সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে হোঁচট খেল বিএনপি

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে হোঁচট খেল বিএনপি

মাহমুদুল হাসান ১০:০০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০৫, ২০২১

print
সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে হোঁচট খেল বিএনপি

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মূলত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যানারে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবি এবং নাম না থাকায় এ অসন্তোষ শুরু হয়।

নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে এর পিছনে ‘ষড়যন্ত্র’ দেখছেন। কেউ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এর বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন; আবার কেউ জানাচ্ছেন নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। দলের কেউ কেউ বলেছেন, নেতাকর্মীদের ভিতরে এ নিয়ে বিস্ফোরণ তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি ‘স্বাধীনতা পতাকা উত্তোলন দিবসের’ আলোচনা সভার ব্যানারেও তিনজনের ছবি ব্যবহার করা হয়। তৃতীয় দিনেও তিনজনেরই ছবি রাখা হয়। তাহলে উদ্বোধনী দিনে কেন খালেদা জিয়ার ছবি রাখা হয়নিÑএমন প্রশ্ন রাখেন নেতাকর্মীরা। এছাড়া অনুষ্ঠানগুলোতে কারা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনাচ্ছেন তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ।

বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে কারা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনাচ্ছেন? মুক্তিযুদ্ধে তাদের কী অবদান ছিল? অনেকের তো তখন জন্মই হয়নি। তারা হচ্ছেন অনুষ্ঠানে অতিথি! আর মুক্তিযোদ্ধারা আমন্ত্রণই পান না। তিনি এর ব্যাখ্যা দেন, ব্যানারের নামগুলো দেখলেই সব পরিষ্কার বোঝা যায়, কারা এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাচ্ছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বছরব্যাপী সব অনুষ্ঠানের ব্যানারে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি রাখার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া প্রতিটি অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোরও সিদ্ধান্তু নেওয়া হয়। সেভাবেই কর্মসূচিও চূড়ান্ত করা হয়। শুরুতে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ধাপে ধাপে প্রতি মাসের কর্মসূচি ঘোষণা করার কথা বলা হয়। কিন্তু ১ মার্চ গুলশানে হোটেল লেকশোরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যানারে দলীয়প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার ছবি এবং নাম রাখা হয়নি। এ নিয়ে দলের নেতারা খালেদা জিয়াকে ‘মাইনাসের ষড়যন্ত্র’ দেখতে পান। দলের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েক নেতাও এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাননি। এছাড়া ২০ দলীয় জোটের নেতাদের অনেককেই অনুষ্ঠানে দেখা গেলেও জোটের অন্যমত শরিক জামায়াতে ইসলামীকে রাখা হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদেরও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।

জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বিএনপির একটি কমিটি আছে, তারা এসব বিষয়ে বলতে পারবে। এ নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।

ব্যানারে খালেদা জিয়ার ছবি না থাকার বিষয়টি নিয়ে দলের কেন্দ্রসহ তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তোলপাড়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, বদলে যাওয়া এ এক অন্যরকম বিএনপি। সব আছে, সবাই আছে, শুধু নেই বেগম খালেদা জিয়ার ছবি ও নামটি। এই ঘোর দুষ্কালেও অনেকেই ছিলেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এই জঁমকালো অনুষ্ঠানে। তবে বিএনপির আমন্ত্রণ পেয়েও সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতারা এবং দাওয়াত না পাওয়ায় জামায়াত নেতারাও ছিলেন অনুপস্থিত।
গত বুধবার মারুফ কামাল খান ফেসবুকে আবার লেখেন, ব্যানারে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নাম বা ছবি কোনোটাই ছিল না। এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্নের সঞ্চার হয়। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কারণ জানতে চান। জানতে চান, এটা কি নিছক ভুল নাকি পরিকল্পিত কোনো চক্রান্ত?

