জোট নয় দলীয় প্রার্থী চায় আ.লীগ

ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ৯ কার্তিক ১৪২৫

জোট নয় দলীয় প্রার্থী চায় আ.লীগ

শ ম সাজু, রাজশাহী ১২:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮

print
জোট নয় দলীয় প্রার্থী চায় আ.লীগ

দরজায় কড়া নাড়ছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। অক্টোবরে তফসিলের পর শুরু হবে মূল ভোটযুদ্ধ। সম্ভাব্য প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের ঘুম উধাও। এ নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন

জাতীয় সংসদের রাজশাহী সদর আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগ বিরোধী শিবিরের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনেও এখানে পরাজিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রবাসী মন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এএইচএম কামারুজ্জামান সেই নির্বাচনে জাসদের প্রার্থী মঈনুদ্দিন আহমেদ মানিকের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এরপর আর কখনো জাসদের জয় মেলেনি এখানে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ৫৩ নম্বর আসন রাজশাহী-২। রাজশাহী সদর আসন হিসেবে পরিচিত এ আসনে বর্তমানে আওয়ামী লীগের চেয়ে রিজার্ভ ভোটে এগিয়ে বিএনপি। এরপরই রয়েছে জামায়াতের অবস্থান। আর রয়েছে বিশাল একটি অংশ, যারা সরাসরি কোনো দলের সমর্থক নন; কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধী। অন্য এলাকার তুলনায় আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটের সংখ্যা রাজশাহীতে একটু বেশি বলে দাবি করেছেন অনেকে।

বিশেষ করে দেশ ভাগ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভারত ছেড়ে এসে বাংলাদেশে বাসিন্দা হয়েছেন, তারা বেশিরভাগই আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না। আর ভারত থেকে চলে আসা ভোটারের সংখ্যা এখানে প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে আওয়ামী লীগ বিরোধী মানসিকতায় এখানে সংসদ নির্বাচনে বারবার মার খেয়েছে নৌকা। তবে ২০০৮ সালে জোটগতভাবে নির্বাচন হলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মাধ্যমে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ।

এবারের নির্বাচনেও এখানে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে লড়বেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। তার মনোনয়নের বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত। বিএনপি থেকে একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও এগিয়ে রয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র ও সাংসদ মিজানুর রহমান মিনু। বিএনপি জোট থেকে যিনিই মনোনয়ন পান না কেন, ভোটের মাঠের নানা সমীকরণে তিনিই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন বলে মনে করেন এখানকার বেশিরভাগ ভোটার।

প্রথম সংসদে জাসদের পর দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে এমপি হন বিএনপির এমরান আলী সরকার। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টির শাসনামলে তৃতীয় ও চতুর্থ নির্বাচনে এখানে এমপি হন জাতীয় পার্টির মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বাবলু। পঞ্চম ও সপ্তম সংসদে বিএনপির অ্যাডভোকেট কবীর হোসেন এমপি নির্বাচিত হন। দেশের সব রাজনৈতিক দল ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন বয়কট করায় রাজশাহী সদর আসনে সে সময় নির্বাচন হয়নি। আর অষ্টম সংসদে বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু এমপি নির্বাচিত হবার পর তার মেয়াদ শেষে এবং ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী পরিস্থিতিতে নবম সংসদ থেকে রাজশাহী সদর আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায় বিএনপির। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে নবম সংসদে এমপি নির্বাচিত হন ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা। দশম সংসদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকায় তিনি বিনা ভোটে আবারও এমপি নির্বাচিত হন।

আসনটির নবীন-প্রবীণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০ বছরে ফজলে হোসেন বাদশা এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন। নগরীর প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তার উন্নয়নের ছোঁয়া। দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে। তার উদ্যোগে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বন্ধ থাকা রাজশাহী রেশম কারখানার চাকা সম্প্রতি আবার ঘুরছে। চালু হয়েছে শাহ মখদুম বিমানবন্দর। এগিয়ে চলেছে রাজশাহীতে আইটি ভিলেজের তথা তথ্যপ্রযুক্তি গ্রাম নির্মাণকাজ। এরপরও আওয়ামী লীগের ওপর ভর করা ছাড়া নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার মতো সাংগঠনিক অবস্থান নেই ফজলে হোসেন বাদশার। ফলে রাজশাহী সদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনটি শরীক দলকে ছেড়ে দিতে চান না এখানকার বেশিরভাগ আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী ও সমর্থক।

রাজশাহী সদর আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। কিন্তু কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। কাজেই সদর আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতা নেই বললেই চলে।

আগামী নির্বাচনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পেলেও ২০০৮ সালের মতো এবারের নির্বাচনে ফজলে হোসেন বাদশার পক্ষে একাট্টা হয়ে মাঠে নামার বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ নানা কারণে নাখোশ তার প্রতি। তাদের অভিযোগ, ফজলে হোসেন বাদশা আওয়ামী লীগের লোকজনকে মূল্যায়ন করেননি। তাই এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন চান তারা। তাদের বক্তব্য, দল ক্ষমতায় থাকলেও দলীয় এমপি না থাকায় বিভাগীয় শহরের এই আসনটিতে সাংগঠনিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগ। তারা ফজলে হোসেন বাদশাকে শহরের পাশের কোনো আসন ছেড়ে দিয়ে রাজশাহী সদর আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের পছন্দের তালিকার প্রথমে আছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মেয়রপত্নী শাহীন আকতার রেনী। গত সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে লিটনকে বিজয়ী করতে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন থেকে নগরীর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। এমনকি নগরীর যে কোনো পাড়া-মহল্লার ছোট-খাটো অনুষ্ঠানে তাকে সম্পৃক্ত করলে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে গুরুত্ব দিয়েই সেসব অনুষ্ঠান সফল করেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারও নির্বাচন করতে চান রাজশাহী সদর আসনে। তিনি নিজেও ফজলে হোসেন বাদশাকে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতি নন। মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবু ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক পিন্টুও নির্বাচন করতে চান এ আসনে।

রাজশাহী সদর আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক মেয়র ও সাবেক এমপি মিজানুর রহমান মিনু। মনোনয়ন দৌড়ে তিনি এগিয়ে রয়েছেন। রাজশাহী সিটির দীর্ঘদিন মেয়র এবং সদর আসনের একবার সংসদ সদস্য হিসেবে এখানকার উন্নয়নে মিনুর ভূমিকার কথা স্বীকার করেন বিরোধী পক্ষও। রাজশাহী শহরের উন্নয়নের রূপকার ধরা হয় তাকে। এরপর সেই উন্নয়নের ধারা আরও বেগবান করেন সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মিনুর নেতৃত্বেই এ অঞ্চলে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তবে তার বিরোধীরা চান এখান থেকে নির্বাচন করুন দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মিনুর সঙ্গে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সদ্য সাবেক সিটি মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলেরও বিরোধ রয়েছে। এমপি পদে বুলবুল মনোনয়ন পেলেও আশ্চর্য হবেন না দলের নেতাকর্মীরা। আবার সাবেক প্রতিমন্ত্রী কবীর হোসেনও এবার রাজশাহী-২ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন বলে মনে করেন বিএনপির সিনিয়র অনেক নেতা। রাজশাহী-২ আসনের মোট ভোটার ২ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন।

 

 
.