প্রস্তুতি বনাম সংশয়

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ ১৪২৫

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

প্রস্তুতি বনাম সংশয়

রহমান মুফিজ ১০:৫৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০১৮

print
প্রস্তুতি বনাম সংশয়

প্রস্তুতি ও সংশয় এ দুই দোলাচলের ভেতর দিয়ে দেশ অগ্রসর হচ্ছে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের দিকে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা  প্রত্যেক দল ও জোট নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোলেও আদৌ নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবে কি না, নির্বাচন হলেও অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে কি না-এ নিয়ে সংশয় এখনো কাটাতে পারেনি সরকার।  সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলেছে আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে জিসেম্বরের শেষে বা আগামী বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত শনিবার সেহারাওয়াদী উদ্যানের সমাবেশ বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নির্বাচন নিয়ে। তিনি বলেছেন ‘নির্বাচন কখন হবে জানি না।’ তিনি আগামী দিনগুলো সম্পর্কে অস্পষ্টতার ইঙ্গি দিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আবার ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতির কথাও বলেছেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। সর্বশেষ গত সেপ্টম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর উত্তরাঞ্চল সফরের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে তাদের চূড়ান্ত নির্বাচনী প্রস্তুতি। ওই সময় দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এ যাত্রা আমাদের নির্বাচনী যাত্রা। এ যাত্রা অব্যাহত থাকবে।’ ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা সফর করেছে আওয়ামী লীগ। এরপর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সফর সম্পন্ন করেছে সড়কপথে। এ ছাড়া গত ১ অক্টোবর থেকে ৭ অক্টোবর সারা দেশে গণসংযোগ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি ভোটারদের কাছে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে দলটি। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলের নেতাকর্মীরাও অংশ নিয়েছে এসব নির্বাচনী যাত্রা ও গণসংযোগে।
শুধু তাই নয় আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে তাদের প্রার্থী মনোনয়নের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। দলীয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা খবর থেকে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি ও দলীয় পর্যায়ের কয়েকটি জরিপ পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে প্রায় ১৭৪ জনের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন।
অপরদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রত্যেকে জোটই ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছে। ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ছোট শরিকরা বড় শরীক বিএনপির কাছে অন্তত ১০০ আসন চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তার মধ্যে গণফোরাম ৩০, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ৩০, নাগরিক ঐক্য ৩০ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অন্তত একশ আসন বিএনপির কাছে চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে জোট সংশ্লিষ্টরা। বিএনপি এককভাবে বা ২০ দলীয় জোটের অন্য শরিকদের নিয়েও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রত্যেক দল ও জোট মূলত নির্বাচনমুখী কর্মসূচি ও প্রচারণা নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছে। যদিও বিএনপির মতো প্রধান দল আদৌ নির্বাচনে যাবে কি না এ নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। তারা সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনে যেতে রাজি নয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করার পাশাপাশি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির শর্ত দিয়েছে সরকারকে। সরকার তাদের সেসব শর্তকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়েছে। বিদ্যমান সংসদ বহাল রেখে নিজিদের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। অথচ সরকারের বাইরে সব বিরোধী দলই সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। এমনকি অনেকে প্রয়োজনে নির্বাচন বর্জনের হুমকিও দিয়েছে। এ অবস্থা বহাল থাকলে ফের দশম জাতীয় নির্বাচনের মতো এক তরফা নির্বাচনের আশঙ্কা করছে। অনেকে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবে কি না এ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে।
সংবিধানের দোহায় দিয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন মহাজোট যে অবস্থান নিয়েছে মাঠের বিরোধী দলগুলো তার বিপরীতে নানা দাবি-দাওয়া পেশ করছে। নির্বাচনের আগে সংলাপের বিকল্প নেই বলে গত শনিবার মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অপরদিকে সংলাপের কোনো প্রয়োজনই নেই বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ অবস্থায় নির্বাচনী পরিবেশের লক্ষ্যে সংলাপ-সমঝোতার সম্ভাবনা প্রায় ক্ষীণই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নির্বাচনী প্রস্তুতি ও নির্বাচন নিয়ে সংশয় এ দুইয়ের ভের দিয়েই এগোতে হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে সব ধরনের সংশয় কাটানো এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপর। কিন্তু সরকার বা ক্ষমতাসীনরা সে পথে এগোচ্ছে কি না সেটাই এখন অস্পষ্টতায় খাবি খাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।