তিনি আরও লেখেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সেই তথাকথিত এক-এগারোর ট্রমা থেকে বিএনপি এবং এই দলের নেতাকর্মীরা আজও মুক্ত হতে পারেনি...। সে ক্ষোভের কথা বিভিন্ন মিডিয়ায়ও এসেছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আমি নিজেও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছি। অবশেষে জানলাম, বিএনপির উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব আব্দুস সালাম এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, ভুলে নয়, ভেবেচিন্তেই এটা করেছেন তারা। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বিএনপির বর্ষব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানটিকে দলীয় গ-িতে না রেখে ‘সার্বজনীন’ করার লক্ষ্যেই নাকি খালেদা জিয়ার ছবি ব্যানারে না রাখার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

মারুফ কামাল লেখেন, অনুষ্ঠানটি দল হিসেবে বিএনপির। সেটার দলীয় পরিচয় মুছবেন কী করে? আর সার্বজনীন মানে কী? শহীদ জিয়াকে যারা মানেন, তাদের কাছে কি খালেদা জিয়া অগ্রহণযোগ্য? যারা অনুষ্ঠানে এসেছেন, তারা খালেদা জিয়ার ছবি থাকলে কি আসতেন না? আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও অন্য নেতাদেরও এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তারা। সালাম সাহেবের বক্তব্যে মনে হলো, আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে অনুষ্ঠানটিকে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যেই হয়তো তারা ‘সার্বজনীন’ এ ব্যানার বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তো কেউ এলেন না। তাতে প্রমাণ হলো, সার্বজনীনতার এ ভুল চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

মধ্যে থেকে দলের নিবেদিত নেতাকর্মীরা কেবল মর্মবেদনার শিকার হলেন। খালেদা জিয়ার ছবি এড়িয়ে শুধু জিয়াউর রহমানকে হাইলাইট করার যে যুক্তি সালাম সাহেব দিয়েছেন, তা মানলেও প্রশ্ন থাকে, ব্যানারে নামটাও কেন দিলেন না তার? ব্যানারে তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এমনকি সালাম সাহেবের নিজের নামও তো ছিল! বিএনপির সব অনুষ্ঠানের ব্যানারে যে ছবিগুলো থাকা নিয়মে পরিণত হয়েছে, সে রেওয়াজ ভাঙলেন উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অনুপস্থিত ম্যাডামের প্রতি সম্মান দেখিয়ে মঞ্চে একটি আসন খালি রাখার প্রথাটাও মানলেন না। এতে নেতাকর্মীদের মন খারাপ হবেই। তারা সন্দেহ করবেই। ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলবেই। কাজেই এ সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে সেটা স্বীকার করে নিলেই ভালো হতো।

দলের জন্য এবং তাদের নিজেদের জন্যও হতো মঙ্গলজনক। যে অনুষ্ঠান বিএনপির অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান তারেক রহমান উদ্বোধন করেন, যে মঞ্চে বিশেষ অতিথি হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সভাপতিত্ব করেন ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন আব্দুস সালাম, সেই অনুষ্ঠানকে দলীয় পরিচয় মুছে তথাকথিত ‘সার্বজনীন’ করার আশা খুবই দুরাশা ছিল। উনারা সবাই সার্বজনীন কিন্তু কেবল খালেদা জিয়ার নাম বা ছবি দিলেই অনুষ্ঠানটি সার্বজনীনতা হারিয়ে ফেলতÑএমন কথা ম্যাডামের প্রতি খুবই অবজ্ঞাসূচক ও অসৌজন্যমূলক। এ ধরনের দুঃখজনক উক্তি করা উচিত হয়নি।

তিনি লেখেন, আমি খুব বেদনার সঙ্গে বলতে চাই, রাজনীতিতে উদারতা খুব ভালো, কিন্তু নতজানুতা নয়। প্রতিপক্ষের সমালোচনার মুখে ছাড় দিয়ে নিজের নেতা-নেত্রীকে ছোট করে সার্বজনীন হওয়ার চেষ্টার নাম রাজনীতি নয়, আত্মসমর্পণ। প্রিয় নেতারা, দয়া করে আত্মসমর্পণ ও আত্মবিনাশের এ পথ ছাড়ুন।