে দেখানো হয়নি। এগুলো ছিল- একতারা হাতে বাউল, চশমা চোখে যুবক এবং ঘরে ফেরা। প্রথম দুটি ছিল উডকাটে এবং তৃতীয়টি লিনোকাটে। ‘ঘরে ফেরা’ নামে লিনোকাট কাজে ক্ষুদ্র পরিসরে অনেক ফিগার দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে তৈরি হয়েছে একটি নিটোল গল্প। এই কাজে কম্পোজিশন ও ফর্মের ব্যবহারে বেশ কুশলতা দেখিয়েছিন বশীর।

১৯৫৭-তে ফ্লোরেন্স থেকে ঢাকায় ফিরে আসার পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাকে লিথোগ্রাফ আঙ্গিকে কাজ করতে বলেন। এরপর কয়েক মাসে তিনি লিথোগ্রাফে ছয়টি কাজ শেষ করেন এবং প্রতিটি মাত্র ১০টির কপি ছিল। প্রথম থেকেই বশীর কপির সংখ্যা বৃদ্ধি করে ছাপচিত্রের অবমূল্যায়নের বিপক্ষে ছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অবশ্য যারা ছাপচিত্রের মাধ্যমে শিল্পকর্মকে জনসাধারণের কাছে বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার কথা ভাবেন তাদের পার্থক্য রয়েছে। ছাপচিত্রকেও চিত্রকলার অন্যান্য শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম মনে করেন বলে বশীর সংখ্যার প্রতি জোর দিয়েছেন। আর্ট ও ক্র্যাপটের মধ্যে তিনি এভাবে সীমারেখা টেনেছেন। তার সঙ্গে একমত না হলেও শিল্পী হিসেবে তার এই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয়।

১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে সর্বপ্রথম এচিং, ড্রাই পয়েন্ট ও একুয়াটিন্টের আঙ্গিক ব্যবহার করে তৈরি বশীরের কিছু কাজ দেখতে পাওয়া যায়। এসব ছবি তিনি প্যারিসে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকার সময় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সালে করেছিলেন।
এচিং, ড্রাই পয়েন্ট, একুয়াটিন্টে আঙ্গিক শেখার জন্য তিনি একাডেমি গোয়েজে গিয়ে ইতালিয়ান মিনিয়েচারিস্ট এবং এচার লিকার্ড লিকোডোর কাছে অনুশীলন নিয়েছিলেন। এই একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা গোরেজ এচিংয়ে ‘কারবুরেনদাম’ কৌশল উদ্ভাবন করেন, যা তার বন্ধু মিরোকে এচিংয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করে। বশীর এচিং শেখার সময় ‘কারবুরেনদাম’ পদ্ধতি রপ্ত করেন, যার মাধ্যমে রঙের প্রলেপে কুয়াশা বা শিশিরের আভা ফুটে ওঠে। বশীর একুয়াটিন্টে নিজের উদ্ভাবিত একটি কৌশল ব্যবহার করে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

বিশেষ করে বিমূর্ত ছাপচিত্রে এই কৌশল বেশ সফল হয়েছিল। প্যারিসে ছাপচিত্রের নতুন আঙ্গিক শেখার সময়ই তিনি দেখিয়েছিলেন যে গয়া, রেমব্রা, টার্নারের মতো বিখ্যাত শিল্পীরা একটি নয়, একাধিক আঙ্গিক ব্যবহার করে ছাপচিত্র তৈরি করেছেন। যেমন, এচিং ও একুয়াটিন্টে অথবা একুয়াটিন্টে ড্রাই পয়েন্ট ইত্যাদির মিশ্রণ। এই মিশ্রণ পদ্ধতি বেশ জটিল ও কঠিন। এখানে সফল হওয়া সহজসাধ্য নয় জেনেও বশীর বেশকিছু কাজে আঙ্গিকের সংমিশ্রণ করেছিলেন। কাজগুলো যে সফল হয়েছিল তা সিটিং ন্যুড (ড্রাই পয়েন্ট ও এচিংয়ের মিশ্রণ) কাজটি দেখলেই বোঝা যায়। ইমেজ সিরিজের ২৫টি কাজই অবশ্য কেবল একুয়াটিন্টে করা। ইমেজের সব বিষয়ই বিমূর্ত এবং এখানে কিছু ছবিতে তার ‘ওয়াল’ সিরিজের প্রতিফলন দেখা যায়।

তিনি ‘ওয়াল’ সিরিজের বিষয়কে ভিত্তি করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ইমেজ সিরিজের বেশকিছু একুয়াটিন্টে ছাপচিত্র তৈরি করেছেন, এর বেশির ভাগই ছিল প্যারিসে স্বেচ্ছানির্বাসনের সময় তৈরি। প্যারিসে ‘এপিটাফ ফর মার্টার’ সিরিজের কাজ শুরু করেন এবং এই সিরিজে দুটি ছবি আঁকেন এচিংয়ের আঙ্গিকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসে ‘ওয়াল সিরিজে ও এপিটাফ সিরিজের কিছু কাজ তিনি এচিংয়ে করেছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, একটি বিষয়কে তিনি তেলরং এবং ছাপচিত্র, উভয় আঙ্গিকেই উপস্থাপন করতে পারেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। বশীর তার ড্রইং এবং বিষয়ে তার ব্যবহার সম্পর্কে এতই বিশ্বাসী যে, এ ধরনের পূর্ব প্রস্তুতিতে কখনোই যাননি। এটি তার যেমন বিশেষত্ব একই সঙ্গে নতুন আঙ্গিকের ওপর তার দক্ষতার পরিচয় দেয়।

সম্পাদক : ড. কাজল রশীদ শাহীন
প্রকাশক : মো. আহসান হাবীব

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-১৮-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: editorkholakagoj@gmail.com
            kholakagojnews7@gmail.com