সংকট মোকাবেলায় কৌশলী বিএনপি

ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ৯ কার্তিক ১৪২৫

সংকট মোকাবেলায় কৌশলী বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮

print
সংকট মোকাবেলায় কৌশলী বিএনপি

বাংলাদেশে যে কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে বৈরিতা আরও তীব্র করে তুলেছে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল এর মধ্যে অন্যতম। এ ঘটনা সম্পর্কে প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে আসছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং তাদের সহযোগীরাই এ হামলার পেছনে ছিল। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল সেদিন। সে কারণেই তারা এ ঘটনার সঠিক তদন্তে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছে। রায়ের প্রতিফলনে তেমনটাই ঘটেছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর বিএনপি ফের সংকটে পড়তে যাচ্ছে কি না, এখন নতুন করে সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি নেতারা মুখে এ রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ফরমায়েশি বললেও ভেতরে ভেতরে এ রায় যে তাদের দলের রাজনীতির ওপরে প্রভাব পড়বে তা অস্বীকার করছেন না। তারা এখন কীভাবে সেই প্রভাব মোকাবেলা করবেন সেই কৌশল খুঁজছেন।
রায়ের আগের দিন লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও বার্তায় নেতাকর্মীদের শান্ত থাকতে বলেন। এ ছাড়া দলের হাইকমান্ড থেকে সাংগঠনিক জেলা শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কর্মসূচি পালনে সামনে না থাকার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত আন্দোলন টার্গেট করেই এসব করা হচ্ছে। কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি রায়ের পর কঠোর কর্মসূচি দেয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে ২ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দলটির অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে ৫ দিন কর্মসূচি পালন করবে বলে জানানো হয়েছে। সব কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয় সরকারের দাবি নিয়ে মাঠে সোচ্চার আছে বিএনপি। এ নিয়ে তারা আগামীতে কঠোর আন্দোলনে যাবেন। জাতীয় ঐক্যের সঙ্গেও তাদের কথাবার্তা চলছে। কিন্তু সেটা যেন গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘিরে না হয় সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের সাজার বিষয়টি কৌশলগত কারণে সামনে আনতে চায় না বিএনপি।
সরকার চাচ্ছে আমরা তারেক রহমানের সাজাকে ইস্যু বানিয়ে বিএনপি রাজপথে নামুক। এ ইস্যুতে মাঠে নামলে বিএনপিকে দমন করা সহজ হবে। কিন্তু বিএনপি সরকারের সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে না। বিএনপির টার্গেট সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সেই লক্ষ্যেই বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর সংকট সৃষ্টি হলে দলের শীর্ষ নেতারা ঐক্যবদ্ধ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেন। এ ক্ষেত্রে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের নেতাদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন। কিন্তু  এবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় ফের কিছুটা সংকটে পড়েছে দলটি।
যদিও এ রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে এতে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য তৃণমূলে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকরা বিচার-বিশ্লেষণও করছেন।
তারা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এ মামলার রায়ের পেছনে সরকারের ষড়যন্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন নিয়ে সন্দেহ করেছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। রায়ের পর বিএনপি সংকটে পড়বে রায়ের আগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এমন মন্তব্যে তাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ১(ঘ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ‘নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে’ তবে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। সংবিধানের আলোকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ১২ অনুচ্ছেদেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বর্ণনা দেওয়া আছে। এতে বলা হয়েছে, কেউ নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকে, তবে তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে খসড়া পাঠিয়েছে ইসি। এতে সরকার একটি ধারা যুক্ত করতে পারে বলে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন।
এ ধারায় দলীয় নেতৃত্বে সাজাপ্রাপ্তদের না রাখার বিধান যুক্ত হতে পারে। আর তা সত্য হলে কোনো রাজনৈতিক দলে দণ্ডিত দুর্নীতিবাজ, যার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং যিনি সংসদ সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য তিনি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না। বিএনপি নেতাদের সন্দেহ, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দিতে এটা করা হতে পারে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ জন্য, একতরফা নির্বাচন করার জন্য এই রায় একটি কারাসাজি।  
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ রায়ের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণ হলো, এ দেশে কোনো নাগরিকের সঠিক বিচার পাওয়ার অধিকার নেই। ফখরুল আরও বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দলীয় তদন্তকারীর চক্রান্তে সাজানো মামলায় তারেক রহমানকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এটা জানার পরেও কেউ কেউ দল থেকে তার পদত্যাগের যে পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের কাছে জনগণ প্রশ্ন করতে পারে, এত শত গুম, খুন করার জন্য দায়ী সরকারের পদত্যাগ কি তারা দাবি করেছেন? নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়কে যখন আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন ও বিএনপিকে দুর্বল করার অসৎ উদ্দেশ্য বলছি, তখন সেই রায়ের ভিত্তিতে আমাদের নেতা তারেক রহমানের পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না।

 
.