অন্তর্কলহে বিপর্যস্ত আ.লীগ তৃণমূল

ঢাকা, রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অন্তর্কলহে বিপর্যস্ত আ.লীগ তৃণমূল

সালাহ উদ্দিন জসিম ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২০

print
অন্তর্কলহে বিপর্যস্ত আ.লীগ তৃণমূল

তৃণমূল আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব চরমে। নিজস্ব ও ব্যক্তি বলয় তৈরি করতে গিয়ে এ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন নেতারা। বেশিরভাগ জায়গায় আওয়ামী লীগের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ভাইলীগ। এমপি, জেলা-উপজেলা নেতা এবং সাবেক এমপি ও সাবেক জেলা-উপজেলা নেতারা তৈরি করছেন নিজস্ব গ্রুপ। এই গ্রুপিংয়ের কারণে অনেক জায়গায় অপদস্থ হচ্ছেন দলের ত্যাগী ও পুরনো নেতাকর্মীরা। এতে সুযোগ নিচ্ছে বিরোধীপক্ষ। সমস্যা সমাধানে বার বার কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ টিম করে সফর করলেও ফল আসছে না। কেন্দ্রে ডেকে মিটিং করেও লাভ হচ্ছে না। সব নির্দেশনা, উপদেশ আর দেন-দরবার থেকে যাচ্ছে আনুষ্ঠানিকতায়। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অবশ্য এজন্য তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর দায় চাপালেও, কেন্দ্রীয় নেতারা দোষারোপ করছেন তৃণমূলকেই।

গত কয়েক দিন আগে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় নেতাদের নামে চিঠির স্তূপ। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিঠির অধিকাংশই অভিযোগ। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন এবং ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচনের মনোনয়নে নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগ দেখার কেউ নেই। কিছু পড়ে থাকে কার্যালয়ে, আবার কিছু নেতার কাছে গেলেও প্রতিফলন হয় না। আর একের পর এক এসব অভিযোগ সুরাহা না হতে হতে দ্বন্দ্ব এক পর্যায়ে সংঘাতে রূপ নেয়।

অন্তত ১০টি জেলা ও ৩০টিরও অধিক উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জায়গায় জেলা, উপজেলা ও এমপিদের নেতৃত্বে তিন গ্রুপে বিভক্ত আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় নেতাদের বাড়ি যেসব এলাকায় সেখানে তাদের সমর্থনেও গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপ, সাব গ্রুপ দলীয় নির্দেশনা ও কর্মসূচি পালনের চেয়ে নেতার নির্দেশনা পালনে বেশি তৎপর। অনেক জায়গায় পালন করা হয় পৃথকভাবে কর্মসূচি, ছায়া মাড়ান না কেউ কারও। নেতাদের মুখ দেখাদেখি নেই অনেককাল ধরে।

এগুলোর মধ্যে কুমিল্লার সদরে সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন ও প্রবীণ নেতা আফজাল খানের দ্বন্দ্ব যুগ যুগ ধরে। যার কারণে সবশেষ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র জয়লাভ করে। এছাড়া এই জেলার বরুড়া, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, হোমনা ও দেবিদ্বার উপজেলায় একাধিক গ্রুপ রয়েছে। হোমনায় গ্রুপিংয়ের জেরে ২৩ অক্টোবর ২০২০ (শুক্রবার) ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল মজিদ। এ ঘটনায় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ইটের আঘাতে আমার পা থেতলে গেছে। বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছি। অধ্যক্ষ মজিদ আক্ষেপ করে বলেন, হামলায় ছাত্রলীগের কোনো দোষ নেই। দোষ হলো আমাদের, আমরা কেনো ছাত্রনেতা বানানোর আগে তাদের অতীত এবং তাদের পরিবারের ইতিহাস যাচাই করি না! যদি যাচাই করে নেতা বানানো হতো তাহলে আজ আওয়ামী লীগের সভায় ছাত্রলীগ পাল্টা সভা করার নামে হামলা করত না। এরা ছাত্রলীগ না, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি করার জন্য ছাত্রলীগ সেজেছে।

পাশর্^বর্তী জেলা চাঁদপুরেও একই অবস্থা। জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের শীতল দ্বন্দ্ব। উপজেলা পর্যায়ে উত্তরসূরিদের চরম গ্রুপিং। এই জেলার কচুয়া উপজেলার দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে যে, কচুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে কোর্টে অভিযোগ আছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম না করার জন্য কোর্টের নির্দেশনাও আছে। দুঃসময়ের ছাত্রনেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান শাজাহান শিশির সাময়িক বরখাস্ত ও জেলহাজতে। সেখানকার এমপি মহিউদ্দিন খান আলমগীর, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদের নিজস্ব অনুসারী আছে।

