জলে মঙ্গলে

শফিক হাসান / ৫:০২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩,২০১৯

তিন ছয়ে আঠারো তলা ছাড়িয়েও ভবনগুলো আরও বড় আকারে নির্মাণের সময় কেউই বিবেচনায় রাখেনি- নিচের দুইটা ফ্লোর ছাড়তে হবে জলাবদ্ধতার জন্য! মহানগরীর নিচতলায় বসবাসকারীদের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। জল থই থই করে...!

পনেরো মিনিটের বৃষ্টিতে কোত্থেকে এলো এত পানি নয়ন মাদবর ভেবে সারা! মর্জিনা-জনসন ভবনের সিকিউরিটি গার্ড সে। এ ক’দিনে কাজকর্ম বলতে গেলে নেই। বাইরের লোকজন আসছে না, ভেতরের লোকজনও বেরুচ্ছে না তেমন! অফুরন্ত অবসরে টুপাইস ইনকামের সন্ধান পেয়েছে নয়ন। মহল্লার রাস্তাটা খালে রূপ নিয়েছে, সামনের বড় রাস্তাটা পেয়েছে সমুদ্রের চেহারা! বস্তির ছেলেমেয়েরা হুটোপুটি খাচ্ছে। জেলেরা মাছ ধরার চেষ্টা করছে। মহল্লার ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রেতা সেলিম গতকালের অবিক্রীত মাছগুলো সাজিয়ে শুরু করেছে হাঁকডাক- তাজা মাছ, এখন ধরা! এসব দেখতে দেখতে নয়ন নৌকার দিকে এগোয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছে সে। প্রতি ট্রিপে বেতন ৫০০ টাকা।

অফিসযাত্রীরা লুঙ্গিতে মালকোঁচা মেরে এসেছে। পলিথিনে নেওয়া হয়েছে অফিসের কাপড়। রাস্তায় নেমেছে কয়েকটি শাহী নৌকা। মাঝি-মাল্লারা অফিসযাত্রীদের লক্ষ্য করে বয়ান দিচ্ছে- আয়া পড়েন, ডাইরেক মতিঝিল...! মিরপুর টু মতিঝিল নৌকা সার্ভিসের কন্ডাক্টর নয়ন ভাড়া হাঁকছে জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে। যাত্রীরা বলল, ৩০ টাকার ভাড়া ৩০০ কেন! নয়নের জবাব তাচ্ছিল্যভরা-
‘বাসের ভাড়ায় নৌকায় যাইবার চান!’ এমন ধৃষ্টতায় এক যাত্রী বলল, ‘তোর কি তেল-গ্যাস লাগে!’
‘মেট্রোরেলেও তেল-গ্যাসের ব্যাপার নাই। মেট্রোরেলে যান!’

বচসা চলতে পারত অনেকক্ষণ। কিন্তু সামনে চলছে ‘অশ্রুজলে সমুদ্র’ নাটকের শুটিং। পরিচালক মন্টু বসাকের সময়োপযোগী চিন্তা- কক্সবাজারে না গিয়ে কম খরচে ঢাকাতেই শুটিং করা যায়। এটাকেই সমুদ্রসৈকত হিসাবে চালানো যাবে।

শুটিং শুরু হয়েছে। বাসা থেকে মোলায়েম মেকআপ নিয়ে এসেছিল নায়িকা মনীষা মার্জিয়া। ছিটকেপড়া বৃষ্টির নোংরা জলে মেকআপ ধুয়ে-মুছে যাওয়ায় চেঁচামেচি করল অনেকক্ষণ। বাধ্য হয়ে পরিচালক নতুন করে মেকআপের ব্যবস্থা করালেন। ফের শুটিং শুরুর সময়েই কোথা থেকে উড়ে এসে সাইড চাচ্ছে নৌকার বহর!

পরিচালক মাঝিদের বোঝালেন, তাকে একটু সময় দিতে হবে। মাঝিরা সানন্দে শুটিং দেখছে। ঝামেলা পাকালো অফিসগামীরা। কার বস কত কড়া, দেরিতে গেলে ‘অনুপস্থিত’ হবে এমন হট্টগোলে সবাই আবেদন জানালো সাইড দেওয়ার। নৌকাজটের মধ্যে একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লেগে উল্টে গেল একটি নৌকা। পাল্টাপাল্টি দায় চাপানোয় শুটিং চলল না ঠিকমতো। পরিচালক খেদোক্তি করলেন, এ জাতি সংস্কৃতিবান হলো না!

এমনিতেই যাত্রীদের মেজাজ ছিল চড়া, অপমানব্যঞ্জক কথায় শব্দও চড়া হলো। শব্দদূষণের মধ্যে জেলেদের ইলিশ শিকারের খবরটা চাপা পড়ে গেলো। ইলিশ উঠল সেলিমের দোকানে। উৎসাহী প্রচারণা শুরু করলো সে- নিয়ে যান বন্যার ইলিশ...! এরই মধ্যে নায়িকা ঘোষণা দিলো, বগিজগির মধ্যে শুটিং করতে পারবে না। রোমান্টিক সংলাপ ডেলিভারির মুড আসছে না! পরিচালক বাধ্য হয়ে বিরতি দিলেন। এরই মধ্যে দেখা গেল দেশি-বিদেশি কয়েকজন পর্যটককে। জলকেন্দ্রিক পর্যটনের গুরুত্ব বিষয়ে আলোচনায় মাতলেন তারা। অদূরে দেখা গেল সমকালীন বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একজন কবিকে। বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে শুরু করলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা আবৃত্তি। সেটা লাইভ হচ্ছে ডিটিভিতে। গদগদ কণ্ঠে আবৃত্তি চলছে- প্রিয় ইন্দিরা, তুমি বিমানের জানলায় বসে,/গুজরাটের বন্যা দেখতে যেও না/এ বড় ভয়ঙ্কর খেলা...।

লাইভে ব্যাঘাত ঘটাল বিরোধী দলের মাইকিং। কথায়-স্লোগানে বক্তারা বোঝানোর চেষ্টা করলেন- বর্তমান সরকার সামান্য পানিই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পুরো দেশ পরিচালনা করবে কীভাবে...। নয়নের নৌকা মাঝি গেছে সদরঘাটে। একটা লঞ্চ ভাড়া করার তালে আছে সে। বেশি যাত্রী বহন করা যাবে। ভারপ্রাপ্ত মাঝি নয়ন আবৃত্তিরত কবির কাছাকাছি এলে বেজে উঠল ফোন। বড় স্যার হুংকার দিয়ে জানালেন, এখনই নয়নকে সামনে দেখতে চান।

চাকরি বাঁচাতে নৌকা থেকে নেমে সাঁতরাতে শুরু করলো নয়ন। এদিকে নৌকাবাসী জনতা নয়নসহ দেখা-অদেখা সবার চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে চলেছে। এ দেশে একজন মানুষের মধ্যে যদি দায়িত্বশীলতা থাকতো...!

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
উপদেষ্টা সম্পাদক : মোশতাক আহমেদ রুহী

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১, সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা
ফোন : বার্তা-৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৭, মফস্বল-৯৮২২০৩৬
বিজ্ঞাপন-৯৮২২০২১, ০১৭৮৭ ৬৯৭ ৮২৩,
সার্কুলেশন-৯৮২২০২৯, ০১৮৫৩ ৩২৮ ৫১০
Email: kholakagojnews7@gmail.com
            kholakagojadvt@gmail.com