এই জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলায় এমপির উপস্থিতিতে কোনো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হয় না। এমপি এলাকায় ঢুকলেই মারামারি বাঁধে। সেখানে এমপি সাংবাদিক শফিকুর রহমান, উপজেলা চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম রোমান ওসাবেক এমপি ডা. শামছুল হক ভূইয়ার পৃথক গ্রুপ সক্রিয়। কেউ কোনো কর্মসূচি করতে পারে না। কর্মসূচি পালন করতে গেলেই হামলা-মারামারি-কোপাকুপি হয়। এছাড়া মতলব উত্তর ও দক্ষিণ, সদর ও হাইমচর উপজেলায় দ্বন্দ্ব থাকলেও দৃশ্যমান নয়। সেখানে এক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে সব। বিরোধীরা নিষ্ক্রিয়।

এদিকে বিভাজনে ভরপুর উত্তর জনপদের দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগ। জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে দুই উপজেলা ছাড়া সবখানে এমপি ও এমপিবিরোধী গ্রুপ সক্রিয়। জেলা সদরে এমপির পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ফিজার ও সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইমাম চৌধুরী গ্রুপ রয়েছে। এছাড়া কাহারোল, বীরগঞ্জ, চিরিরবন্দর, খানসামার, পাবর্তীপুর, ফুলবাড়ি, ঘোড়াঘাট, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও বিরামপুরে একাধিক শক্তিশালি গ্রুপ সক্রিয়।

সিরাজগঞ্জেও দ্বন্দ্ব আছে। তবে ওইসব দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য না আসলে ভেতরে কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিচ্ছে দলের ভীত। এছাড়াও পাবনা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, বরগুনা, পিরোজপুরসহ দেশের সবক’টি জেলা ইউনিটে দ্বন্দ্ব সংঘাত আছেই।

ইদানীং এই দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরাধ। মাদক ব্যবসা, ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে। মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে প্রকট হারে। আর এসব অপরাধের শেল্টার দাতা হিসেবে অভিযোগের তীর ক্ষমতাসীনদের দিকে। অবশ্য ক্ষমতাসীনরা বলছেন, সব অপরাধেই জিরো টলারেন্স নীতি সরকারের। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও সতর্ক অবস্থানে। আওয়ামী লীগের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় অপরাধ করে বেড়ানো লোকদের বেশিরভাগই ‘অনুপ্রবেশকারী’। তারা আগে দল করেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছত্রছায়ায় এসেছে। এজন্য সুযোগ হিসেবে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে দলীয় পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও নিজেদের বলয় শক্তিশালী করতে যাকে তাকেই দলে ভেড়াচ্ছেন, শেল্টার দিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের লক্ষাধিক অনুপ্রবেশকারীর নামের তালিকা করে সেগুলোকে দল থেকে বের করার দায়িত্ব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের। সর্বশেষ কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় বিভাগভিত্তিক ৮টি টিম গঠন করে জেলা-উপজেলা সফর করে সব সমস্যা সমাধানেরও নির্দেশ দিয়েছেন।

এর আগেও এসব দ্বন্দ্ব নিরসনে নানা সময় কেন্দ্রে ডেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন জেলা নেতাদের সঙ্গে বসেছেন। নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। কেন্দ্র থেকেও দফায় দফায় টিম করে জেলাভিত্তিক সফর করে সমস্যা সমাধানের জন্য নেতাদের পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোনোটাই কাজে আসছে না।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, ‘কোথাও কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকবে না। আমাদের ৮ সাংগঠনিক টিম শিগগিরই এগুলোর সমাধান করবে। তারপরও কোথাও কোন্দল দেখা দিলে শক্ত হাতে দমন করা হবে।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন খোলা কাগজকে বলেন, দ্বন্দ্ব, মতদ্বৈততা, ভিন্নমত গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। এসবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র বিকশিত হয়, প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। সুতরাং তৃণমূলের চলমান দ্বন্দ্ব ও মতদ্বৈততা নেতিবাচকভাবে না দেখে গণতন্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক অভিযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করলে সমস্যা অনেক কমে আসবে। এটি মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ও গণতন্ত্র উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীতকরণের প্রস্তুতিপর্ব।